মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ০৩:১১ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সাথে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলের বৈঠক তুরাগে গৃহবধূর রহস্যজনক ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার বিশ্ব মা দিবসে মহীয়সী মা’দের সম্মাননা দিলেন উত্তরা ১২ নং সেক্টর সোসাইটি শুধু চাকরি দিয়ে তরুণদের কর্মসংস্থান সম্ভব নয়; প্রয়োজন শিল্পায়ন-আসাদুল হাবিব দুলু এমপি ঈদুল আযহা উপলক্ষে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতি গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে  সাংবাদিকদেরকে সতর্ক থাকার অনুরোধ ধর্মমন্ত্রীর সাইবার ইউনিট গঠন ও জঙ্গল সলিমপুরে দু’টি আধুনিক পুলিশ একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ স্থানীয় সরকারকে আরও জনবান্ধব করবে স্মরণকালের সেরা নজরুল জয়ন্তী উদযাপনে প্রস্তুত ত্রিশাল উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি রত্নগর্ভা সম্মাননা পেলেন ৩১ মা

খিলক্ষেতে উচ্ছেদ: মুক্ত ফুটপাত, সুশৃঙ্খল বিমানবন্দর সড়ক

নিজেস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

​দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অতি সন্নিকটে অবস্থিত এবং রাজধানীর প্রধান প্রবেশদ্বার খিলক্ষেত এলাকায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত জনভোগান্তি, বিশৃঙ্খলা ও ফুটপাত দখলের মহোৎসব বন্ধে এক বিধ্বংসী ও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছে প্রশাসন। শনিবার দুপুর ১২টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশ, জনগুরুত্বপূর্ণ ফুটওভার ব্রিজ এলাকা এবং নামাপাড়া বাজার অভিমুখী মান্নান প্লাজা পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কের কয়েকশ অবৈধ স্থাপনা ও ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয় এক শ্রেণির প্রভাবশালী চক্র ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ মদদে গড়ে ওঠা এই অবৈধ ‘হকার উপনিবেশ’ পতনের ফলে বিমানবন্দরের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে ফিরেছে দীর্ঘপ্রতীক্ষিত শৃঙ্খলা। তবে এই শৃঙ্খলা কতক্ষণ স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে রয়ে গেছে তীক্ষ্ণ ও অমীমাংসিত প্রশ্ন।

​হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অতি সন্নিকটে হওয়ায় খিলক্ষেত এলাকাটি দেশি-বিদেশি পর্যটক ও সাধারণ নাগরিকদের যাতায়াতের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই ধমনীতে দখলদারিত্বের ‘ক্যানসার’ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল প্রায় রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে বাজারমুখী প্রধান সড়কের দুই পাশ পুরোপুরি হকার ও অস্থায়ী দোকানদারদের কবলে চলে গিয়েছিল। সড়কের অর্ধেকের বেশি অংশ দখল করে ব্যবসা চলায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এই অংশে যানবাহনের গতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ত, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ত বিমানবন্দরগামী ট্রাফিক ব্যবস্থায়। সরেজমিনে দেখা গেছে, ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছিল স্থায়ী স্টাইলের হোটেল, ফলের বিশাল আড়ত, প্লাস্টিক সামগ্রীর স্তূপ এবং এমনকি ভ্রাম্যমাণ কাপড়ের শোরুম। পথচারীদের হাঁটার নূন্যতম ফুটপাত অবশিষ্ট ছিল না। বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ, নারী ও স্কুলগামী শিশুদের জন্য এলাকাটি হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত নরক। বারবার গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন এবং এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ জানানো হলেও, অদৃশ্য ইশারায় এতদিন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
