বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ০১:৪১ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
কবি নজরুল ইনস্টিটিউট পরিদর্শনে সংস্কৃতি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী: নজরুলের সাহিত্য বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে উচ্চপর্যায়ের অনুবাদ কমিটি গঠন কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম থেকে ফিরলেন আরো ৭৮ বাংলাদেশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন ভোট দিতে পারবেন না প্রবাসীরা ‘আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাভাষীদের সীমান্তে পুশইন করছে বিএসএফ’ প্রথম গোল করার পর কেন কেঁদেছেন মেসি? ভোলায় মিতু হত্যার প্ররোচনা মামলার প্রধান আসামিসহ গ্রেপ্তার ৩ অনিয়ম-দুর্নীতির ‘হেডমাস্টার’ এজাজ শাহরাস্তিতে ধর্ষণের শিকার শিশু ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, অভিযুক্ত আটক শাহরাস্তিতে ধর্ষণের শিকার শিশু ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, অভিযুক্ত আটক রামগঞ্জে স্কুলের আবাসিক হল থেকে ছাত্রের লাশ উদ্ধার

বেনজীরদের উত্থানের প্রেক্ষাপট যেন বদলায়

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

আওয়ামী লীগ শাসনামলের ক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল সেই আমলেই। সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন হলে নড়েচড়ে বসে সরকার। দুদকে তদন্তও শুরু হয়। এরই মধ্যে অবশ্য তিনি দেশ ছাড়েন বিমানবন্দর দিয়ে। সিসিটিভি ফুটেজে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখা যায় তাঁকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতে। যদিও ততদিনে বেনজীর আইজিপি পদ থেকে অবসরে।

র‍্যাবপ্রধান থাকাকালেও তিনি নানা অপঘটনায় আলোচিত হন। অপহরণ, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বদানের অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। এর আগে ডিএমপি কমিশনার থাকাকালে অস্বাভাবিক বলপ্রয়োগে শাপলা চত্বরের জমায়েত ভেঙে দেওয়া এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার বাসভবনের সামনে বালুর ট্রাক রেখে অবরোধ সৃষ্টির ঘটনায়ও তাঁর নাম আসে। ক্ষমতার অপব্যবহার তীব্র হয়ে ওঠায় পুলিশের যেসব কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আসে; বেনজীর ছিলেন তাদের একজন। ততদিনে অবশ্য তিনি হয়ে গিয়েছিলেন পুলিশপ্রধান।

বেনজীর আহমেদ সপরিবারে দেশ ছাড়ার কিছু দিনের মধ্যেই কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে যায়। তখন যিনি আইজিপি ছিলেন, তিনি ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে দণ্ডিত। চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন অবশ্য রাজসাক্ষী হয়ে গুরুদণ্ড এড়িয়েছেন। এর মধ্যে খবর এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদ প্রেপ্তার হওয়ার। দুদকের মামলায় তাঁর নামে ‘রেড নোটিশ’ জারি হয়েছিল ইন্টারপোলের সহায়তায়। এর ভিত্তিতেই দুবাই পুলিশ বেনজীরকে গ্রেপ্তার করেছে।

সরকার স্বভাবতই চাইতে পারে বিধিবদ্ধ উপায়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারে সোপর্দ করতে। বেনজীরের বিরুদ্ধে অভিযোগের যেন শেষ নেই। মঙ্গলবারের সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর নামে এ পর্যন্ত দায়ের ৩৩টি মামলার কথা জানা যায়। তবে তাঁকে দুবাই থেকে আনতে সুনির্দিষ্ট কিছু মামলার নথিপত্রই প্রস্তুত করে পাঠানো হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে দক্ষতার পরীক্ষা।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তি হয় আওয়ামী লীগ শাসনামলেই। বেনজীর সেখানেই গ্রেপ্তার হওয়ায় আশা জেগেছে, ওই চুক্তির বলে তাঁকে সহজে দেশে আনা যাবে। জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি আমদানিসহ আমিরাতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো। সুসম্পর্ক থাকলে অনেক ক্ষেত্রে চুক্তি ছাড়াও অপরাধী বলে অভিযুক্তদের হস্তান্তর করা হয়ে থাকে। আবার তেমন চুক্তি থাকলেও এমনকি দণ্ডিতদের হস্তান্তরে জটিলতার সৃষ্টি হয়। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত হলেও এবং সরকার তাদের ফেরত চাইলেও ভারত সাড়া দিচ্ছে না। ভারতের সঙ্গে কিন্তু বাংলাদেশের বন্দি বিনিময় চুক্তি রয়েছে। এর আওতায় একাধিক ব্যক্তিকে পরস্পরের কাছে হস্তান্তরের দৃষ্টান্তও আছে। এ অবস্থায় আমিরাতের সঙ্গে চুক্তির উপস্থিতিসহ স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকায় আশা করা হচ্ছে, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বেগ পেতে হবে না। তাঁর নামে দায়ের কোনো মামলায় এখনও দণ্ড না হওয়া এ ক্ষেত্রে বাধা হবে না বলে মত রয়েছে। এ নিয়ে বাড়তি মন্তব্য না করে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখাটাই বোধ হয় ভালো।

