সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ০২:৩৯ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
চীফ হুইপের সাথে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তা স্টুয়ার্ট জেমসের সৌজন্য সাক্ষাৎ আ. লীগ নেতা ও শ্রীপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র আনিছুরের জানাজায় মানুষের ঢল ছিটকে পড়া শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে ট্রাকচাপায় নিহত ২ নেশার টাকা না পেয়ে ছুরিকাঘাতে স্ত্রীকে হত্যার পর স্বামীর আত্মহত্যার চেষ্টা ​বৈধ কাগজ ও সিটি জরিপের পরও খিলক্ষেত টানপাড়ায় নামজারি ও খাজনা বন্ধ: অন্ধকারে হাজারো পরিবার দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি তৃণমূলের নারীরা : মঈন খান ব্রাজিল-ইংল্যান্ড লড়াই কেন আজও অমর ইরান-ইসরাইলের নতুন উত্তেজনা শান্তি আলোচনায় প্রভাব ফেলবে না: ট্রাম্প লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হানিফ নার্সদের পোশাকে পরিবর্তন চান কঙ্গনা

ব্রাজিল-ইংল্যান্ড লড়াই কেন আজও অমর

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

১৯৭০ সালের বিশ্বকাপকে অনেকেই ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে রোমান্টিক এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী আসর বলে মনে করেন। মেক্সিকোর রোদঝলমলে মাঠ, রঙিন টেলিভিশনে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ সম্প্রচার, আক্রমণাত্মক ফুটবলের জয়যাত্রা এবং সর্বোপরি পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিলের অনবদ্য নৈপুণ্য—সব মিলিয়ে এটি ছিল এমন একটি টুর্নামেন্ট, যা ফুটবলকে শুধু একটি খেলা নয়, বরং বৈশ্বিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত করেছিল। তবে সেই বিশ্বকাপের অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তের মধ্যেও একটি ম্যাচ আজও আলাদা করে আলোচিত হয়। সেটি হলো গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডের লড়াই।

স্কোরবোর্ডে ফল ছিল মাত্র ১-০। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে এটি ছিল একটি যুগের সমাপ্তি এবং আরেকটি যুগের সূচনার ঘোষণা।ম্যাচটির গুরুত্ব বোঝার জন্য তখনকার প্রেক্ষাপট জানা জরুরি। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে এসেছিল ডিপেন্ডিং চ্যাম্পিয়নের তকমা নিয়ে। ১৯৬৬ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়ের পর দলটি ছিল দারুণভাবে আত্মবিশ্বাসী। কোচ রামসির অধীনে ইংল্যান্ডকে তখন বিশ্বের সবচেয়ে সংগঠিত ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

কিন্তু ১৯৭০ সালে তারা ফিরে আসে আরো শক্তিশালী রূপে।কোচ মারিও জাগালোর হাতে গড়ে ওঠা দলটিতে ছিলেন পেলে, জর্জিনহো, টোস্টাও, গার্সন এবং রিভেলিনহোর মতো অসাধারণ প্রতিভারা।অনেকে এটিকে শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং ফুটবলের দুই দর্শনের সংঘর্ষ হিসেবে দেখেছিলেন—ইউরোপীয় শৃঙ্খলা ও কাঠামোর বিপরীতে লাতিন আমেরিকান সৃজনশীলতা ও সৌন্দর্য।

১৯৭০ সালের ৭ জুন মেক্সিকোর গুয়াদালাহারায় অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত এই ম্যাচ।সেই সময় মেক্সিকোর উচ্চতা ও গরম আবহাওয়া ইউরোপীয় দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। ইংল্যান্ড বিশেষ বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি নিয়ে টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। অন্যদিকে ব্রাজিল প্রায় এক মাস আগে মেক্সিকোয় এসে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল।ফলে ম্যাচটি কেবল ফুটবল দক্ষতার পরীক্ষা ছিল না, বরং শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা ছিল। খেলার শুরু থেকেই দুই দলই ছিল সতর্ক অবস্থানে। ব্রাজিল বলের দখল ধরে রেখে আক্রমণ সাজানোর চেষ্টা করছিল, আর ইংল্যান্ড সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠছিল।

মাঠে প্রতিটি বলের জন্য লড়াই হচ্ছিল, প্রতিটি পাসের পেছনে ছিল কৌশল, প্রতিটি মুভমেন্টে ছিল হিসাব-নিকাশ। ম্যাচের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে প্রথমার্ধে। ডান দিক থেকে জর্জিনহোর ক্রসে উঁচুতে লাফিয়ে দুর্দান্ত একটি হেড করেন পেলে। বলটি এতটাই শক্তিশালী ও নিখুঁত ছিল যে পেলে নিজেও গোল উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলেন।কিন্তু তখনই ঘটে অলৌকিক কিছু। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক গর্ডন বাঙ্কস ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অবিশ্বাস্যভাবে বলটি পোস্টের বাইরে ঠেলে দেন।

