সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ০২:৫৪ অপরাহ্ন

শিক্ষার নতুন নতুন পদ্ধতি এবং আমরা!

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম: সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬

শিক্ষকতার সুবাদে গত ২৫ বছর ধরে নতুন নতুন অনেক শিক্ষা পদ্ধতির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। শেষ দশকে অধ্যক্ষ হিসেবে নতুন নতুন শিক্ষা পদ্ধতির উপর বেশ কিছু প্রশিক্ষণ/ সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সাথে একত্রে প্রশিক্ষণ নেয়া, মতবিনিময় করা এবং নিজের মতামত ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করার সুযোগ হয়েছে এবং নতুন পদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার অনেক সুযোগ পেয়েছি। লেখক হিসেবে NCTB সহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করারও সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির উপর অনেক কাজ করেছি। নতুন নতুন পদ্ধতির উপর কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন সম্পর্কে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করার সৌভাগ্য হয়েছে। মূলত আমার আলোচনার বিষয় হলো নতুন নতুন শিক্ষা পদ্ধতি এবং আমাদের সরকার। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদেরকে অনেক উন্নত দেশের উপর নির্ভর করতে হয়। এই সুযোগে অনেক দেশের বিভিন্ন সংস্থা আমাদেরকে পরীক্ষামূলক অনেক পদ্ধতির উপর কাজ করতে বাধ্য করে এবং সরকারও বাধ্য হয়। কারণ নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য যে অর্থ দরকার, তা আমাদের না থাকায় তাদের উপর নির্ভর করতে হয়। ফলে সবকিছু বিবেচনা করে কাজ করার সুযোগ থাকে না।

