ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক বৈঠকে তেহরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ঘিরে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। আলোচনায় ওয়াশিংটন ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিলেও তেহরান সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য এ ধরনের সীমাবদ্ধতায় সম্মত হতে পারে বলে জানায়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশ পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিতের বিষয়ে প্রস্তাব বিনিময় করলেও সময়সীমা নিয়ে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া চুক্তি কার্যকর হবে না। অন্যদিকে, ইরান স্বল্পমেয়াদি সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বিশ্লেষক ইয়ান ব্রেমার জানিয়েছেন, এ বিরোধের মধ্যেও একটি মধ্যপন্থা হিসেবে প্রায় ১২ বছরের মতো একটি সমঝোতা হতে পারে।
এটি ছিল এক দশকের বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগগুলোর একটি। তবে পারমাণবিক ইস্যুতে অচলাবস্থার কারণে ইসলামাবাদ বৈঠক কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।
আলোচনায় আরও যে বিষয়গুলো ছিল
পারমাণবিক কার্যক্রম ছাড়াও আলোচনায় উঠে আসে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়: হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া, যা বর্তমানে ইরান কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে, ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক উত্তেজনা কমানো।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে আলোচনাটি তিনটি আলাদা অংশে পরিচালিত হয়—একটি মার্কিন প্রতিনিধিদলের জন্য, একটি ইরানি দলের জন্য এবং একটি যৌথ বৈঠকের জন্য, যেখানে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে।
বৈঠকের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকায় প্রতিনিধিদের বারবার বাইরে গিয়ে নিজ নিজ দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়েছে। এতে আলোচনার গতি ব্যাহত হয়।
উত্তেজনা ও অবিশ্বাস
আলোচনার এক পর্যায়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থাহীনতার কথা তুলে ধরে প্রশ্ন তোলেন, ‘কূটনৈতিক আলোচনা চলাকালে আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও কীভাবে আমরা আপনাদের বিশ্বাস করব?’
উল্লেখ্য, জেনেভায় আগের বৈঠকের দুই দিনের মাথায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত হামলা শুরু হয়, যা তেহরানের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।
‘৮০ শতাংশ অগ্রগতি’, তবুও চুক্তি হয়নি
আলোচনায় জড়িত একটি সূত্র জানায়, দুই পক্ষ প্রায় ‘৮০ শতাংশ’ পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল এবং চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে শেষ মুহূর্তে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ঐকমত্য না হওয়ায় আলোচনা ভেঙে যায়।
যদিও শুরুতে উত্তেজনা ছিল তীব্র, রোববার সকালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয় এবং আলোচনার মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনাও দেখা দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান পুরোপুরি বুঝতে পারেনি যে ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য হলো—তেহরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ‘ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারবে না—এটাই আমাদের অটল অবস্থান। আলোচনায় আমাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি।’
সামনে কী?
যদিও ইসলামাবাদ বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে, তবে উভয় পক্ষই আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান আবারও যোগাযোগ করেছে এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই দ্বিতীয় দফা সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে, যা এই অচলাবস্থা কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।