সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১২:৩৬ অপরাহ্ন

অটোরিকশা নীতিমালা কেন জরুরি

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

নগর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা  বড় সংকটের জন্ম দিলেও স্বীকার করতে হবে, অটোরিকশা বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস; শহর ও গ্রামাঞ্চলে লাস্ট-মাইল সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই সমস্যা বিশ্লেষণে ঠিক জায়গায় আলো ফেলতে হবে।

শহর, নগর ও পরিবহন ব্যবস্থায় অটোরিকশার বিরূপ প্রভাব

আধুনিক শহরের পরিবহন ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো, কম সড়ক ব্যবহার করে  সবচেয়ে বেশি মানুষকে দ্রুত ও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। এই লক্ষ্যকে বলা হয় ‘সড়কের দক্ষতা’। পৃথিবীর উন্নত শহরগুলো তাই বাস, মেট্রোরেল, ট্রাম ও সমন্বিত গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বরং শহরগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছোট ছোট ও অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এবং বিশ্বব্যাংকের নগর পরিবহন-বিষয়ক একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার মতো মেগাসিটিতে ছোট ও মিশ্র যানের উচ্চ অনুপাতের কারণে সড়কের কার্যকর ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এ ছাড়া এ ধরনের অটোরিকশার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, এলোমেলো থামা, যত্রতত্র ইউ-টার্নের মতো আচরণে পুরো ট্রাফিক (যানবাহন) প্রবাহ ব্যাহত হয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবচেয়ে কম আলোচিত সমস্যা। ঢাকা ও অন্যত্র বর্তমানে কত লাখ অটোরিকশা চলছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব বা ডেটাবেজ নেই। এভাবে যে রাষ্ট্র নিজের সড়কের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, সে রাষ্ট্র একসময় তার সামগ্রিক শাসন-শৃঙ্খলার ওপরেও নিয়ন্ত্রণ হারায়।

পরিবেশগত বিপর্যয় ও জনস্বাস্থ্যে অটোরিকশার প্রভাব

বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বেড়েছে সিসাভিত্তিক লেড-এসিড ব্যাটারির ব্যবহার। নিম্নমানের ব্যাটারির অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং থেকে নির্গত হয় হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস। এই ব্যাটারিগুলোর কার্যকর মেয়াদ থাকে মাত্র ৬ থেকে ১২ মাস। ফলে প্রতিবছর লাখ লাখ বিষাক্ত ব্যাটারি পরিত্যক্ত হচ্ছে। পুরোনো ব্যাটারি গলিয়ে সিসা আলাদা করার জন্য দেশজুড়ে, এমনকি আবাসিক এলাকার আশপাশে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত কারখানা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা বা ‘সেফ লিমিট’ বলতে কিছু নেই। অর্থাৎ যে কোনো পরিমাণ সিসাই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক।

জাতীয় নীতিমালা: পর্যায়ভিত্তিক সমাধান কাঠামো

তবে সমাধান ‘বন্ধ করে দাও’ নয়। অটোরিকশার সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ মানুষের জীবিকা বিবেচনায় না নিয়ে কোনো নীতিই টেকসই হবে না। প্রয়োজন একটি পরিকল্পিত, মানবিক ও দৃঢ় জাতীয় নীতিমালা। আমাদের মনে রাখতে হবে, এ ধরনের বড় বা কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার নজির বাংলাদেশে আগেও আছে। ২০০১-০২ সালে যখন ঢাকা শহরের বাতাস ‘টু-স্ট্রোক’ বেবিট্যাক্সির (কালো ধোঁয়া ছড়ানো অটোরিকশা) কারণে বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল; তৎকালীন সরকার অত্যন্ত সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এক ধাক্কায় সব টু-স্ট্রোক বেবিট্যাক্সি বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব ফোর-স্ট্রোকের সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালু করা হয়েছিল। ইতিহাস প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সঠিক রূপান্তর পরিকল্পনা থাকলে এমন বড় সংকট থেকে জাতিকে রক্ষা করা পুরোপুরি সম্ভব।
তাই এখনই প্রয়োজন একটি মানবিক ও বৈজ্ঞানিক ‘জাতীয় রিকশা ও অটোরিকশা নীতিমালা’ প্রণয়ন। তবে সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই নিম্নলিখিতভাবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধাপে এগোনো প্রয়োজন।

