আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। পর্দা উঠছে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের।
নিজের দেশের অংশগ্রহণ না থাকলেও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের এ নিয়ে উৎসাহের কমতি নেই। সমর্থকদের মধ্যে হিড়িক পড়েছে পছন্দের দলের জার্সি কেনার। পিছিয়ে নেই নেত্রকোনার কেন্দুয়ার ফুটবলপ্রেমীরাও।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বকাপ ঘিরে কেন্দুয়ায় বেশি বিক্রি হচ্ছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দলের জার্সি।
উপজেলার বিভিন্ন ক্রীড়া সামগ্রীর দোকানগুলোতে এখন ভীষণ ভিড়। বিভিন্ন এলাকায় দুই দলের সমর্থকরা প্রতিপক্ষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে করছে নানা আয়োজন। শেষ মুহূর্তে কোনো কোনো এলাকায় আনন্দ শোডাউন ও মিছিলও করছে তারা।
সরেজমিন উপজেলার মধ্যবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার দোকানগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন তারা।
দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল দলের সমর্থকরা জার্সি কেনার জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় করছেন। চায়ের কাপে ঝড় তোলা ছাড়াও পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শহরের অলিগলিতে এখন ফুটবল নিয়ে তুমুল আলোচনা।
গোলাপ নামের এক পোশাক ব্যবসায়ী জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য জার্সি বিক্রি বেড়েছে। তবে দাম একটু বেশি। বিভিন্ন মানের জার্সি বিক্রি হচ্ছে।
২৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা এবং ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া জার্সিতে প্রিয় খেলোয়াড় কিংবা নিজের নাম লেখাতে অতিরিক্ত ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
বেচাকেনা নিয়ে আরেক ব্যবসায়ী রইছ উদ্দিন বলেন, ঈদের আগেই বিক্রি ভালো ছিল। অনেকেই বাড়িতে যাওয়ার সময় সন্তানদের জন্য জার্সি-পতাকা কিনে নিয়েছেন। এবার ব্রাজিল ও আর্জন্টিনার পতাকা তুলনামূলক বেশি বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, খেলা শুরু হলে বিক্রি বাড়বে আশা করি। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পাশাপাশি স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স ও জার্মানির পতাকাও বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে জার্সি কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছেলে নেইমারের ভক্ত। তাই ব্রাজিলের জার্সি কিনেছি। জার্সিতে ওর নামও লিখে দেব।’
আরেক শিক্ষার্থী রাকিব বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। বিশ্বকাপ এলেই বন্ধুদের সঙ্গে নতুন জার্সি কিনি। এবার মেসির শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে, তাই বিশেষভাবে আর্জেন্টিনার জার্সি কিনেছি।’
জার্সি কিনতে আসা গৃহিণী নাসরিন আক্তার বলেন, ‘আমার দুই ছেলে-মেয়ে ব্রাজিলের ভক্ত। ওদের জন্য জার্সি কিনেছি। বিশ্বকাপ ঘিরে বাসায়ও আলাদা একটা উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে।’
অন্যদিকে দোকানে ব্যানার তৈরি করাতে আসা ব্রাজিল সমর্থক শফিক ও জাকির বলেন, ‘আমাদের এলাকার প্রায় ১০০ জন মিলে টাকা তুলে বিশাল ব্যানার তৈরি করিয়েছি। বিশ্বকাপ উপলক্ষে প্রিয় দলকে শুভেচ্ছা জানাতেই এই আয়োজন।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সমর্থক গোলাপ ও আয়েশ জানান, তারা বন্ধুরা মিলে জমানো টাকা দিয়ে আর্জেন্টিনা ও মেসির ছবিসহ বড় ব্যানার তৈরি করাচ্ছেন।
ডিজিটাল সাইন ও প্রিন্টিং ব্যবসায়ী পাপ্পু জানান, নির্বাচন বা ঈদ মৌসুমের মতোই এখন তাদের ব্যবসা চাঙ্গা। প্রতিদিন শত শত তরুণ কম্পিউটারের পাশে বসে নিজেদের পছন্দমতো ডিজাইন করে ব্যানার তৈরি করছেন। কাজের চাপ এতই বেশি যে, ব্যবসায়ীদের সারা দিনের পাশাপাশি রাত জেগেও প্রিন্টিংয়ের কাজ করতে হচ্ছে।
ব্রাজিল সমর্থক সাবেক ফুটবলার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ফুটবল মানেই ব্রাজিল, ব্রাজিল মানে ফুটবল’—এই কথাটা সবারই মানতে হবে। ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য দেখে মূলত আমি ব্রাজিল দল সমর্থন করি। বর্তমানে কেন্দুয়ার পরিবেশটা পুরোপুরি উৎসবমুখর। শহরজুড়ে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। সব খেলোয়াড়ই ভালো ফর্মে রয়েছে। আমরা আশাবাদী, ব্রাজিল এবার চ্যাম্পিয়ন হবে।
আর্জেন্টিনা সমর্থক আয়েশ উদ্দিন বলেন, বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে আমার প্রত্যাশা ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবগাথার পুনরাবৃত্তি ঘটবে ২০২৬ সালেও। আমার বিশ্বাস, লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আবারও বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ ট্রফি উঠবে আর্জেন্টিনার হাতে।
এদিকে, ফুটবলভক্তদের এই উন্মাদনায় কৌতুলী সাধারণ মানুষও। তারা বলছে, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য এবং ইতিবাচক বিনোদনের পরিবেশ গড়ে তোলাই এই আয়োজনের উদ্দেশ্য। বর্ণাঢ্য শোডাউন, জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্ট আরো নানা কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানান দুই দলের সমর্থকরা।
এ ব্যাপারে কেন্দুয়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের ইমন বলেন, ফুটবল একটি ক্রেজ সৃষ্টিকারী খেলা। বাংলাদেশের ফুটবলে জনপ্রিয়তা রয়েছে ব্যাপক। সেইসঙ্গে দুই বিশ্ব ফেভারিট দল ব্রাজিল–আর্জেন্টিনার রেকর্ড ভক্ত রয়েছে এই দেশে। কেন্দুয়ার চিত্র আরো বৃহৎ। এই উন্মদনা অত্যন্ত সুখকর। এর মাধ্যমের যুবসমাজের মাঝে সুস্থধারা তৈরি হয়। দুই দলের পাল্টাপাল্টি যে শোডাউনসহ অন্যান্য কর্মসূচি, তাতে উপজেলাজুড়ে আনন্দমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, মাঠে বল গড়ানোর আগেই দেশে শুরু হয়ে গেছে মাঠের বাইরের ফুটবল উন্মাদনা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই উন্মাদনা যেন শুধু খেলাই সীমাবদ্ধ থাকে এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়েই শেষ হয় বিশ্ব ফুটবলের এই শ্রেষ্ঠ আসর।