মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০৫:১৮ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারীদের সচেতনতার প্রতি গুরুত্বারোপ নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে ঋণ পাচ্ছেন ১০ লাখ টাকা যত দিন বেঁচে থাকব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আছি : দেব রাজনীতি থেকে অবসরের সম্ভাবনা নাকচ শেখ হাসিনার বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ ০৩ হাজার ৮৯০ কোটি টাকার ১০ (দশ) প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদন আধিপত্যের দ্বন্দ্বে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল হাওরের প্রতিবেশ বিপন্ন, হুমকিতে জীবন-জীবিকা সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর করতে ব্যক্তিগত সহকারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ- চীফ হুইপ মোঃ নূরুল ইসলাম শিগগির হচ্ছে নবম পে-স্কেলের গেজেট, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ

উচ্চশিক্ষায় সংস্কারের গতিপথ: বাজারমুখী দক্ষতা ও মানবিক বিদ্যার সমন্বয় সংকট – অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী

উত্তরা নিউজ প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকের একটি বিশেষ প্রতিবেদন দেশের শিক্ষাঙ্গন ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এক গভীর ভাবনার উদ্রেক করেছে। “বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে”—এমন একটি খসড়া পরিকল্পনার খবর স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো সচেতন নাগরিককে আলোড়িত করে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড গঠন করে যে বিদ্যাগুলো, সেগুলোর ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে এমন তথ্য অত্যন্ত গভীর ও নির্মোহ পর্যালোচনার দাবি রাখে।
বর্তমান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে, তা স্পষ্ট। প্রথাগত, কেবলই সনদ-সর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে একটি দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাস্তব কর্মমুখী শিক্ষাকাঠামো গড়ে তোলার যে নির্দেশনা সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া হয়েছে, তা সময়ের নিরিখে অত্যন্ত যৌক্তিক। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং ও অন্যান্য কারিগরি দক্ষতায় পারদর্শী করে তোলা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যই অপরিহার্য। কিন্তু এই সংস্কারের তোড়ে মানবিক ও মৌলিক জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রগুলো যেন সংকুচিত বা বিলুপ্ত না হয়ে পড়ে, সেদিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
### বাজারের চাহিদা বনাম জাতীয় মনন গঠন
শিক্ষাবিদদের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ—আমাদের প্রচলিত শিক্ষা কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারছে না। ফলে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার গত এক দশকে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যুগের চাহিদা না মেনে, কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা পরিসংখ্যান ছাড়াই বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে এমন কিছু বিষয়ে ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত কোনো বাস্তব কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। এটি এক অর্থে সমাজ ও রাষ্ট্রে শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধির একটি চক্র তৈরি করছে। সরকার যখন এই জটলা ও অপরিকল্পিত পাঠদান কাঠামো ভাঙার উদ্যোগ নেয়, তখন তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। ২০২৭ ও ২০২৮ সালকে লক্ষ্য করে নতুন শিক্ষাক্রম ও ৪টি নতুন বিষয় (যেমন কারিগরি শিক্ষা ও ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’) যুক্ত করার যে কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে, তা তরুণদের আত্মনির্ভরশীল করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তবে আসল প্রশ্নটি দেখা দেয় কৌশলগত জায়গায়। একটি নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের আসন সংখ্যা পুনর্বিন্যাস করা বা যুগের প্রয়োজনে তা সীমিত করা যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু একটি মৌলিক বিদ্যাশাখাকে উপযোগিতার সস্তা দাঁড়িপাল্লায় মেপে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা কতটা বুদ্ধিবৃত্তিক? বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস এবং দর্শন—এই বিষয়গুলো কেবল কিছু তথ্যের সমাহার নয়, এগুলো একটি জাতির আত্মপরিচয়, নৈতিক ভিত্তি ও মননশীলতা গঠনের প্রধান উপাদান। এই শাখাগুলোকে সম্পূর্ণ বাতিল বা অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে এমনভাবে মিলিয়ে দেওয়া, যাতে তাদের মৌলিক গুরুত্ব হারিয়ে যায়, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হতে পারে।

উন্নত বিশ্বের কারিকুলাম ও মানবিক বিদ্যার অবস্থান:
আমরা যখন আধুনিকতা ও উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টানি, তখন আমাদের লক্ষ্য করা উচিত তারা কীভাবে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করে। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড বা ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (MIT) মতো বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু কখনো মানবিক বিদ্যাকে অবহেলা করেনি। বরং উন্নত দেশগুলোর কারিকুলামে স্বদেশী সাহিত্য, ভাষা, দর্শন ও ইতিহাসের চর্চাকে শিক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ মনে করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লিবারেল আর্টস এডুকেশন মডেলের দিকে তাকালে দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থী কম্পিউটার সায়েন্স বা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়ন করলেও তাকে বাধ্যতামূলকভাবে দর্শন, ইতিহাস ও সাহিত্যের নির্দিষ্ট কিছু কোর্স সম্পন্ন করতে হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে ক্ষমতা দেয়, কিন্তু সেই ক্ষমতার মানবিক ও নৈতিক ব্যবহার শেখায় দর্শন ও সাহিত্য। প্রযুক্তি যখন মানবিকতাহীন হয়, তখন তা ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সে কারণেই উন্নত বিশ্বে প্রকৌশল ও চিকিৎসার শিক্ষার্থীদেরও সমাজ ও দর্শন পাঠ করানো হয়। ইউরোপের শিক্ষাকাঠামোতে প্রাচীনকাল থেকেই দর্শন ও ইতিহাসকে সমস্ত জ্ঞানের জননী (Mother of all sciences) বলে বিবেচনা করা হয়। একজন মানুষ কেবল একজন ভালো প্রোগ্রামার বা দক্ষ হিসাবরক্ষক হলেই চলে না, তাকে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের প্রতি সংবেদনশীল হতে হয়। ইতিহাস পাঠ একজন শিক্ষার্থীকে তার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করে, যা তার মধ্যে দেশপ্রেম ও নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। দর্শন শিক্ষা দেয় যুক্তি, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা (Critical Thinking) এবং নৈতিক মূল্যবোধ। বাংলা সাহিত্য আমাদের শেখায় সহমর্মিতা ও সংস্কৃতির শিকড়কে ধারণ করতে। এই বিষয়গুলো যদি আমাদের তরুণদের পাঠ্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে আমরা হয়তো দক্ষ কিছু ‘রোবট’ তৈরি করতে পারব, কিন্তু মানবিক ও নৈতিকাদর্শে উদ্বুদ্ধ প্রকৃত নাগরিক তৈরি করতে ব্যর্থ হব। আমাদের দেশে বর্তমান সময়ে যে নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় আমরা দেখছি, তা মূলত শিক্ষার এই মানবিক উপাদানের ঘাটতিরই ফল।

