বিদেশে যাওয়ার আগে কিংবা প্রবাস থেকে দেশে ফিরে অনেক কর্মীকেই বিমানবন্দরের আশপাশে রাত কাটাতে হয়। কম খরচে নিরাপদ আবাসন না থাকায় কেউ ব্যয়বহুল হোটেলে ওঠেন, আবার কেউ টার্মিনালের বাইরে রাত পার করেন। অথচ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই মাত্র ২০০ টাকায় থাকার সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে প্রচারের অভাবে সেই সুবিধার কথা জানেন না অনেক প্রবাসী কর্মী।
খিলক্ষেত থানার বরুয়া এলাকার লঞ্জনীপাড়ায় প্রবাসী কর্মীদের জন্য রয়েছে সরকারি আবাসনকেন্দ্র ওয়েজ আর্নার্স সেন্টার। সেখানে এক রাত থাকার জন্য খরচ হয় মাত্র ২০০ টাকা। বিমানবন্দর থেকে সেন্টারে যাতায়াতের জন্য রয়েছে বিনা মূল্যের পরিবহনসুবিধাও।
প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেন্টারে আবাসনের পাশাপাশি লাগেজ রাখার ব্যবস্থা, ইন্টারনেট, টেলিফোন, বিদ্যুৎ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের মতো সুবিধা রয়েছে। নারী ও পুরুষের জন্য রাখা হয়েছে পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা।
তবে উদ্বোধনের চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেন্টারটি প্রত্যাশিত মাত্রায় ব্যবহার হচ্ছে না। বেশির ভাগ সময়ই খালি পড়ে থাকছে এর অধিকাংশ শয্যা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেন্টারটির বিষয়ে প্রবাসী কর্মীদের বড় একটি অংশের পর্যাপ্ত ধারণা নেই। এর সঙ্গে বিমানবন্দর থেকে সেন্টারে যাতায়াতের পথের সমস্যাও ব্যবহার কম হওয়ার অন্যতম কারণ।
২০২২ সালে উদ্বোধন
২০২২ সালের ১৮ মার্চ ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারটির উদ্বোধন করা হয়। বিদেশগামী ও প্রবাসফেরত কর্মীদের ঢাকায় সাময়িক আবাসনের ব্যবস্থা করাই ছিল এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকার লঞ্জনীপাড়ায় প্রায় ১৪০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত হয়েছে সেন্টারটি। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। একই সময়ে প্রায় ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষদের জন্য ৪০টি এবং নারীদের জন্য ১০টি শয্যা রাখা হয়েছে।
সেন্টারে থাকার খরচও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা হয়েছে। একজন কর্মীকে এক রাতের জন্য দিতে হয় মাত্র ২০০ টাকা। সিট বুকিংয়ের জন্য রয়েছে ১০০ টাকা আবেদন ফি। একজন কর্মী সর্বোচ্চ দুই রাত থাকতে পারেন। আবেদনের সময় পাসপোর্ট ও ফ্লাইটের টিকিটের কপি জমা দিতে হয়। সরাসরি আবেদনের পাশাপাশি অনলাইনেও আবেদন করা যায়।
মাসে গড়ে থাকছেন দু-তিনজন
সেন্টারের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে সেখানে অবস্থান করেছেন মাত্র ৮৪ জন। জুলাইয়ে ছিলেন ৮০ জন। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রতিদিন সেখানে অবস্থান করেছেন মাত্র দু-তিনজন প্রবাসী কর্মী।
অথচ সেন্টারটির সক্ষমতা অনুযায়ী এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষকে সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি স্থাপনাটি যদি সক্ষমতার সামান্য অংশ ব্যবহার করতে পারে, তাহলে এর মূল উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে।
সেন্টারে অবস্থান করা কয়েকজন প্রবাসী কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থাকার পরিবেশ নিয়ে তাদের বড় কোনো অভিযোগ নেই। বরং স্বল্প খরচে থাকার সুযোগকে তারা সুবিধাজনক বলে মনে করেন। তবে অনেকেই আগে থেকে এ সেন্টারের বিষয়ে জানতেন না।
বিমানবন্দরে রাত কাটান অনেকে
বিদেশগামী কর্মীদের বড় একটি অংশ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকায় আসেন। তাদের অনেকে ফ্লাইটের ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা আগেই রাজধানীতে পৌঁছে যান। বিশেষ করে ভোররাত বা গভীর রাতে ফ্লাইট থাকলে তারা আগেভাগে বিমানবন্দরে চলে আসেন।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে টার্মিনালে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় অনেককে বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। লাগেজ নিয়ে দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরের ক্যানপি বা আশপাশের এলাকায় বসে থাকতে দেখা যায় তাদের। এমন একজন বিদেশগামী কর্মীকে ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, তিনি এ ধরনের কোনো সেন্টারের কথা জানতেন না।
একজন কর্মীর এমন অজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু সেন্টারে অবস্থানকারীদের সংখ্যা ও সার্বিক ব্যবহারচিত্র বলছে, সেবাটি যাদের জন্য তৈরি, তাদের বড় একটি অংশের কাছেই এখনো এর তথ্য পৌঁছায়নি।
প্রচারণা বাড়ানোর পরামর্শ
