২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। গত বছরের এই দিনে উত্তরার জমজম টাওয়ারের সামনে থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করে স্থানীয় ছাত্র-জনতা। সকাল ১০টার পর বিশাল বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয় স্থানীয় স্কুল-কলেজ- মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী।
কোটা সংস্কারের দাবিতে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈষম্য বিরোধী শিক্ষার্থীদের উপর সরকার দলীয় ছাত্রলীগ ক্যাডারদের নারকীয় হামলার প্রতিবাদে সেদিন ঢাকা উত্তরার ঢাকা-বিমানবন্দর মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধ করে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।

কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ক্যাডার বাহিনীর সশস্ত্র হামলার প্রতিবাদে উত্তরার শান্ত মরিয়ম, আইইউবিএটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, উত্তরা হাই স্কুল, নওয়াব হাবিবুল্লাহ, জামিয়াতুন নূর আল কাসেমিয়া, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির হাজারো শিক্ষার্থী এ দিন দুপুর ১টায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ব্লকেড করে দেয়।
শিক্ষার্থীরা সেদিন যেসব স্লোগান দেয়
১৬ জুলাইয়ের সেদিন শিক্ষার্থীরা উত্তরার আজমপুর ফুটওভার ব্রিজের নিচের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ব্লকেড করে ‘ভুয়া-ভুয়া’ স্লোগান দেয়া এবং একপর্যায়ে – ‘তুমি কে-আমি কে, রাজাকার-রাজাকার; কে বলেছে-কে বলেছে? স্বৈরাচার-স্বৈরাচার, চেয়েছিলাম অধিকার-হয়ে গেলাম রাজাকার, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ ইত্যাদি ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে নিজেদের ক্ষোভ জানান দেয়।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দু পাড়ে যান চলাচল বন্ধ
শিক্ষার্থীদের ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-বিমানবন্দর মহাসড়ক অবরোধের ফলে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বেলা আড়াইটা নাগাদ যানচলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। তবে শিক্ষার্থীদের রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দিতে দেখা গেছে। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি তেমন একটা দেখা যায়নি।
উত্তরা থেকে যেভাবে শুরু হয়েছিল
সেদিন বেলা সাড়ে বারটার দিকে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর জমজম টাওয়ারের সামনে থেকে প্রায় হাজারো শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বের হয় বিক্ষোভ মিছিল। বেলা ১টার দিকে সোনারগাঁও জনপদ সড়ক ধরে শিক্ষার্থীদের মিছিলটি হাউসবিল্ডিং হয়ে উত্তরার আজমপুরের নওয়াব হাবিবুল্লাহ স্কুল সংলগ্ন ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উপর অবস্থান নেয় ।
কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে যা জানা গেল
১৬ জুলাই শিক্ষার্থীরা যখন মহাসড়ক বন্ধ করে দিল। তখন প্রতিবাদী কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা। শিক্ষার্থীরা জানায়, কোটা সংস্কারের দাবীতে আমাদের আন্দোলন যৌক্তিক। সরকারি চাকরিতে ৫৬% যদি কোটাধারীদের জন্যই বরাদ্দ থাকে তাহলে আর মেধাবীদের কি হবে। দেশের সব মানুষ তো আর কোটার সুবিধাটা পায় না- তাই না?
অপর এক ছাত্র জানায়, আমাদের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলছে। পরীক্ষার হল থেকে আমরা উঠে এসেছি এখানে। কোটা সংস্কারের প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ানো অপর এক ছাত্রী জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গতরাতে কি হয়েছে সেটা আমরা সবাই দেখেছি। ছাত্রলীগের পোলাপান নিরপরাধ ছাত্রদের উপর হামলা চালিয়েছে। যৌক্তিক দাবী চাইতে এসেও কেন আমাদের রক্ত ঝড়াতে হলো?

শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগের ব্যর্থ হামলা চেষ্টা
প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা সেদিন বিএনএস সেন্টার ও আজমপুরের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ওপর অবস্থান নিলে ছাত্র-জনতার ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে তাৎকালীন যুবলীগ-ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তবে ছাত্র-জনতার শক্ত প্রতিরোধে পিছু হঠে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। শিক্ষার্থীরা লাঠি হাতে মহাসড়কের ওপর শক্ত অবস্থান নেয়।
সাংবাদিকদের চোখে সেদিনের উত্তরা পরিস্থিতি
সেদিনের ঘটনা জানিয়ে কালেরকণ্ঠ মাল্টিমিডিয়ায় রিপোর্টার মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, বিএনএস সেন্টার এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় ছাত্রলীগের ছেলেরা। একজন নারী অভিভাবক প্রতিবাদ করায় তাকেও ছাড় দেয়া হয়নি। ঘটনার ভিডিও ধারণ করায় আমাকেও হুমকি দেয়া হয়েছিল। তবুও আমি আমার কাজ চালিয়ে যাই।
সেদিনের সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে উত্তরা নিউজের বিশেষ প্রতিনিধি সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান জানায়, সকাল থেকেই আমি লাইভে যুক্ত ছিলাম। উত্তরা নিউজের ফেসবুক পেজে আমরা প্রথম লাইভটি প্রচার করি। সেখানে শিক্ষার্থীদের বিপুল উপস্থিতি তুলে ধরা হয়েছিল।
লেখক- ইবনে তুরাব, লেখক ও সাংবাদিক।