বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০২:৩৬ অপরাহ্ন

যেসব চ্যালেঞ্জে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

নতুন সরকার তার প্রথম বাজেট দিতে যাচ্ছে। এর আগের বাজেট দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তার একাংশের বাস্তবায়ন হচ্ছে বর্তমান শাসনামলে। অন্তর্বর্তী সরকারও আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া বাজেট বাস্তবায়ন করেছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নির্বাচিত সরকারের আমলে পেশকৃত বাজেটের বাস্তবায়ন অবশ্য একই সরকারের নেতৃত্বে হবে বলে প্রত্যাশা। আর এ বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদে। কর আরোপসহ বাজেট প্রদানের অধিকার তো জনপ্রতিনিধিদেরই। বিশেষ পরিস্থিতিতেই কেবল এর ব্যত্যয় ঘটে।

বাজেট অধিবেশনের বাইরেও এ নিয়ে আলোচনা কম হবে না। বাজেট ঘিরে গোপনীয়তার সংস্কৃতির অবসান হয়েছে। কর প্রস্তাবসহ কোন খাতে কত বরাদ্দ, সে বিষয়েও ধারণা মিলেছে ইতোমধ্যে। পরিস্থিতির বিচারে কেমন বাজেট হওয়া উচিত, সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদ আর খাতসংশ্লিষ্টরাও বক্তব্য দিচ্ছেন। অংশীজনদের সঙ্গে কতটা সংলাপ হয়েছে– সে বিষয়েও প্রশ্ন কম নেই। তাদের বক্তব্য সরকারপক্ষের না জানার কিছু নেই। সরকার তার মেয়াদের প্রথম বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণের প্রয়াস নেওয়াও স্বাভাবিক। তবে সর্বোচ্চ বিবেচনায় থাকা উচিত চলমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি।
উপযুক্ত বাজেট প্রদান ও তা বাস্তবায়নের জন্য অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশও জরুরি। রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থির থাকায় বাজেট বাস্তবায়নে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। তাদের মনোযোগ নিয়েও কম প্রশ্ন ছিল না। বিশেষত এডিপি বাস্তবায়নে সরকারটি জোর দেয়নি। অবশ্য আওয়ামী লীগ শাসনামলেও কাজটি ছিল অবহেলিত। গণঅভ্যুত্থানের পর আবার কিছু প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অর্থ ছাড়ও করা হয় সতর্কভাবে। এর প্রভাব রয়েছে এমনকি চলতি এডিপির হতাশাজনক বাস্তবায়নে।

অন্তর্বর্তী সরকার কিন্তু অনেকটা আওয়ামী মডেলেই ঋণ করে বাজেট বাস্তবায়ন করে গেছে। এডিপির বাস্তবায়ন বাড়লে এর চাপ আরও বাড়ত বৈ কি। সুদসহ ঋণ পরিশোধের চাপ হালে বেড়েছে, যা সামনে আরও বেশি মোকাবিলা করতে হবে। ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয়ে উঠেছে বাজেটের সবচেয়ে বড় খাত। বরাদ্দটা এবার আরও বাড়ার কথা। আওয়ামী শাসনামলে মাত্রাতিরিক্ত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণেই সরকারের ঋণ অনেক বেড়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। বর্তমান সরকার বলছে, অতীতের ধারায় মেগা প্রকল্প নেওয়া হবে না। এতে ‘মেগা দুর্নীতি’র সুযোগ কমবে। এরই মধ্যে যে নতুন এডিপি নেওয়া হয়েছে, সেটা চলতি এডিপির চাইতে ৫০ শতাংশ বড়। তিন লাখ কোটি টাকার এডিপির বাস্তবায়ন তো পরে; এর অর্থায়নও কি করা যাবে? যোগাযোগ, বিদ্যুৎসহ স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দ রাখার খবর হয়তো উৎসাহজনক। কিন্তু এতে পুরোনো কাঠামোর অনুসরণই বেশি বেশি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠতে পারে।

