শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৪৫ পূর্বাহ্ন

ইউক্রেনে মাছ ধরার জালের ফাঁদে রুশ ড্রোন

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম: রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ইউরোপজুড়ে কৃষক ও জেলেদের ফেলে দেওয়া বা অব্যবহৃত মাছ ধরার জাল ও বিভিন্ন ধরনের নেট ব্যবহৃত হচ্ছে ইউক্রেনের সেনা ও সাধারণ মানুষকে রুশ ড্রোন হামলা থেকে বাঁচানোর কাজে। এমন তথ্য উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে। রাশিয়ার ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্য ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর রসদ সরবরাহ পথ ও ঘাঁটি। সামনের সারির ইউনিটগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া এসব হামলার উদ্দেশ্য।তবে শুধু সামরিক স্থাপনাই নয়, হাসপাতাল ও বেসামরিক স্থাপনায়ও নিয়মিত ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটছে।ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম এলাকা দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খেরসন। শহরটির সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ রক্ষাকারী সড়কগুলোকে ইউক্রেনীয়রা বলেন ‘জীবনের রাস্তা’। এসব সড়ককে যতটা সম্ভব রুশ হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা চলছে।খেরসন সামরিক প্রশাসনের উপপ্রধান ওলেক্সান্দর টোলোকোননিকভ গত নভেম্বরে সিএনএনকে বলেন, ‘গড়ে প্রতি সপ্তাহে রাশিয়া আমাদের এলাকায় প্রায় ২ হাজার ৫০০টি ইউএভি (ড্রোন) ছুড়ছে। চলতি বছর এসব হামলায় খেরসন অঞ্চলে ১২০ জন নিহত হয়েছেন।’জাতিসংঘের ইউক্রেন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় অন্তত ২ হাজার ৫১৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ১২ হাজার ১৪২ জন আহত হয়েছেন। তাদের অনেকেই ছিলেন যুদ্ধের সামনের সারি থেকে অনেক দূরে।গত এক বছরে খেরসনে ক্রমেই বাড়ানো হয়েছে জালের ব্যবহার। হাসপাতালের আঙিনা, জেনারেটর ও বাজারের ওপর টানানো হয়েছে সুরক্ষামূলক নেট। খোলা সড়কে খুঁটি বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে জালের ছাউনি।টোলোকোননিকভ বলেন, ‘রাস্তা সুরক্ষিত করার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে অনেক সড়ক জালের মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হয়েছে।’ তিনি জানান, বিভিন্ন ধরনের জাল পরীক্ষা করে তাদের টেকসই হওয়ার মাত্রা যাচাই করা হয়েছে। তার দাবি, ‘বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে এখন আমাদের সেনাবাহিনী রাশিয়ার ছোড়া ড্রোনের ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ ধ্বংস করতে পারছে।’এই জালগুলো ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ট্রাকে করে ইউক্রেনে পাঠাচ্ছে। সবচেয়ে বড় সংগঠনগুলোর একটি ‘লাইফ গার্ডিয়ানস’, যার নেতৃত্বে রয়েছেন নেদারল্যান্ডসের ক্লাস পট। তার দল ইতিমধ্যে ৮ হাজার টনের বেশি জাল ইউক্রেনে পাঠিয়েছে, যা মোট প্রাপ্ত জালের প্রায় অর্ধেক।শুরুতে ইউক্রেনীয় সেনাদের ছদ্মবেশ তৈরির জন্য জাল সংগ্রহ করতেন পট। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম, এই জালের আরও সম্ভাবনা আছে। কারণ এগুলো ধীরে ধীরে অ্যান্টি-ড্রোন প্রতিরক্ষায় ব্যবহার শুরু হয়েছে।’ তিনি জানান, খেরসন ও মিকোলাইভের মধ্যকার বিপজ্জনক সড়কের কিছু অংশ তার সংগৃহীত জাল দিয়ে সুরক্ষিত।টিউলিপের জাল তৈরি হয় হালকা ও টেকসই প্লাস্টিক দিয়ে। সাধারণত এগুলো মাটিতে পোঁতা বাল্ব ঢেকে রাখতে ব্যবহৃত হয়। এই জাল যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়া ছোট এফপিভি ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার ঠেকাতে সক্ষম।মাছ ধরার জাল তুলনামূলকভাবে আরও শক্ত। পট জানান, এগুলো ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র রক্ষায় বেশি ব্যবহৃত হয়। এখন একই জাল ব্যবহার করা হচ্ছে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো রক্ষায়, যা প্রায় প্রতিদিনই রুশ ড্রোন হামলার লক্ষ্য।ইউরোপের অন্যান্য দেশও এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। সুইডেনের ‘অপারেশন চেঞ্জ’ অব্যবহৃত জাল সংগ্রহ করে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০ টন জাল ইউক্রেনে পাঠিয়েছে। নরওয়ের ‘নরওয়েজিয়ান ভলান্টিয়ার এইড’ পাঠিয়েছে স্যামন মাছ ধরার জাল। যুক্তরাজ্যের ‘পিকআপস ফর পিস’ স্কটল্যান্ডের ফ্রেজারবার্গসহ বিভিন্ন বন্দরের জাল তাদের ত্রাণ বহরে যুক্ত করেছে।

গত নভেম্বরে ফ্রান্স সফরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কূটনৈতিক ব্যস্ততার ফাঁকে ধন্যবাদ জানান ফরাসি জেলেদের একটি দলকে। ‘কার্নিক সলিদারিতে’ নামের ওই সংগঠন ইতিমধ্যে ২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ জাল ইউক্রেনে পাঠিয়েছে। জেলেনস্কি বলেন, ‘আপনাদের হৃদয় অনেক বড়। আপনাদের সহায়তায় কত জীবন বেঁচেছে, তা হয়তো আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না।’

ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে আরও মোটা মাছ ধরার জালের প্রতি। ১০২০তম অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল ও আর্টিলারি রেজিমেন্টের ইউরি আন্দ্রুসেঙ্কো বলেন, ‘কয়েকবার বড় ল্যানসেট ড্রোনও জালে আটকে গেছে।’ দুই থেকে তিন কেজি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম ল্যানসেট ড্রোন আক্রমণের সময় ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। তার ভাষায়, ‘মাছ ধরার জাল সেটাকে আটকে একেবারে থামিয়ে দেয়।’

নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কে উদ্বৃত্ত জালের মজুত কমে আসায় নতুন উৎস খুঁজছেন ক্লাস পট। তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্প এখনো শেষ হয়নি। আমরা ইউরোপজুড়ে এটি আরও বিস্তৃত করব।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার প্রেরণা একটাই, ইউক্রেনকে সহায়তা করা এবং ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়ানো।’

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102