দিনের আলো হোক কিংবা গভীর রাত পদ্মার চরজুড়ে চলছে একের পর এক এক্সক্যাভেটরের গর্জন। নদীর চর ও ফসলি জমি কেটে ট্রাক, ডামট্রাক ও ট্রাক্টরে করে সেই মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ অবৈধ মাটি-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে হারিয়ে যাচ্ছে উর্বর কৃষিজমি, অন্যদিকে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক গতিপথও পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের চররূপপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর চরের বিস্তীর্ণ অংশে ভেকু দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। মাটি কেটে বড় বড় স্তূপ করে রাখা হয়েছে পাশের কয়েকটি ইটভাটায়। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই কার্যক্রম। প্রশাসনের নজরদারি এড়াতেই রাতকে বেছে নেয় মাটিখেকো চক্র।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার কারণে পদ্মার ভেতরে আলাদা নালার মতো সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নদীর স্রোতের দিক পরিবর্তিত হয়ে আশপাশের ফসলি জমি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বাড়লে ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হতে পারে। এতে শুধু কৃষিজমিই নয়, বসতবাড়ি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধও ঝুঁকিতে পড়বে। তারা অবিলম্বে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
চররূপপুর গ্রামের এক কৃষক বলেন, ‘আগে যেখানে ধান আর পাট চাষ হতো, এখন সেখানে বড় বড় গর্ত। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে চরের অনেক জমিই নদীতে চলে যাবে।’
আরেক ভুক্তভোগী জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘অবাধে মাটি কাটায় বর্ষায় নদীভাঙনের শঙ্কা বাড়ছে। এ ছাড়া মাটি পরিবহনের ভারী যানবাহনের চাপে রাস্তা ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী
হয়ে পড়েছে। রাতভর ভেকু আর গাড়ির শব্দে ঘুমাতে পারি না।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করেই এই ব্যবসা চলছে বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী। তাঁর ভাষ্য, মাটি সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক কামাল হোসেন ওরফে ‘মাটি কামাল’। এ বিষয়ে কথা বলতে কামাল হোসেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি এক্সকাভেটরের জন্য প্রতি রাতে ১৩ হাজার টাকা দেওয়া হয় পুলিশকে।’
যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঈশ্বরদী থানার ওসি আশাদুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, রাতে চুরি করে মাটি কাটা হতে পারে তবে পুলিশের তৎপরতায় দিনে মাটি কাটা বন্ধ আছে।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন সবুজ পৃথিবী ঈশ্বরদী শাখার সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ করলে ভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়। অপরিকল্পিত মাটি কাটা দীর্ঘ মেয়াদে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। অনৈতিক এ প্রবনতা রোধে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার বলেন, ‘অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। রাতে মাটি কাটার খবর পেয়ে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালিয়ে যায়।’ পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান সরকার সমকাল প্রতিবেদককে বলেন, ফসলি জমি কিংবা নদী থেকে মাটি কাটার জন্য কোনো অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। চুরি করে মাটি কাটা হলে তা প্রশাসন দেখবে। এ বিষয়ে ঈশ্বরদী থানার ওসিকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।