মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ০৪:২০ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সাথে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলের বৈঠক তুরাগে গৃহবধূর রহস্যজনক ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার বিশ্ব মা দিবসে মহীয়সী মা’দের সম্মাননা দিলেন উত্তরা ১২ নং সেক্টর সোসাইটি শুধু চাকরি দিয়ে তরুণদের কর্মসংস্থান সম্ভব নয়; প্রয়োজন শিল্পায়ন-আসাদুল হাবিব দুলু এমপি ঈদুল আযহা উপলক্ষে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতি গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে  সাংবাদিকদেরকে সতর্ক থাকার অনুরোধ ধর্মমন্ত্রীর সাইবার ইউনিট গঠন ও জঙ্গল সলিমপুরে দু’টি আধুনিক পুলিশ একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ স্থানীয় সরকারকে আরও জনবান্ধব করবে স্মরণকালের সেরা নজরুল জয়ন্তী উদযাপনে প্রস্তুত ত্রিশাল উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি রত্নগর্ভা সম্মাননা পেলেন ৩১ মা

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার ৩ শতাংশ, খালাস ৭০ শতাংশ

অনলাইন ডেক্স রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম: শনিবার, ২ মে, ২০২৬

নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছেন আসামিরা। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

আজ শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় গবেষণার পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ উম্মে কুলসুম। তাঁর নেতৃত্বে গবেষণাটি করা হয়। ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা (সেলপ) কর্মসূচির উদ্যোগে এ পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়।

গবেষণার পর্বেবেক্ষণ তুলে ধরে উম্মে কুলসুম বলেন, গবেষণায় দেশের ৩২টি জেলার ৪২টি ট্রাইব্যুনালে জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলার সময়সীমা, মুলতবি সংখ্যা, সময় আবেদনের পুনরাবৃত্তি, মামলার ধরন, সাক্ষী ও অভিযুক্তের তথ্য, ফরেনসিক পরীক্ষা ও রায়ের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বিচার বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ঘন ঘন সময় প্রার্থনা, তদন্তে বিলম্ব, দুর্বল প্রমাণব্যবস্থা এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব। গবেষণায় বলা হয়, এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া শুধু সময়সীমা কমিয়ে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না।

আইনে ১৮০ দিন, বাস্তবে সাড়ে তিন বছর

গবেষণায় দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে।

বিচার বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ঘন ঘন সময় প্রার্থনা, তদন্তে বিলম্ব, দুর্বল প্রমাণব্যবস্থা এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব। গবেষণায় বলা হয়, এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া শুধু সময়সীমা কমিয়ে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না।

‘বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, আলোচনায় বিভিন্ন সমস্যা উঠে এসেছে—পরিসংখ্যান এসেছে, বাস্তব চিত্র এসেছে। এসবের মূল কথা হলো, রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও আইন প্রশাসনের সক্ষমতা। পদোন্নতি ও কাঠামোগত ভারসাম্য নিয়েও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত জনবলকাঠামোতে কিছু অসামঞ্জস্য আছে। দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু করা এবং জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

মো. আসাদুজ্জামান, আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন আইনজীবী ছিলাম, অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলাম, বর্তমানে আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত।’

মন্ত্রী আরও বলেন, জাতীয় বাজেটে বিচার বিভাগের বরাদ্দ তুলনামূলক কম, প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সেখানে শুধু বিটিভির জন্য বরাদ্দ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা; যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দও এর চেয়ে বেশি। এই বরাদ্দ দিয়ে বিচারকদের বেতন, প্রশাসনিক ব্যয় ও অবকাঠামো পরিচালনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

বিচার বিভাগের বাজেট বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাজেট আলোচনায় নানা স্তরের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেয়। এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, পদোন্নতি ও কাঠামোগত ভারসাম্য নিয়েও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত জনবল কাঠামোতে কিছু অসামঞ্জস্য আছে। দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু করা এবং জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগপ্রক্রিয়া অনেক স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। একইভাবে বার কাউন্সিলের পরীক্ষাও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যদিও সেখানে কিছু বিতর্ক ছিল, তবে আমরা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিয়েছি। বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়াতে হলে আমাদের মানসিকতা, কাঠামো ও সক্ষমতা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই উন্নয়ন প্রয়োজন।’

‘কম কনভিকশন মানেই মিথ্যা মামলা নয়’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন। তিনি বলেন, কম সাজার হার দেখে অনেকেই এসব মামলাকে ‘মিথ্যা’ মনে করেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

মঞ্জুরুল হোসেনের ভাষ্য, নারীর ওপর সহিংসতার প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনাই সামাজিক কাঠামো, কলঙ্ক, ভয় ও মানসিকতার কারণে আদালত পর্যন্ত আসে না। সামাজিক কাঠামো, মানসিকতা ও স্টিগমা অনেক ভুক্তভোগীকে আদালতে আসতে বাধা দেয়।

মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, যেহেতু এসব মামলায় অনেক ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান থাকে, তাই অভিযুক্ত পক্ষ অনেক ক্ষেত্রে সমঝোতার চেষ্টা বা চাপ সৃষ্টি করে। এতে ভুক্তভোগী পরিবার মানসিক ও সামাজিক চাপে পড়ে এবং অনেক সময় মামলা চালানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আইনের বড় কোনো ঘাটতি নেই। বিচারকদের ইতিবাচক ও সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো আরও কার্যকর ও দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

মো. মঞ্জুরুল হোসেন, মহাপরিচালক, আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর

মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে জটিলতার কারণে অনেক মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে, একই সঙ্গে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ নিয়ে মামলার নিষ্পত্তি বিলম্বিত হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘এসব কারণে অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবার শেষ পর্যন্ত মামলা চালিয়ে যেতে আগ্রহ হারায়। তবে এর মানে এই নয় যে মামলা মিথ্যা।’

মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, যৌতুক নিরোধ বা ঘরোয়া নির্যাতনের মতো বেশির ভাগ ঘটনা ঘরের ভেতরে ঘটে, যেখানে বাইরের সাক্ষী পাওয়া কঠিন। এতে প্রমাণ উপস্থাপন জটিল হয়ে পড়ে। নারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের একটি বড় অংশ পারিবারিক পরিসরে ঘটে, যেখানে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ সময় সহ্য করে চলেন এবং পরিস্থিতি অসহনীয় হলে তবেই আদালতের শরণাপন্ন হন।

সাক্ষ্য উপস্থাপনে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বিত কমিটি থাকলে সাক্ষ্য গ্রহণ ও বিচারপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা সম্ভব। গবেষণায় দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে।

মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, ‘আইনের বড় কোনো ঘাটতি নেই। বিচারকদের ইতিবাচক ও সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো আরও কার্যকর ও দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব।

স্বাগত বক্তব্যে শাশ্বতী বিপ্লব বলেন, বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা দেখা যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হন। সাম্প্রতিক ইউএনএফপিএ ও বিবিএসের যৌথ জরিপেও একই চিত্র উঠে এসেছে।

 

সূত্রে: প্রথম আলো

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102