মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৪১ অপরাহ্ন

আইসিজেতে রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ বলল মায়ানমার, তীব্র আপত্তি বাংলাদেশের

অনলাইন ডেস্ক রির্পোট
  • আপডেট টাইম: শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) সম্প্রতি গাম্বিয়া বনাম মায়ানমার মামলায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করেছে মায়ানমার। গতকাল শুক্রবার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়টি উল্লেখ করে মায়ানমারের অপচেষ্টার বিষয়ে জোরালো আপত্তি জানিয়েছে।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্র ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিক অঙ্গীকার প্রদর্শন এবং রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমান অধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যাবর্তন ও পুনরেকত্রীকরণ নিশ্চিত করতে মায়ানমার এবং রাখাইনে কর্তৃত্বকারী সব পক্ষকে বাংলাদেশ আহ্বান জানায়।মায়ানমার অতীতেও বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গাদের তৎকালীন ‘বেঙ্গল’ (বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে যাওয়া বোঝাতে ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করেছে।অতীতেও বাংলাদেশ এ ব্যাপারে প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।আইসিজেতে সম্প্রতি মায়ানমারের উপস্থাপন করা বক্তব্যের বিষয়টি উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসনের একটি কৃত্রিম বয়ান তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকিকে জোরদার করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে ২০১৬-১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ নৃশংসতা ও জেনোসাইড সম্পর্কিত অপরাধ থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরানো যায় এবং তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ (নির্মূল অভিযানকে) সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রোহিঙ্গারা একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরাকানে বসবাস করে আসছে, এমনকি ১৭৮৫ সালে আরাকান বর্মন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ারও বহু আগে থেকে।
আধুনিক সীমান্ত নির্ধারণের অনেক আগেই এ অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি ছিল, যা ঐতিহাসিক দলিল, ঔপনিবেশিক জনশুমারি এবং স্বাধীন গবেষণায় সুপ্রমাণিত। বার্মার স্বাধীনতার বহু আগেই আরাকানে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি জনগোষ্ঠীকে বিদেশি বা অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসংগত।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা মায়ানমারের রাজনীতি, সমাজ ও প্রশাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। ওই আইনের মাধ্যমে মায়ানমার সরকার শুধু জাতিগত ও ধর্মীয় বিবেচনায় তাদের রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ভোটাধিকার ভোগ করেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গাদের রয়েছে একটি স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক রীতিনীতি, প্রথা ও ভাষা, যা বাংলার সঙ্গে, বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপভাষার সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য থাকলেও তা থেকে স্পষ্টভাবে ভিন্ন। রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে অভিহিত করার পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা তাদের আত্মপরিচয় নির্ধারণের অন্তর্নিহিত অধিকারকে অস্বীকার করার শামিল। এই নামকরণ বিতর্ককে ব্যবহার করে তাদের বর্জন, নিপীড়ন এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৬-১৭ সালে জাতিগত নির্মূল ও জেনোসাইডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গাদের ‘বেঙ্গলি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধকরণ মায়ানমার রাষ্ট্রের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যদিও ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ-মায়ানমার দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন চুক্তিতে তাদের ‘বার্মার আইনসম্মত বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। নামকরণ যা-ই হোক না কেন, ওই চুক্তি ও পরবর্তী দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় এই (রোহিঙ্গা) জনগোষ্ঠীকে মায়ানমার সমাজে সমান সদস্য হিসেবে পুনরেকত্রীকরণের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই ধরনের বিভ্রান্তিকর বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরানোর পাশাপাশি ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষুণ্ন করছে। রোহিঙ্গাদের আত্মপরিচয়ের অধিকার অস্বীকার করাই তাদের সম্প্রদায় ধ্বংসের কেন্দ্রীয় কৌশল। এর পরিণতিতে তাদের রাখাইন থেকে উত্খাত করে রাষ্ট্রহীন করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, গত আট বছরেরও বেশি সময় ধরে রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মায়ানমারের ব্যর্থতা ২০১৭-১৮ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা ও অজুহাত প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার এই প্রবণতা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ধ্বংসের অভিপ্রায়ের প্রমাণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

২০২৩ সালের ৬ জুলাই মায়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে উত্থাপন করা তথ্যের প্রতিবাদ জানানোর কথাও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল উল্লেখ করে। সেই কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে মায়ানমারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল।’ ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রতিবাদ ও মায়ানমারকে তাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপনের আহবান জানায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ১৯৭১ সালে রাখাইনের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৭ লাখেরও কম। ওই সময় রাখাইনের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশের সমপরিমাণ আশ্রয়প্রার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিতভাবেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করত। এমনকি যুদ্ধকালীন কষ্ট এড়াতে বর্তমান বাংলাদেশের কিছু মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে যদি বার্মায় প্রবেশ করেও থাকে, তবে সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর রাখাইনে উন্নত জীবিকার কোনো সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও তাদের সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। পরবর্তী সময়ে বার্মায় পরিচালিত রাখাইন রাজ্যের জনশুমারিতেও এই ধরনের দাবির পক্ষে কোনো জনমিতিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102