বেনজীর আহমেদসহ কিছু পুলিশ কর্মকর্তা কীভাবে এত বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন, সেটা ছিল অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’। তবে জানলেও এ বিষয়ে খবর প্রকাশ করা কঠিন ছিল সংবাদকর্মীদের পক্ষে। তাদের কাজের স্বাধীনতা এ কারণেই প্রয়োজন। সেটা থাকলে খবর প্রকাশের ভয়েও ক্ষমতার অপব্যবহারে অনুৎসাহী দেখা যেত বেনজীরের মতো কর্মকর্তাদের। ‘কর্মকর্তা’ বলে অবশ্য কিছু লেখা নেই; সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। বেনজীর ও সমগোত্রীয়রা সেটা বিস্মৃত হয়েছিলেন তৎকালীন রাজনৈতিক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তৈরিতে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা রয়েছে নিবন্ধের শুরুতেই। আর ২০১৮ সালের রাতের ভোটের সময় তিনি ছিলেন র‍্যাবপ্রধান। সরকারের একান্ত অনুগত হিসেবে তাঁকে আঙুল নাচিয়ে প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়ে বক্তব্য রাখতে দেখা গিয়েছিল খোদ পুলিশের অনুষ্ঠানে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিষেধাজ্ঞা আসার পরও সরকার তাঁকে থামায়নি। অবশ্য শোনা যায়, গোপালগঞ্জ থেকে উঠে আসা বেনজীর ওই জেলায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকের জমিজমা জোরপূর্বক কিনে নেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রভাবশালী দেশের দূতাবাস থেকে অভিযোগ আসে। তখন তাঁর আঙুল না কেটে নখ কেটে ফেলার জন্য শুরু করা হয় দুদকের তদন্ত। এরই মধ্যে অন্য এক পক্ষ তাঁকে সপরিবারে দেশত্যাগের সুযোগ করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

শেখ হাসিনার সরকার ক্রমে জনবিচ্ছিন্ন হয়েও যাদের সহায়তায় টিকে ছিল এবং এর আগে যাদের ক্ষমতাধর হয়ে উঠতে দিয়েছিল, তাদেরই একজন বেনজীর আহমেদ। এদের দাপটে জনপ্রশাসনের নিয়ম মেনে চলা মানুষজন অসহায় হয়ে পড়েছিল বলেও শোনা যায়। বিশেষত পুলিশ প্রশাসন খুবই অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে এসব কর্মকর্তার ভূমিকার কারণে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তারা মুখোমুখি হয় ছাত্র-তরুণসহ জনগণের বিরাট অংশের। ঘটে নজিরবিহীন রক্তক্ষয়। পাল্টা আঘাতে পুলিশ হত্যা এবং থানা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। সরকারের সঙ্গে পুলিশকেও কার্যত পালিয়ে যেতে হয়। দেশের জন্য ঘটনাটি ছিল একই সঙ্গে বিপর্যয়কর ও লজ্জাজনক।

নির্বাচিত সরকার আসার পরও ভেঙে পড়া পুলিশকে পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। একটা সময় পর্যন্ত তাদের পাহারা দিয়ে রাখতে হয়েছিল সেনাবাহিনীকে। বেনজীরদের অপব্যবহার করে বাড়তে দেওয়ার পরিণতি দেশের জন্য কতটা বিপজ্জনক হয়েছে, সেটা বলতেই এ প্রসঙ্গের অবতারণা। বিচারের জন্য তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা জরুরি বৈ কি। তাঁকে প্রশ্রয়দানকারী রাজনীতিকদেরও ফিরিয়ে এনে বিচারে সোপর্দ করা জরুরি।

গুম-খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলো এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে। অধিকাংশই তদন্তের পর্যায়ে। তাঁর নামে আর্থিক অপরাধের মামলাগুলোও কম গুরুতর নয়; স্বভাবতই অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে কত বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়াও কঠিন। রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও প্রশাসকদের একটি অশুভ চক্র এতে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিল। এর কতটা ফেরত আনা যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে খোদ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে। এ বিষয়ে গোটা দুনিয়ার অভিজ্ঞতাই খারাপ। এ জন্য দায়ীদের দণ্ডিত করা বরং কিছুটা সহজ। আর অপরাধ ফৌজদারি কিংবা আর্থিক যেটাই হোক; নিষ্পত্তি হতে হবে বিচারিক প্রক্রিয়ায়। দেশে আইনের শাসন জোরদারের পাশাপাশি বেনজীরের মতো ব্যক্তিদের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্যও এটা জরুরি। বেনজীর হওয়ার ইচ্ছা যেন আর কারও মনে না জাগে– সে লক্ষ্যেই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জোরদার না হলে অবশ্য বেনজীরের মতো লোকজনের পুনরুত্থান অসম্ভব নয়। দেশে দেশে বারবার এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে জনগণকে। প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের সবখানে জবাবদিহির সংস্কৃতি থাকলে বেনজীরদের উত্থান তো সম্ভব নয়। এ লক্ষ্য অর্জনে মুক্ত সংবাদমাধ্যম আর স্বাধীন বিচার বিভাগও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা অবশ্যই যেতে চাই বেনজীরদের উত্থান ও দাপটের কালপর্ব থেকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার ও প্রশাসনের কাছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102