পরে পেলে নিজেই বলেছিলেন, তিনি নিশ্চিত ছিলেন এটি গোল হবে। ফুটবল ইতিহাসে এই মুহূর্তটি পরিচিত হয়ে যায় ‘দ্য সেভ অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে। আজও বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা সেভের আলোচনা উঠলে গর্ডন বাঙ্কসের সেই সেভ সবার আগে চলে আসে।প্রথমার্ধ গোলশূন্য শেষ হলেও ম্যাচের উত্তেজনা একটুও কমেনি। ৫৯তম মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত। আর এই মুহুর্তই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।মাঝমাঠ থেকে গড়ে উঠা আক্রমণে পেলে বল পান বক্সের সামনে। সাধারণ কোনো খেলোয়াড় হয়তো নিজেই শট নিতেন। কিন্তু পেলে দেখলেন ডান দিকে ফাঁকা জায়গায় ছুটে যাচ্ছেন জর্জিননহো। এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনি নিখুঁত পাস বাড়িয়ে দেন।জর্জিনহো শক্তিশালী শটে বল জালে পাঠিয়ে দেন। গর্ডন বাঙ্কস এবার আর কিছুই করতে পারেননি।

গোলটি ছিল ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সৌন্দর্যের প্রতীক—দৃষ্টিশক্তি, সৃজনশীলতা, গতি এবং নিখুঁত সমন্বয়ের এক অনবদ্য উদাহরণ।ম্যাচটির আরেকটি স্মরণীয় দিক ছিল দুই কিংবদন্তি—ববি মুর ও পেলের দ্বৈরথ। ম্যাচজুড়ে মুর অসাধারণ দক্ষতায় পেলেকে সামলানোর চেষ্টা করেছেন। আবার পেলের প্রতিটি স্পর্শে ফুটে উঠেছে তার অসাধারণ প্রতিভা।খেলা শেষে দুজনের জার্সি বিনিময়ের দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ছবিতে পরিণত হয়। আজও সেই ছবি খেলাধুলার সৌহার্দ্য, সম্মান ও মহত্ত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ব্রাজিলের ১-০ জয় হয়তো স্কোরলাইনের বিচারে খুব বড় কিছু ছিল না। কিন্তু এর প্রতীকী গুরুত্ব ছিল বিশাল।

এই ম্যাচে ব্রাজিল দেখিয়ে দেয় যে তারা আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে ফিরে এসেছে। ১৯৬৬ সালের ব্যর্থতা কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল।অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জন্য এটি ছিল ধীরে ধীরে আধিপত্য হারানোর শুরুর ইঙ্গিত। যদিও তারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল, তবু ১৯৬৬ সালের অপ্রতিরোধ্য ইংল্যান্ড আর আগের জায়গায় ফিরতে পারেনি।অনেক ফুটবল ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই ম্যাচে বিশ্ব ফুটবল নতুন দিকনির্দেশনা পেয়েছিল। রক্ষণাত্মক ও ফলকেন্দ্রিক ফুটবলের বিপরীতে আক্রমণাত্মক, সৃজনশীল ও দর্শনীয় ফুটবল যে বিশ্বকে মুগ্ধ করতে পারে, ব্রাজিল সেটিই প্রমাণ করেছিল।

এরপরের গল্প সবাই জানে। ফাইনালে ইতালিকে ৪-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় ব্রাজিল। সেই দলের অনেকেই আজও সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ দলের সদস্য হিসেবে বিবেচিত হন।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই বিশ্বকাপের কথা উঠলে শুধু ফাইনালের কথা নয়, বারবার ফিরে আসে ব্রাজিল-ইংল্যান্ড ম্যাচের স্মৃতি। কারণ এটি ছিল এমন এক ম্যাচ যেখানে ফলাফলের চেয়ে বড় ছিল ফুটবলের সৌন্দর্য, কৌশল, ব্যক্তিগত মাহাত্ম এবং ইতিহাসের প্রবাহ।৫৬ বছর পরও ম্যাচটি কেবল একটি ১-০ জয় নয়। এটি এমন এক লড়াই, যেখানে মুখোমুখি হয়েছিল দুই ফুটবল সভ্যতা, দুই যুগ এবং দুই দর্শন। আর সেই কারণেই ব্রাজিল-ইংল্যান্ডের ১৯৭০ সালের লড়াই আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে অমর ম্যাচগুলোর একটি।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102