স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ (৬ মাস-১ বছর) 

১. এলাকাভিত্তিক জোন ও রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি: সব ধরনের গাড়ি সব রাস্তায় চলতে পারবে না। হাইওয়ে, এক্সপ্রেসওয়ে বা শহরের প্রধান সড়কে (যেমন মেট্রোরেল বা বাস করিডোর) অটোরিকশা সীমিত বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এগুলো কেবল ভেতরের গলি বা ফিডার রোডে যাত্রী আনা-নেওয়ার (লাস্ট মাইল কানেকটিভিটি) কাজ করবে। প্রতিটি এলাকার সড়কের ধারণক্ষমতা মেপে কোটা নির্ধারণ করতে হবে।

২. প্রধান সড়কে কঠোর সীমাবদ্ধতা ও বড় গণপরিবহনের অগ্রাধিকার: বড় গণপরিবহন কার্যকর করতে হলে তার জন্য সড়কে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৩. লাস্ট-মাইল ফিডার সিস্টেম: অটোরিকশাকে গণপরিবহনের প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। মেট্রো বা বাস স্টেশনগুলোর সঙ্গে সংযোগকারী ফিডার সিস্টেম হিসেবে অটোরিকশাকে নির্দিষ্ট রুটে সংগঠিত করলে চালকদের আয় বজায় থেকেও সামগ্রিক ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ (৩-৫ বছর) 

১. জাতীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ ও ‘স্মার্ট লাইসেন্সিং: প্রত্যেক চালক ও যানকে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে নথিভুক্ত করতে হবে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন, তথ্য যাচাই ও নবায়ন করা যাবে।

২. ব্যাটারি রিসাইক্লিং শিল্পের পরিবেশগত কঠোর নিয়ন্ত্রণ: অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি পরিবেশগত লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। সিসা দূষণ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কারিগরি সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।

৩. সবুজ ব্যাটারি প্রযুক্তিতে রূপান্তর: জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে সিসা-এসিড ব্যাটারির ব্যবহার ক্রমান্বয়ে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। এর বদলে পরিবেশবান্ধব, দীর্ঘস্থায়ী এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারে উৎসাহ ও ক্রমান্বয়ে বাধ্যবাধকতা আনতে হবে। সরকার এই প্রযুক্তির আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিতে পারে এবং চালকদের সহজ শর্তে গ্রিন-লোনের ব্যবস্থা করতে পারে।

৪. লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকদের সামাজিক সুরক্ষা: লাইসেন্স মানে শুধু অনুমতিপত্র নয়। এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি। রাষ্ট্র দেবে স্বাস্থ্য বীমা, দুর্ঘটনা বীমা, সন্তানের শিক্ষা সহায়তা এবং বার্ধক্য ভাতার অগ্রাধিকার। চালক দেবেন নিয়ম মানার অঙ্গীকার ও একটি ন্যূনতম বার্ষিক ফি। এই সামাজিক চুক্তি দীর্ঘ মেয়াদে রূপান্তরকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।

১৯৬০-এর দশকে সিঙ্গাপুরের চিত্র আজকের বাংলাদেশের মতোই বিশৃঙ্খল ছিল। রাস্তায় হাজার হাজার হকার ও রিকশাচালক ট্রাফিক জ্যাম তৈরি করত। কিন্তু সিঙ্গাপুরের দূরদর্শী সরকার মানুষকে সিস্টেমের বাইরে ঠেলে দেয়নি। আবার তাদের বিশৃঙ্খলাকেও প্রশ্রয় দেয়নি। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু ফ্লাইওভার, মেগা প্রকল্প বা জিডিপির সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা সুস্থ, মেধাবী, কতটা সক্ষম, সেটিই রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড।

আশরাফ উদ্দিন ফাহিম: সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ; ড. ফয়সাল কবীর শুভ: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী পরিবেশ গবেষক ও নগর পরিকল্পনাবিদ

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102