আমরা উন্নত দেশগুলোকে অনুসরণ কিংবা অনুকরণ করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই নিজেদের অবস্থান ভুলে যাই। অনুকরণ করতে গিয়ে নিজের ধর্ম, সংস্কৃতি, অবস্থা এবং যোগ্যতা ও দক্ষতার কথা ভুলে যাই। কৃষকের ছেলে শহরে এসে কোট টাই পরে যেমন ভুলে যায় ধান গাছে কি হয়? মাঝে মাঝে আবার বলেও ফেলে ধান গাছে তক্তা হয়। ঠিক তেমনি আমাদের দেশের সরকার কিংবা দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীরা সব ভুলে যান মন্ত্রী হওয়ার পরে। মন্ত্রী মহোদয়গণ আমাদের এমন সব স্বপ্ন দেখানো শুরু করেন, একবারও আমাদের অবস্থা কিংবা অবস্থানের কথা চিন্তা করেন বলে মনে হয় না। দায়িত্বশীলরা আমাদেরকে যখন স্বপ্ন দেখান, তখন হয়তো ভুলেই যান, আমাদের সাধ্য অনুযায়ী স্বপ্ন দেখা দরকার।
শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে কথা বলছিলাম, প্রতিটি পদ্ধতিই আমাদের শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। প্রশ্ন হলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে। এই পর্যন্ত যে কয়টি শিক্ষা পদ্ধতি এসেছে, তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা আমাদের ছিলো না বলে কোনো পদ্ধতি আমাদের কাজে আসেনি। বরং আমাদের সময়, মেধা এবং শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে এবং এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তাদের অর্থ লুটপাটের মহোৎসব হয়েছে। শিক্ষা পদ্ধতির বাস্তবায়ন নিয়ে আমাদের অবস্থা হলো, রান্নার জন্য বাজার করা হয়েছে কিন্তু চুলা কেনা হয়নি অথবা রান্নার জন্য বাজার হয়েছে কিন্তু রাঁধুনি নেই। পৃথিবীর কোথাও শিক্ষার প্রতি এত অবহেলা আছে বলে আমার জানা নেই। এই দেশে নেই শিক্ষকদের মর্যাদা, তেমনি নেই শিক্ষক তৈরির কোনো সুপরিকল্পনা। শিক্ষকদের উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষা পদ্ধতির বাস্তবায়ন কিংবা যুগোপযোগী শিক্ষা সম্ভব না। পৃথিবীর সব দেশ বুঝতে পারলেও আমাদের দেশের সরকার কিংবা দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীমহোদয় গণ এই পর্যন্ত বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা অনেক স্বপ্ন দেখতে চাই, তা যেন আমাদের সাধ্যের মধ্যে হয়। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি না হলে আমরা আরো পিছিয়ে যাবো। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করেন, তাদের মতামত নেয়া। আমরা অতীতে দেখেছি, যারা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত নয়, তাদের দিয়ে নতুন শিক্ষা পদ্ধতির বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে যা হয়েছে, নতুন পদ্ধতি এসেছে আমরা নিতে পারিনি। নতুন আর পুরাতনের মাঝখানে পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশের অনেক জেলায় শিক্ষকদের সাথে কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে, আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে দায়িত্বশীলদের তেমন কোনো ধারণা নেই কিংবা ধারণা নেয়ার সুযোগ পান না। শিক্ষকদের স্বপ্লতা, প্রশিক্ষণের অপ্রতুলতা, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার মৌলিক উপকরণ এবং শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান কোনোটাই আমাদের শিক্ষাসহায়ক না। এখন দরকার। শেষ দশকে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির উপর শিক্ষার্থীদের একটা ধারণা জন্মে ছিলো। লেখাপড়া না করেও এ প্লাস পাওয়া যায়। অনেকেই লেখাপড়া না করেও এ প্লাস পেয়েছে। আবার যারা লেখাপড়া করেছে, তারা ভালো করতে পারেনি। অনেকে পরীক্ষা না দিয়েও এ প্লাস পেয়েছে। পদ্ধতির মূল কথা ছিলো, শিক্ষার্থীদের লেখায় যেহেতু নতুন কিছু সৃষ্টির আঁচড় থাকবে, সাহস করে কিছু লিখতে পারবে এবং বিশ্লেষণ করে মতামত দিতে পারবে, সুতরাং সে যেকোনো (জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা) স্তরের নম্বর পেতে পারে এবং নম্বর দিতে শিক্ষক কৃপণতা করতে পারবে না, তাই ৮০% নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো অনেক। ফলাফল এ প্লাস এবং ৮০% এর উপরে পাশের হার। এ প্লাস পাওয়া কিংবা সবাই ভালো ফলাফল করা এই নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ ফেল করবে তা নিয়ে আমার আপত্তি আছে।
এবার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা, আমি যেহেতু এই পদ্ধতির শিক্ষক এবং লেখক, তাই পদ্ধতি নিয়ে আমার বেশ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা আছে বলতে পারি। কারণ এই পদ্ধতির উপর অনেক প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ হয়েছে। পাশাপাশি লেখক হিসেবে বিভিন্ন সেমিনার এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পদ্ধতির উপর আলোচনা, মতবিনিময় এবং পরামর্শ দেয়া ও নেয়ার সুযোগ হয়েছে। বলে রাখি, আমার বইগুলো NCTB অনুমোদিত ছিলো, সেই সুবাদে পদ্ধতি নিয়ে কাজ করার সুযোগ বেশি ছিলো। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, পদ্ধতিটি শিক্ষার্থীদের জন্য চমৎকার ছিলো। কিন্তু পদ্ধতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং অভিজ্ঞতা আমাদের ছিলো না। পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য যে সকল উপাদান ও উপকরণ, অভিজ্ঞতা এবং পারদর্শিতা কোনোটাই আমাদের ছিলো না। আমি আগেই বলেছি, আমাদের পরনির্ভরশীল হয়ে অনেক কিছু করতে হয়, সেক্ষেত্রে যোগ্যতা ও সক্ষমতার কথা ভাবার অবকাশ থাকে না। তাই ঘোড়ার আগে গাড়ি না গাড়ির আগে ঘোড়া, তা চিন্তা করার সুযোগ সরকারের থাকে না। অন্যদিকে বাঙালি হিসেবে আমাদেরকে অন্যরা সাহসী জাতি হিসেবে জানে বিধায় আমরা সাহস করে শুরু করে দেই, কি হবে সেটা না হয় পরে দেখা যাবে। যেকোনো নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য প্রথম যা দরকার, তা হলো ঐ পদ্ধতি জানা কিংবা বোঝার জন্য পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ মানুষ। নতুন পদ্ধতির জন্য একদল গবেষক ও প্রশিক্ষক। মূলকথা প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রয়োজনীয় অর্থ ও উপকরণের পর্যাপ্ততা। অর্থাৎ বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করা। তাহলে পদ্ধতি যুগোপযোগী হলেও বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকলে কোনো কাজে আসবে না। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি যখন কলেজ পর্যায়ে শুরু করা হয়, মজার ব্যাপার হলো তখন নতুন ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীরা এই পদ্ধতির সাথে আগেই পরিচিত। কিন্তু শিক্ষকরা তখনো এই পদ্ধতির প্রশিক্ষণ পায়নি। স্বাভাবিক কারণেই শিক্ষকরা ক্লাসে পড়াতে বিব্রত বোধ করতেন। বিষয়টি কত বিব্রতকর ছিল শিক্ষকদের জন্য। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাজারের গাইড বই ছাড়া বিকল্প কোনো পথ ছিল না। আমরা যারা লেখক ছিলাম, আমাদেরও কোনো প্রশিক্ষণ ছিলো না। বই লেখার জন্য NCTB থেকে পেয়েছি সিলেবাস এবং কিছু নির্দেশনা, যাকে গাইড লাইন বলা যেতে পারে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা বিষয় বিশেষজ্ঞ ছিলেন বার বার তাদের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। বলছিলাম আমাদের সক্ষমতার কথা। (চলবে)

লেখক: প্রফেসর এ কে মিলন

চেয়ারম্যান, প্রাইম রোজ স্কুল এন্ড কলেজ

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102