প্রোগ্রাম বাতিল নয়, প্রয়োজন আসন সংখ্যার যৌক্তিক বিন্যাস:
আমরা কোনোভাবেই বাংলা, ইতিহাস বা দর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনার্স প্রোগ্রাম সম্পূর্ণ বাতিলের পক্ষে নই। বরং দেশের প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী আসন সংখ্যার একটি বৈজ্ঞানিক বিন্যাসের পক্ষপাতি। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশে আগামী এক দশকে কতজন বিজ্ঞানী, কতজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, কতজন চিকিৎসক বা কৃষিবিদ প্রয়োজন, তার যেমন একটি হিসাব থাকা দরকার; ঠিক তেমনি রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে কতজন ভাষাবিদ, ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী বা চিন্তাশীল দার্শনিকের প্রয়োজন, তারও একটি সুনির্দিষ্ট অনুপাত থাকা বাঞ্ছনীয়।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ পর্যায়ে যত্রতত্র হাজার হাজার আসনে দর্শন বা ইতিহাস খুলে রেখে বিপুলসংখ্যক তরুণকে কর্মহীন রাখার চিরাচরিত ধারা অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। আসন সংখ্যা সীমিত করে কেবল প্রকৃত মেধাবী ও গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের এই মৌলিক বিষয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে, আসন সংখ্যা হ্রাসের মাধ্যমে যে উদ্বৃত্ত জনবল ও অবকাঠামো পাওয়া যাবে, তা আইটি, সাইবার সিকিউরিটি ও কারিগরি প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার মান যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বাজারের চাহিদার সাথে একটা সুস্থ ভারসাম্য তৈরি হবে।

সমন্বিত কারিকুলামের রূপরেখা ও সুপারিশ:
শিক্ষার এই যুগান্তকারী সংস্কারের উদ্যোগে সরকারকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানাই:
১. উচ্চশিক্ষায় বাধ্যতামূলক কোর্স অন্তর্ভুক্তি:** ডাক্তার, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ বা বাণিজ্য শাখার শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত একটি বা দুটি কোর্স হিসেবে দর্শন, ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্য পাঠ বাধ্যতামূলক করা উচিত। বিজ্ঞান তখনই আশীর্বাদ হয়, যখন তার সঙ্গে মানবিকতার মেলবন্ধন ঘটে। একজন চিকিৎসকের ভেতরে যদি দর্শনের নৈতিক পাঠ না থাকে, তবে তিনি কেবলই একজন ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে পারেন।
২. উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মৌলিক পাঠের বাধ্যবাধকতা: উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত দেশের সকল ধারার শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব, মৌলিক দর্শন, ইতিহাস এবং জাতীয় সংস্কৃতির পাঠ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন, যা তাদের কৈশোরেই একটি শক্ত নৈতিক ভিত্তি দেবে।
৩. পরীক্ষার চাপ হ্রাস ও শিখন ঘণ্টা বৃদ্ধি: এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বিষয় সংখ্যা ও কর্মদিবস কমিয়ে আনার যে পরিকল্পনা এনসিটিবি করেছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। পরীক্ষার দীর্ঘ সূচির কারণে স্কুল-কলেজগুলো মাসের পর মাস বন্ধ থাকায় অন্য শ্রেণির যে লার্নিং আওয়ার্স নষ্ট হয়, তা দূর করা সম্ভব হলে সামগ্রিক শিক্ষার মান বাড়বে।
৪. গবেষণাভিত্তিক আসন নির্ধারণ: দেশ ও বিদেশের কর্মবাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে প্রতি বছর উচ্চশিক্ষার প্রতিটি বিষয়ে আসন সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করা হোক, যেন ডিগ্রি অর্জনের পর তরুণদের বেকারত্বের অভিশাপ বইতে না হয়।

সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা সংস্কারের গভীর চিন্তাভাবনা এবং আন্তরিকতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। যে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা হতে যাচ্ছে, তা বাংলাদেশকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলবে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল অর্থনৈতিক উপযোগিতাই একটি রাষ্ট্রের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। মেধা ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার পাশাপাশি যদি তরুণ প্রজন্মের মননে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও জাতীয় সংস্কৃতির বীজ রোপণ করা না যায়, তবে সেই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সব পক্ষের মতামত নিয়ে প্রযুক্তি ও মানবিকতার এক অনবদ্য সমন্বিত কারিকুলাম উপহার দেবে, যা আমাদের দেবে একাধারে দক্ষ এবং আলোকিত মানুষ।
লেখক: অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী,
ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102