মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০৩:৫৭ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
রাজনীতি থেকে অবসরের সম্ভাবনা নাকচ শেখ হাসিনার বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ ০৩ হাজার ৮৯০ কোটি টাকার ১০ (দশ) প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদন আধিপত্যের দ্বন্দ্বে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল হাওরের প্রতিবেশ বিপন্ন, হুমকিতে জীবন-জীবিকা সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর করতে ব্যক্তিগত সহকারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ- চীফ হুইপ মোঃ নূরুল ইসলাম শিগগির হচ্ছে নবম পে-স্কেলের গেজেট, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ হামলায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সর্বাধিনায়কের মৃত্যুর গুঞ্জন সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় নিয়ে হাইকোর্টের রায় স্থগিত ভূমিকম্পে ফিলিপাইনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৭

জাতীয় সংসদে ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতি জরুরি

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় ৭৮টি আসনে উন্নয়ন তদারকি ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ সংসদ সদস্য। পাশাপাশি স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানার আসনে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের নাদিয়া পাঠান পাপনকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও বাকি ৬ স্বতন্ত্র আসনে কাউকে দেখভালের দায়িত্ব দেয়নি বিএনপি। সমকাল জানাচ্ছে, ‘বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের আসনের উন্নয়ন তদারকিতে বিএনপির নারী এমপিরা এসব এলাকার জন্য ডিও লেটার বা আধা সরকারি পত্র দিতে পারবেন’ (৭ জুন ২০২৬)।

২০০৯ সালে নবম সংসদে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনের ৩৮ এমপিকে বিরোধী দল– বিএনপি, জামায়াত, এলডিপি, বিজেপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জেতা আসনে প্রথমবারের মতো উন্নয়ন তদারকির দায়িত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে পুরোনো কায়দায় বিরোধীদলীয় সদস্যদের আসনে তদারকির দায়িত্ব যুক্তিসংগত ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত হয়নি। এক যাত্রায় দুই বিচার– সরকারি দলের সদস্যরা নিজেরা স্বাধীনভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন, অন্যদিকে বিরোধী সদস্যরা সরকারি দলের সংরক্ষিত আসনের এমপিদের তদারকিতে থাকবেন; এতে বিরোধী দলের প্রতি বঞ্চনা ও বৈষম্য টিকিয়ে রাখবার মানসিকতা স্পষ্ট। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের ‘ক্ষমতায়িত’ করাও যদি উদ্দেশ্য হয়; বিরোধী দলের নারী এমপিদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হলো না কেন?

মনে রাখতে হবে, এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা সংসদ সদস্যদের মৌলিক কাজও নয়। এটি স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব। তারপরও নির্বাচনে এলাকায় জনসাধারণকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে জিতে আসতে হয় বলে সংসদ সদস্যরা উন্নয়ন কাজে সম্পৃক্ত হতে চান। অন্যান্য স্বার্থ-সংযুক্তির কথা বাদ দিলেও মোটাদাগে এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এমপিদের জন্য আগামী ভোটে বৈতরণী পারেরও প্রশ্ন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বরাদ্দে যেখানে বিরোধী দলের এমপিরা অপেক্ষাকৃত বঞ্চিত থাকেন, সেখানে সরকারি দলের এমপিদের বাড়তি তদারকি সংকটই বাড়িয়ে তুলবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাফল্যের দাবিদার হতেও বরং সরকারি ও বেসরকারি এমপিদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বিরোধী দল নির্বিশেষে বৈষম্যহীন উন্নয়ন বরাদ্দ ও তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধীদের তদারকিতে থাকবেন সরকারি দলের এমপিরা– এই সিদ্ধান্ত সংসদীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবার সরলরৈখিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

২.
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরস্পর নানামাত্রিক অনাস্থা সমাজে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই রাজনীতিবিদদের নিয়ে পরিকল্পিত অপপ্রচার পরিবেশন করছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘যা খুশি তা করা হয়। সমাজের কাছে রাজনীতিবিদদের সবচেয়ে হীন ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। রাজনীতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র চলছে’ (প্রথম আলো, ৬ জুন, ২৬)। অনলাইনে তো বটেই, টেলিভিশনে টকশোসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তৃতায় চরিত্র হনন বর্তমানে অন্যতম প্রধান প্রবণতা হয়ে উঠেছে। এমন তথ্য ও উপাত্ত হাজির করা হচ্ছে ঐতিহাসিক বা দালিলিকভাবে, যার কোনো প্রমাণ নেই। আইন নিজের হাতে তুলে নেবার মতো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক নানা ঘটনার সূত্র উপাত্ত নিজের মতো হাজির করে ইতিহাস-ভূগোলেরও ধার ধারছেন না অনেকে। এ যেন মাৎস্যন্যায়!