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সেন্টারটির প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিমানবন্দরের প্রবাসী লাউঞ্জেও এর তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বিমানবন্দরে আসা অনেক কর্মী এখনো জানেন না, মাত্র ২০০ টাকায় তাঁদের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রবাসীদের কাছে তথ্য পৌঁছাতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়ার শুরুতেই কর্মীদের সেন্টারটির বিষয়ে জানানো যেতে পারে।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত প্রচারণা চালানো যেতে পারে। এতে ঢাকায় আসার আগেই কর্মীরা জানতে পারবেন, বিমানবন্দরের কাছে কম খরচে কোথায় থাকা যায়।
বিমানবন্দরের ভেতরেও সেন্টারটির প্রচারণা আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ রয়েছে। আগমন ও বহির্গমন এলাকায় বড় সাইনবোর্ড, ডিজিটাল ডিসপ্লে, তথ্যকেন্দ্র ও দিকনির্দেশনামূলক ব্যবস্থা থাকলে বিমানবন্দরে পৌঁছেই একজন কর্মী সেন্টারটির বিষয়ে জানতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইনও কার্যকর হতে পারে। ফ্লাইটের সময়, সিটের প্রাপ্যতা, যাতায়াতের ব্যবস্থা ও বুকিংয়ের নিয়ম-সব তথ্য এক জায়গা থেকে পাওয়া গেলে কর্মীদের ভোগান্তি কমবে।
যাতায়াতেও সমস্যা
শুধু প্রচারণার ঘাটতিই নয়, সেন্টারে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সেন্টারটির দূরত্ব প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়ে গাড়িতে যেতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু সেন্টারের সামনের সড়ক ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও ড্রেনেজ উন্নয়নকাজ চলায় স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিমানবন্দর থেকে বিনা মূল্যের পরিবহনসুবিধাটিও অনেক সময় প্রত্যাশিতভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
সেন্টারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সড়কের কাজের কারণে যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ কারণে বিনা মূল্যের পরিবহনসেবার ব্যবহারও কমেছে।প্রবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের বাইরে যাওয়ার সময় তাদের সঙ্গে থাকে লাগেজ। অনেকের কাছে একাধিক ব্যাগ থাকে। প্রথমবার ঢাকায় আসা একজন কর্মীর জন্য অপরিচিত এলাকায় নির্মাণাধীন সড়ক দিয়ে যাতায়াত করাও সহজ নয়।
নতুন আবাসনের উদ্যোগ
প্রবাসীদের জন্য আবাসনের প্রয়োজনীয়তা যে এখনো রয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিমানবন্দরকেন্দ্রিক তাদের ভোগান্তিতে। ভোররাত বা মধ্যরাতের ফ্লাইটের ক্ষেত্রে অনেকে আগের দিন ঢাকায় চলে আসেন। কেউ পরিচিতজনের বাসায় থাকেন, কেউ হোটেলে ওঠেন, আবার কেউ বিমানবন্দরের আশপাশে অপেক্ষা করেন।
এই বাস্তবতায় খিলক্ষেতের লঞ্জনীপাড়ার ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে প্রবাসী কর্মীদের বড় একটি অংশ উপকৃত হতে পারেন।
প্রবাসীদের জন্য নতুন করে আবাসন তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আশকোনা হজ ক্যাম্পে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য আরও ১০০ শয্যার আবাসন ব্যবস্থা করার উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। ফ্লাইট বিলম্ব বা বাতিল হলে কর্মীদের সাময়িক আবাসনের জন্য এই ব্যবস্থা করা হবে।
নতুন অবকাঠামো প্রয়োজনীয় হলেও এর পাশাপাশি খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকার লঞ্জনীপাড়ায় বিদ্যমান ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারটির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি স্থাপনা শুধু পড়ে থাকার জন্য নয়, প্রবাসীদের সেবা দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
প্রবাসী কর্মীদের অনেকেই জীবনের সঞ্চয় খরচ করে বিদেশে যান। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ নেন, আবার কেউ পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে বিদেশে পাড়ি জমান। তাদের প্রত্যাশা থাকে নিরাপদ যাত্রা এবং কর্মস্থলে পৌঁছানোর পর ভালো ভবিষ্যৎ।
দেশ ছাড়ার আগের রাতটুকু নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হওয়াও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকেই ওয়েজ আর্নার্স সেন্টারের গুরুত্ব।
মাত্র ২০০ টাকায় এক রাত থাকার সুযোগ একজন স্বল্পআয়ের বিদেশগামী কর্মীর জন্য বিমানবন্দরের ব্যয়বহুল হোটেল কিংবা অনিরাপদ রাতের তুলনায় বড় স্বস্তি হতে পারে।
তাই এখন প্রয়োজন সেন্টারটির পরিচিতি বাড়ানো, বিমানবন্দর থেকে নির্ভরযোগ্য পরিবহন নিশ্চিত করা এবং প্রবাসীদের জন্য বুকিং ও তথ্যসেবা আরও সহজ করা।
প্রায় ৩০ কোটি টাকার এই বিনিয়োগের সুফল তখনই মিলবে, যখন প্রবাসী কর্মীরা জানবেন-খিলক্ষেতের বরুয়া এলাকার লঞ্জনীপাড়ায় তাদের জন্য একটি নিরাপদ ঠিকানা রয়েছে। মাত্র ২০০ টাকায় সেই ঠিকানায় রাত কাটানো যায়। অথচ সেই খবরটাই এখনো পৌঁছায়নি অনেক প্রবাসীর কাছে।