নির্বাচিত সরকারের তার প্রথম বাজেটে কিছুটা বেশি ‘উচ্চাভিলাষ’ দেখানো হয়তো অস্বাভাবিক নয়। তবে সার্বিক পরিস্থিতির নিরিখে সেটা যেন নিতান্ত অবাস্তব হয়ে না ওঠে। এডিপিসহ বাজেট ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে খবর রয়েছে। আমাদের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি কিন্তু খারাপ। এনবিআরের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বহুল আলোচিত। উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষত আইএমএফ সংস্থাটি সংস্কারের শর্ত দিয়ে বসে আছে। এনবিআর সংস্কার অবশ্য আমাদের স্বার্থেও প্রয়োজন। তবে এতে হাত দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বিপাকে পড়েছিল। বিএনপি সরকারও কাজটি এগিয়ে নেয়নি। এ অবস্থায় এনবিআরের ওপর অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেওয়া হলে স্বভাবতই এর বাস্তবায়ন হবে না। অর্থবছরের মধ্যভাগেই হয়তো লক্ষ্যমাত্রা ব্যাপকভাবে কমাতে হবে। এ অবস্থায় ঘাটতি অর্থায়নের সংকটে জরুরি কাজও আটকে গেলে সেটা হবে খুব অনাকাঙ্ক্ষিত।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘পরিচালন ব্যয়’ আরও বেড়ে যাওয়ার ধারা বর্তমান শাসনামলেও অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে। এ সরকার তো তাদের রেখে যাওয়া পে স্কেল বাস্তবায়ন শুরুর পরিকল্পনা নিয়েছে বাজেট থেকেই। সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোও জরুরি। সরকার তার ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন কিছু কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে ভর্তুকিও বাড়বে; হালে এসবের দাম বাড়ানোর পরও। এ খাতে চুক্তি পুনর্বিন্যাসসহ সংস্কার এনে ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকলেও দ্রুত এর বাস্তবায়ন তো সম্ভব নয়। এর একটি কঠিন ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ও রয়েছে।

আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাপক অনিয়মের শিকার ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায়ও কিছু করের অর্থ সম্ভবত ব্যয় হবে। এভাবে ‘অনুন্নয়ন ব্যয়’ বাড়াতে গিয়ে শেষে আরও বেশি ব্যাংক ঋণ নিতে হতে পারে; আগের ধারাতেই। আইএমএফের শর্ত পালন ঠিকমতো না হওয়ায় উন্নয়ন সহযোগীরা বাজেট ও প্রকল্প সহায়তা জোগাতে কতটা এগিয়ে আসবে– সে প্রশ্ন রয়েছে বলে দেশীয় উৎস থেকে ঋণই সম্ভবত হয়ে উঠবে সরকারের শেষ আশ্রয়স্থল। রাজস্ব আহরণ দ্রুত বাড়াতে পারার বিশ্বাসযোগ্য কারণ নেই বলেই ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধির প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে।

সরকার বলতে পারে, বেসরকারি খাতে তো ঋণের চাহিদা কম। সুতরাং সরকার বেশি ঋণ নিলেও খাতটি বঞ্চিত হবে না। এমন পরিস্থিতিটাই আবার গোটা অর্থনীতির জন্য গভীর হতাশার। অনেক আগে থেকে বেসরকারি খাতই হলো আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। আর এটি ঝিমিয়ে পড়াতেই চলতি অর্থবছরে মাত্র ৪ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হবে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অনুমান। নতুন বাজেটে ৬ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরার কথা শোনা যাচ্ছে। মাত্র এক বছরে এই বর্ধিত প্রবৃদ্ধি কীভাবে অর্জিত হবে, যদি বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা এত কম থাকে?

অর্থনীতি শ্লথ হওয়ার ধারাতেই বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে চলে গেছে। এটা নাকি ইতিহাসের সর্বনিম্ন! এই খবর বেদনাদায়ক কর্মসংস্থান পরিস্থিতিই দেখিয়ে দিচ্ছে, যাতে রয়েছে রক্তাক্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব। তবে সুদের হার বেঁধে রাখার কালেও বিনিয়োগ আটকে ছিল একটা জায়গায়। এ জন্য জ্বালানি খাতের সীমাবদ্ধতাও দায়ী। ইরান যুদ্ধের চাপে জ্বালানি পরিস্থিতি এখন আরও নাজুক। এর দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। কমছে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা। এ অবস্থায় বাজেটে বেসরকারি খাত চাঙ্গা করতে ঠিক কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেদিকে দৃষ্টি থাকবে সবার।
সুদের হার কমিয়ে ঋণ সহজলভ্য করার সুযোগ কিন্তু নেই। এর বড় কারণ চার বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি। অন্তর্বর্তী শাসনামলে কিছুটা কমিয়ে আনা গেলেও হালে এটা পুনরায় রওনা দিয়েছে ডাবল ডিজিটের দিকে। কর্মসংস্থান পরিস্থিতি খারাপ থাকার সময় মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়লে সরকারের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সেটা নিয়ন্ত্রণ করে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করা। আসছে বাজেটে সেই জটিল লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি প্রতিফলিত না হলে সরকার সমালোচিত হবে। বিরোধী দল সংসদে কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করতে পারবে, বলা মুশকিল। তবে তাদের প্রস্তুতি গ্রহণের খবর ইতিবাচক। ‘ছায়া বাজেট’ও দেওয়া হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্টদের অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার মনোভাবটি অন্তত প্রতিফলিত। আসছে বাজেটে তারেক রহমান সরকারের মনোভাবও অপ্রকাশিত থাকবে না। তার নির্মোহ মূল্যায়ন হলে সেটা সহজভাবে গ্রহণের মানসিকতা যেন সরকার প্রদর্শন করে, এটাই প্রত্যাশা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102