বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
হাসিনাসহ ২৮৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানি ১৪ জুলাই টেকনাফে ১ কোটি ৫ লাখ টাকার ইয়াবা জব্দ খুলনা শিপইয়ার্ড পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা স্পীকারের সাথে UN WOMEN বাংলাদেশ প্রতিনিধির সৌজন‌্য সাক্ষাৎঃ বাংলাদেশ থেকে জাপানে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানীতে জাপানী রাষ্ট্রদূতকে জাতীয় সংসদের স্পীকারের আহ্বান গবেষণার ফলাফল এমন হওয়া উচিত যা মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়। রাজধানীতে “Startup, Science Project and Innovation Idea Showcasing” মেলার উদ্বোধন করলেন জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ( মন্ত্রী পদমর্যাদা) মো: ইসমাইল জবিউল্লাহ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের লাইব্রেরি কমিটির চতুর্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত হাদি হত্যা: ১৬ বারের মতো পেছাল অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশ ও মানুষের ভাগ্য বদল আমাদের প্রধান লক্ষ্য : প্রধানমন্ত্রী

জামালপুরের যে স্কুলের ৬৬ ছাত্র অংশ নেয় মুক্তিযুদ্ধে

এম শাহীন আল আমীন| জামালপুর
  • আপডেট টাইম: শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫

১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মেলে লাল-সবুজের পতাকা ও স্বাধীন রাষ্ট্র। দেশকে বাঁচাতে সেদিন যারা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল তাদের মধ্যে ছিলেন বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর কোঅপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬৬ শিক্ষার্থী।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করেছেন তারা। বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন ওই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র বশির আহমেদ, নূর ইসলাম ও মতিউর রহমান।
জানা যায়, জামালপুর জেলার সর্বউত্তরে ভারতীয় সীমান্তবর্তী বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর। কামালপুরের পাশেই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মহেন্দ্রগঞ্জ। মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের এ মহেন্দ্রগঞ্জ। কৌশলগত কারণে ধানুয়া কামালপুর ছিল পাক হানাদার বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থান। যে কারণে কামালপুরে ঘাঁটি গেড়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। কামালপুর দখলে নিতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সম্মুখ যুদ্ধে পা হারান কর্নেল আবু তাহের।

শহীদ হন ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজসহ শতাধিক বীর যোদ্ধা। এক সময় অবস্থা বেগতিক দেখে ৪ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্ত হয় ধানুয়া কামালপুর। কামালপুরে এমন বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বীর বিক্রম, বীর উত্তম ও বীর প্রতীক খেতাব পান মোট ২৯ বীর মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৭১ সালের সে সময়টায় বিভিন্ন সেক্টর ও সাবসেক্টরে ভাগ করা হয় পুরো দেশকে। মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন কোম্পানিতে মুক্তিযোদ্ধা নিয়োগ চলছে এমন খবর চলে আসে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ধানুয়া কামালপুর কোঅপারেটিভ উচ্চ বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা নাম লেখাতে শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। একে একে ৬৬ শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রশিক্ষণ নিতে ছুটে যান ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জে। প্রশিক্ষণ নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রুবাহিনীর ওপর। দীর্ঘ ৯ মাস বীরের মতো লড়াই করে ছিনিয়ে আনেন লাল সবুজের পতাকা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম বলেন, ধানুয়া কামালপুর কোঅপারেটিভ উচ্চবিদ্যালয়ে আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। দেশের পরিস্থিতি আমরা বুঝে গিয়েছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক আমাদের কাছেও পৌঁছে গেছে। গ্রামাঞ্চল হলেও নানা মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের খবর পাচ্ছিলাম। আর ওপাশেই ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জ, সেখানে গিয়ে দেখতাম যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। আমাদের বয়সী অনেকেই যুদ্ধে যাচ্ছে, নিজেকে ঘরে রাখা কঠিন হয়ে গেল। চলে গেলাম মুক্তিযুদ্ধে। আমাদের স্কুলের ৬৬ ছাত্র মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়।

জানা যায়, ৪ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং ক্লের বলেন, কামালপুর পাকিস্তানি ক্যাম্পে কে যাবে আত্মসমর্পণের চিঠি নিয়ে। কামালপুর সীমান্তঘেষাঁ ভারতীয় গ্রাম ব্রাহ্মণপাড়ায় তখন মুক্তিবাহিনীর হাজারো সদস্য উপস্থিত। তবে কেউ সাহস করে বলতে পারছিল না কে যাবে। ব্রিগেডিয়ার ক্লের যখন প্রশ্নটা দ্বিতীয়বার করলেন, ঠিক তখনই মুক্তিবাহিনীর এক কিশোর যোদ্ধা বলে উঠলেন, আমি যাব চিঠি নিয়ে। সেই কিশোর যোদ্ধা সাহসী বশির আহমেদ।

বশির আহমেদ বলেন, আমাদের স্কুলের ১০০ গজ দূরেই ক্যাম্পটি। আত্মসমর্পণের চিঠিটি পকেটে নিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পের সামনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আমার হাতে থাকা সাদা পতাকা নাড়ালাম। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পেলাম না। ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ, শত্রুপক্ষের ছোড়া একটি গুলিই আমার জীবন কেড়ে নিতে পারত। তবে কোণঠাসা পাকিস্তাানি বাহিনী একসময় ক্যাম্পের ভেতরে আমাকে ডেকে নেয়। আমি আত্মসমর্পণের চিঠি পৌঁছে দিই বিওপির কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহসান মালিকের হাতে। দীর্ঘক্ষণ চিঠির বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেও সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না পাক বাহিনী। এরই মধ্যে মিত্রবাহিনীর চারটি যুদ্ধবিমান হামলা শুরু করল পাকিস্তানি ক্যাম্পে। আমাকে বাংকারে ঢোকানো হলো। কয়েকজন সৈনিক হতাহত হলো। পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল আরও ভেঙে গেল। এরই মধ্যে মুক্তিবাহিনীর আরও একজন এলেন আত্মসমর্পণের চিঠি হাতে। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা আনিসুর রহমান। চারপাশ থেকে হামলায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। শত্রুমুক্ত হয় কামালপুর রণাঙ্গন।

বিদ্যালয়টির বর্তমান প্রধান শিক্ষক ফরহাদ হোসেন বলেন, আমি গর্বিত যে আমার এ বিদ্যালয়ের ৬৬ প্রাক্তন ছাত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৬৪ সালে এ স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় আশপাশের এলাকায় কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। সবাই কামালপুরেই পড়তে আসত। প্রায় ৮শ শিক্ষার্থী ছিল বলে জেনেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ এক রণাঙ্গন ছিল বলে স্কুলের এত ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বিষয়টি আমাকে প্রতিদিনই সব কাজে উৎসাহিত করে। আমি গর্বিত এমন ইতিহাস সৃষ্টিকারী একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হতে পেরে।

তিনি বলেন, ১১ নম্বর সেক্টরের এ বিদ্যালয়টির আশানুরূপ উন্নয়ন হয়নি। ক্লাস রুমের সংকট রয়েছে। বক্তব্যে ইতিহাস রক্ষায় বিদ্যালয়টি আধুনিকায়নের দাবি জানান তিনি।

ধানুয়া কামালপুর ইউপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাপ জামাল বলেন, ১৯৬৪ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৭১ সালে এ বিদ্যালয় থেকে ৬৬ ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। এটা অবশ্যই ইতিহাসের অংশ। এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি গর্বিত।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102