​শনিবার দুপুরের তীব্র রোদ উপেক্ষা করে খিলক্ষেত ক্যান্টনমেন্ট জোনের এডিসি মো. আবির হাসান এবং এসি নাজমুল হকের নেতৃত্বে খিলক্ষেত থানা পুলিশের একটি সুসজ্জিত ও শক্তিশালী দল রণংদেহী মেজাজে অভিযানে নামে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করার মতোই তারা উচ্ছেদ শুরু করেন। অভিযান শুরুর সাথে সাথেই দখলদারদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। যারা রাজনৈতিক দোহাই দিয়ে এতদিন দাপট দেখিয়ে আসছিল, প্রশাসনের অনমনীয় মনোভাব দেখে তারা মালামাল ফেলে চম্পট দেয়। উচ্ছেদকালে খিলক্ষেত ফুটওভার ব্রিজের নিচ থেকে শুরু করে উত্তরার দিকে যাওয়ার সড়কের কিনারা পর্যন্ত অবৈধভাবে গড়ে তোলা কয়েক শ বাঁশ, টিন ও প্লাস্টিকের স্থাপনা পুলিশি তৎপরতায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। শুধু দোকানই নয়, ফুটপাত দখল করে রাখা অতিরিক্ত মালামাল ও লোহার কাঠামো জব্দ করা হয়। প্রশাসনের এই মারমুখী অবস্থান দেখে বোঝা যাচ্ছিল, এবারের অভিযান কোনো লোকদেখানো কর্মসূচি নয়, বরং দখলমুক্তির একটি দৃঢ় সংকল্প।
​অভিযান চলাকালে শত শত উৎসুক সাধারণ মানুষ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানান। তবে উল্লাসের আড়ালে সাধারণ মানুষের মনে ছিল একরাশ তিক্ত অভিজ্ঞতা। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের শিকার স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত পথচারী আইয়ুব পাপ্পু তার প্রতিক্রিয়ায় অত্যন্ত তির্যক ভাষায় বলেন যে, আজ খিলক্ষেত এলাকাটিকে সত্যিই চেনা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন আমরা কোনো সভ্য দেশের শহরে আছি। এতদিন ফুটপাত দিয়ে হাঁটা ছিল মরণপণ যুদ্ধ করার মতো। বিমানবন্দর থেকে আসা বিদেশিরাও এই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের শহর সম্পর্কে এক বীভৎস ও নোংরা ধারণা নিয়ে যেত। প্রশাসন আজ যা করেছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শৃঙ্খলা কি সূর্য ডোবার পর পর্যন্ত থাকবে? এর আগেও আমরা অনেকবার দেখেছি উচ্ছেদ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবারও দোকান বসে যায়। এই অর্জন ধরে রাখতে হলে প্রশাসনকে কেবল উচ্ছেদ নয়, বরং কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
​স্থানীয়দের মধ্যে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে যে, একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সিন্ডিকেট খিলক্ষেতের এই ফুটপাত থেকে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা মাসোহারা আদায় করে। এই মাসোহারা বাণিজ্যের চাকা সচল থাকলে উচ্ছেদ অভিযান কেবল একটি সাময়িক নাটক হিসেবেই গণ্য হবে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, এবার যেন সিন্ডিকেটের কাছে প্রশাসন নতি স্বীকার না করে। উচ্ছেদ অভিযান শেষে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল আলীম সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত কড়া ও তীক্ষ্ণ ভাষায় নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন যে, আজকের এই অভিযান কেবল একটি রুটিন মাফিক কাজ নয়, বরং এটি একটি টেকসই সমাধানের সূচনা মাত্র। দেশের প্রধান বিমানবন্দরের প্রবেশমুখকে আমরা কোনোভাবেই কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের হাতে জিম্মি হতে দেব না। আমরা স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই—সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিয়ে ফুটপাত বাণিজ্য যারা করবে, তাদের জায়গা এই সড়কে হবে না। উচ্ছেদকৃত প্রতিটি পয়েন্টে আমাদের বিশেষ মনিটরিং টিম ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকবে। যদি কেউ পুনরায় দখলের দুঃসাহস দেখায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনের কঠোরতম ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
