রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকায় ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক জিসাদ ইকবালের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক কুখ্যাত সেই নেতা নাজমুল হাসান রিয়াদকে একটি মামলায় গ্রেফতার করেছে খিলক্ষেত থানা পুলিশ।
সোমবার রাত প্রায় ১১টার দিকে নিকুঞ্জ-২ এলাকার ১২ নম্বর রোড থেকে তাকে আটক করা হয়।
খিলক্ষেত থানার মামলা নং ২৩(১০)২৫-এর ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। একই সময়ে অপর একটি মামলায় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী নবীন হোসেন আকাশকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। আকাশ ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত নাজমুল হাসান রিয়াদ খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকার আবুল হোসেন মাতাব্বরের ছেলে। তিনি একসময় ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিকুঞ্জ, টানপাড়া ও খিলক্ষেত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তার একটি প্রভাবশালী অবস্থান ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ আমলে নিকুঞ্জ এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলবাণিজ্য, প্রভাব বিস্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে ওঠে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রিয়াদ ও তার অনুসারীরা। বিশেষ করে নিকুঞ্জের ১৫ নম্বর রোডে অবস্থিত একটি রাজনৈতিক কার্যালয়কে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও নির্যাতনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়দের আলোচনায় ছিল।
রিয়াদের গ্রেফতারের খবরে নিকুঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কেউ কেউ মিষ্টি বিতরণ করেও আনন্দ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
সোহরাব আল হোসাইন বলেন, গ্রেপ্তারকৃত রিয়াদ ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা মামলা ছিল। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নিকুঞ্জ এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন সাংবাদিক জিসাদ ইকবাল পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, ওই হামলায় রিয়াদের সাথে তৎকালীন খিলক্ষেত থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিল আহমেদ, রাব্বিসহ আরও কয়েকজন অংশ নেন। হামলায় সাংবাদিক জিসাদ ইকবাল গুরুতর আহত হন।
ঘটনাটি সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠন ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়—ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কিছু আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন পৃথক বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা জানায় বলে জানা যায়।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক পরবর্তীতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে গেলে সে সময় খিলক্ষেত থানা পুলিশ মামলা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ ওঠে। পরে সাংবাদিক নেতাদের চাপের মুখে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘ সময় পর সেই ঘটনার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত রিয়াদের গ্রেফতারকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ঢাকার বিভিন্ন থানায় নাজমুল হাসান রিয়াদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব মামলার বিষয়েও তদন্ত ও নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।