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার মব মন্ত্রাসের ধারাবাহিকতা এই মাৎস্যন্যায়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থই বলেছেন, ‘চতুর্দিকে পরিকল্পিত ও সচেতনভাবে একটি চেষ্টা রয়েছে, সবকিছুকে ভেঙে, অর্থহীন করে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করা।’ নৈরাজ্য ব্যাধির আকারে সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণে সরকারের ১০০ দিনের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াল চিত্র ফুটে উঠেছে। মার্চ ও এপ্রিলের মধ্যে দেশে ২৯৪টি ছিনতাই, ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ এবং তিন হাজার ৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।

৩.
নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে সমাজে ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা নষ্টের প্রবণতা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বারংবার দেখেছি। যদিও জাতি জাগরণের সেই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে এই নৈরাজ্যের পারম্পর্য থাকার কথা ছিল না; তারপরও সবকিছু ভেঙে দিয়ে সমস্ত আলো নিভিয়ে দেওয়ার অবাধ অপপ্রয়াস দেখেছি আমরা। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতাদের অস্বীকার ও অবমাননা, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বুলডোজার দিয়ে ভাঙা, ছায়ানট-উদীচী-সংবাদমাধ্যমে আগুনসহ  মাজারে হামলা-ভাঙচুর, শিক্ষকের অপমান নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিরুদ্ধমত মাত্রই ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ ঘোষণা করে হিংসা ও ক্ষমতাচর্চার উদাহরণ তৈরি হয়। এসবই চলেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতায়। মনে করতে পারি, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ওয়েবসাইট পরিবর্তনের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য-উপাত্ত অনলাইন থেকে সরিয়ে আর্কাইভ করার উদ্যোগ তথ্য প্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরুর ১০০ দিন পরও নৈরাজ্য সৃষ্টির যাবতীয় অপপ্রয়াস একইভাবে চলমান দেখে আমরা বুঝতে পারি, সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করে সুবিধা লুটকারীরা এখনও ক্রিয়াশীল। যুক্তিবোধ, গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা তাদের চরম অপছন্দ। ভিন্নমত ও পারস্পরিক সহাবস্থানে তাদের আস্থা নেই। তাই ইতিহাসের অমোঘ বাস্তবতা খারিজ করে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও বাহাস জারি রেখে হিংসা ও দলাদলির মধ্য দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিই তাদের হাতিয়ার। অনলাইনে তার নমুনা আমরা নিয়মিত দেখতে পাই।

অরাজক পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের পথ সন্ধানে সরকারকেই মূল উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য জাতীয় সংসদ হতে পারে অন্যতম ক্ষেত্র। সংসদের বিরোধী দলকে কেবল নয়, সংসদের বাইরের রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিদেরও যথার্থ মর্যাদা ও অধিকার শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। বরেণ্য রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদসহ প্রয়াত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের প্রতি বর্তমান সংসদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ইতিবাচক ও অর্থবহ সিদ্ধান্ত। এটি অব্যাহত রাখতে হবে। সমাজে বহুমতের চর্চা জারি রাখতে না পারলে গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না। অন্যায়ভাবে কোনো মতের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গণতন্ত্র হতে পারে না।

অন্যায় যারা করেছেন, তারা অবশ্যই আইনের আওতায় আসবেন। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বিনা বিচারে দিনের পর দিন যারা গত দুই বছরের মতো সময় জেলে অন্তরীণ রয়েছেন, তাদের ব্যাপারে আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দল ও মতের ওপর নির্মম হয়েছে বলে সেই দলের যাবতীয় নেতাকর্মীর প্রতি একই নিমর্মতা অব্যাহত রাখা গণতান্ত্রিক হতে পারে না। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের হয়তো গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছিল না; নির্বাচিত সরকারকে অবশ্যই আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
আমাদের কোথাও না কোথাও অবশ্যই থেমে দাঁড়িয়ে ভাবতেই হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি কোনো উত্তর হতে পারে না। যে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে বিএনপিকে দেশের মানুষ বিজয়ী করে জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছে, তার দায় ও দায়িত্ব অনেক। যাবতীয় নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সরকারকে মানবিক ও সংবেদনশীল সমাজ গঠনে মনোনিবেশ করতেই হবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য নিরাপদ ও সমমর্যাদার দেশ গঠনই সরকারের যে কোনো কর্মকাণ্ডের মূল উপাদান হিসেবে কাজ করবে। চলমান জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আমরা এই মানবিক ও ভারসাম্যময় রাজনৈতিক আচরণ সরকারি ও বিরোধী দলের কাছ থেকে প্রত্যাশা করি।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102