​ওসি আরও জানান, নিয়মিত পুলিশি টহল ছাড়াও এই এলাকায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হবে। তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান, যেন কেউ সড়ক বা ফুটপাত দখলকারীকে প্রশ্রয় না দেন এবং কোনো দখলদারকে দেখলেই যেন তাৎক্ষণিক পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন। নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খিলক্ষেতের মতো সংবেদনশীল ট্রাফিক পয়েন্টকে সচল রাখতে হলে কেবল উচ্ছেদই যথেষ্ট নয়। রাজধানীর প্রবেশপথে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে উচ্ছেদের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও কাঠামোগত স্থায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুটপাতের পাশে স্থায়ী গ্রিল বা বেষ্টনী তৈরি করা অথবা সেখানে আধুনিক বসার জায়গা ও বাগান করে দেওয়া যেতে পারে, যাতে পুনরায় দোকান বসানোর কোনো সুযোগ না থাকে। বিদেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নির্ভর করে এই বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকার শৃঙ্খলার ওপর। তাই এখানে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই।
​তদন্তে উঠে এসেছে যে, খিলক্ষেত মোড় এলাকায় হকারদের এই দৌরাত্ম্য কেবল সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এখানে বড় ধরনের জায়গা কেনাবেচা এবং পজিশন ভাড়ার মতো বেআইনি কর্মকাণ্ড চলত। একটি অস্থায়ী টং দোকানের পজিশনের জন্য হকারদের কয়েক হাজার টাকা অগ্রিম দিতে হতো স্থানীয় মাস্তানদের। এমন পরিস্থিতির অবসানে পুলিশের এই অ্যাকশনকে স্থানীয়রা দীর্ঘ প্রতীক্ষার ফসল হিসেবে দেখছেন। তবে অনেকের মতে, হকারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে এভাবে বারবার উচ্ছেদ করলে তারা আবারও ফিরে আসবে। মানবিক দিক বিবেচনা করে নির্দিষ্ট স্থানে ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর দাবিও তুলেছেন কেউ কেউ। আপাতদৃষ্টে প্রশাসনের কঠোরতায় খিলক্ষেত এলাকাটি তার হৃত সৌন্দর্য ও প্রশস্ততা ফিরে পেয়েছে। সড়কের দুই পাশে যানবাহন এখন কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে। পথচারীরা এখন নিরাপদে ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন।
​এই সফলতার আয়ু কতদিন, তা নির্ভর করছে খিলক্ষেত ক্যান্টনমেন্ট জোনের এডিসি মো. আবির হাসান ও এসি নাজমুল হকের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। রাজধানীবাসী চায় না খিলক্ষেত আবারও সেই পুরনো নরককুণ্ডে ফিরে যাক। খিলক্ষেত মোড়ের বর্তমান শৃঙ্খলা যদি প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে পারে, তবে এটি হবে ঢাকার অন্যান্য জনাকীর্ণ এলাকার জন্য একটি শক্তিশালী উদাহরণ। কিন্তু যদি নজরদারি ঝিমিয়ে পড়ে, তবে এই উচ্ছেদ অভিযান কেবল একটি ‘টোকেন অ্যাকশন’ হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাবে। জনগণের চলাচলের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় প্রশাসন কতদিন এই ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানে অটল থাকে, এখন সেটিই দেখার বিষয়। খিলক্ষেত কি সত্যিই মুক্ত হলো, নাকি এটি ঝড়ের আগের শান্ত অবস্থা—তা সময়ই বলে দেবে।
​খিলক্ষেতের এই পরিচ্ছন্ন চিত্র বজায় রাখার দায়িত্ব এখন যেমন প্রশাসনের, তেমনি সচেতন নাগরিকদেরও। দখলদারিত্বের এই বিষফোঁড়া যেন আর কোনোভাবেই বাড়তে না পারে, সেই প্রত্যাশায় প্রহর গুনছে এলাকাবাসী। আজকের তিন ঘণ্টার এই সফল অপারেশন শেষে পুরো এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে এবং উচ্ছেদকৃত মালামাল জব্দ করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এই একমুখী ও ধারালো অভিযান ঢাকার অন্যান্য দখলকৃত ফুটপাতগুলোর জন্য একটি আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। খিলক্ষেত এখন এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়, যেখানে ফুটপাত হবে কেবল পথচারীদের এবং সড়ক হবে যানবাহনের নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের জন্য। প্রশাসনের এই কঠোর মেজাজ যদি অব্যাহত থাকে, তবেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102