বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত, যা রমজানের শেষ দশকে অবস্থিত। এই মহিমান্বিত রাত সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি একে নাজিল করেছি কদরের রাতে
অন্য আয়াতে আল্লাহ আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি একে নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে।’
(সুরা : দুখান, আয়াত : ৩)
২. রমজান মাসে একজন রোজাদার তার জিহ্বাকে সংযত রাখার জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করে মহা সওয়াব ও প্রতিদান লাভের আশায় এবং এমন সব কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করতে পারে। এই পবিত্র মাসের প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য; তাই রোজাদার সচেতনভাবে সময় নষ্ট করা থেকে নিজেকে দূরে রাখে। রমজান এমন একটি মাস, যখন আধ্যাত্মিকতা গভীর হয় এবং নিয়ত নতুন করে জাগ্রত হয়।
(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
এই তাকওয়া অর্জনই রমজানের মূল উদ্দেশ্য, যার মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের জীবনকে আল্লাহভীতির আলোয় আলোকিত করতে সক্ষম হয়।
৪. রমজান মাস হলো পাপ ক্ষমার এক অনন্য সুযোগ। যে ব্যক্তি এই বরকতময় মাসকে অযত্নে পার করে দেয় এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভে সচেষ্ট হয় না, সে প্রকৃত অর্থেই ক্ষতিগ্রস্ত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল, অতঃপর তার গুনাহ মাফ হওয়ার আগেই মাসটি চলে গেল, তার নাক ধুলায় ঘষে দেওয়া হোক।’
(তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৫)
৫. রমজান মাস নেক আমল বৃদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ, বিশেষত নফল ইবাদতের মাধ্যমে। কারণ নফল ইবাদত বান্দাকে ধীরে ধীরে আল্লাহর আরো নিকটবর্তী করে তোলে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে; তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে; তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে কাজ করে এবং তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে তা দিই; আর যদি সে আমার আশ্রয় প্রার্থনা করে, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)
৬. রমজান মাস মুসলমানদের পারস্পরিক শত্রুতা ও বিরোধ মিটিয়ে ফেলারও এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ আল্লাহ তাআলা বিভেদ ও হিংসা অপছন্দ করেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদের কদরের রাত সম্পর্কে জানাতে বের হয়েছিলাম; কিন্তু অমুক অমুক ব্যক্তি ঝগড়ায় লিপ্ত ছিল, ফলে তা উঠিয়ে নেওয়া হলো। সম্ভবত এতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। অতএব, তোমরা তা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে অনুসন্ধান করো।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০২৩)
৭. রমজান মাস পবিত্র কোরআনের সঙ্গে মুসলিমের সম্পর্ক নতুন করে জাগ্রত করার এক শ্রেষ্ঠ সময়। এই মাসে কোরআন তিলাওয়াত, অনুধাবন ও আমলের মাধ্যমে ঈমান আরো দৃঢ় হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হলে তাদের অন্তর ভয়ে কেঁপে ওঠে; আর যখন তাদের কাছে তাঁর আয়াতগুলো তিলাওয়াত করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।’
(সুরা : আনফাল, আয়াত : ২)
এভাবেই রমজান মাস বান্দার হৃদয়কে আল্লাহর আরো নিকটবর্তী করে তোলে।
৮. রমজান মাস এমন এক মহামূল্যবান সুযোগ, যখন মানুষ সচেতনভাবে সেই সব সৎকর্মে বেশি মনোযোগ দেয়, যেগুলো বছরের অন্যান্য সময়ে অবহেলিত হয়ে পড়ে। এ মাসে দান-সদকা বৃদ্ধি পায়, নামাজে মনোযোগ গভীর হয়, প্রতিবেশীর প্রতি দয়া ও সহানুভূতি জাগ্রত হয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা সহজ হয় এবং নানা দাতব্য কাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদের যা রিজিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন এক ব্যবসার আশা করে, যা কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’
(সুরা : ফাতির, আয়াত : ২৯)
সব মিলিয়ে বলা যায়, রমজান মাস হলো আত্মগঠনের এক সুবর্ণ সুযোগ, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের অন্ধকার দূর করে আল্লাহভীতির আলোয় নিজেকে আলোকিত করতে পারে। এই মাস আমাদের শেখায় সংযম, সহমর্মিতা, ক্ষমা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ।