দেশের সর্ববৃহৎ নৌপথ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান এই নৌরুটে গত ১১ বছরে ছোট-বড় ১৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪টি বড় নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে শতাধিক মানুষের। যাত্রী, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পুরোনো পল্টুন, খাড়া ও উঁচু-নিচু রাস্তা এবং ঘাট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবেই বারবার এসব দুর্ঘটনা ঘটছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঘাট এলাকার রাস্তা প্রচণ্ড ঢালু এবং যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী। এই রুট দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন আশরাফুল আলম সবুজ। তিনি বলেন, ‘নৌরুটের নৌপথের চেয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ঘাটগুলোতে। ফেরিতে ওঠা এবং নামার সময় প্রচুর ঝুঁকি থাকে। নিরাপদ বা আরামদায়ক ঘাটের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। যার জন্যই প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রাণহানি ঘটলে কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়।’
আনোয়ার হোসেন নামের আরেক যাত্রী বলেন, ‘টাকা দিয়ে ঘাট পার হয়েও আমরা কোনো সুযোগ-সুবিধা পাই না। লঞ্চ ঘাটের অবস্থা দেখুন; ওপর থেকে নিচে নামতেই হাঁটু ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। বয়স্কদের ফেরি বা লঞ্চ থেকে ওঠানামা করতে অনেক কষ্ট হয়।’
কাজল নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন মালামাল নিয়ে এই নৌরুট দিয়ে ঢাকায় যাই। ফেরিতে ওঠানামা বা লোড-আনলোডের সময় অনেক সময় ট্রাক নদীতে পড়ে যায়। এতে আমাদের অনেক টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। কিন্তু এসব কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না।’
সম্প্রতি এই ঘাটে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর বাস দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির নির্বাহী কমিটির সদস্য মনজুর রহমান। তিনি জানান, ওই দুর্ঘটনায় ২৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে এবং ১৫ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। বাসটিতে প্রায় ৫৫ জন যাত্রী ছিলেন। এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে তিনি জানান, ফেরি ও লঞ্চে ওঠার রাস্তা প্রচণ্ড উঁচু-নিচু এবং পল্টুনগুলো অনেক পুরোনো ও জরাজীর্ণ।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ জানান, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর সাথে তার কথা হয়েছে। ঘাটগুলো পুনরায় মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ‘আমরা অল্প সময় হলো ক্ষমতায় এসেছি। দীর্ঘ সময় বিগত সরকার ছিল। সেই সময়ের অব্যবস্থাপনার কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে নদীভাঙন ও দুর্ঘটনা রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
অন্যদিকে পরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজীব আহসান জানান, দুর্ঘটনা রোধে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘাটগুলোকে স্থায়ী ব্যবস্থাপনার অধীনে আনা হবে। এতে মানুষকে আর ভোগান্তির শিকার হতে হবে না এবং যাত্রীদের স্বস্তি ফিরবে।
বিআইডব্লিউটিসির তথ্যমতে, বিগত ১১ বছরে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুটে ছোট-বড় ১৬টি দুর্ঘটনা ঘটে, যেখানে মোট ১০৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৪টি দুর্ঘটনা হলো:
২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫: মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় পদ্মা নদীতে কার্গোর ধাক্কায় ‘এমভি মোস্তফা-৩’ লঞ্চডুবির ঘটনায় ৮১ জনের প্রাণহানি ঘটে।
২৭ অক্টোবর ২০২১: পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ফেরিঘাটে পুরোনো ও লক্কড়ঝক্কড় ফেরি ‘আমানত শাহ’ ডুবে যায়। এতে প্রাণহানি না ঘটলেও বেশ কয়েকটি যানবাহন ও মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৭ জানুয়ারি ২০২৪: পদ্মা নদীর ঘন কুয়াশার মধ্যে ডুবে যায় ফেরি ‘রজনীগন্ধা’। এ ঘটনায় ১ জন নিহত হন এবং ৯টি ট্রাক ও মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২৫ মার্চ ২০২৬: ফেরিঘাটে ওঠার সময় ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি বাস নদীতে ডুবে যায়। এ ঘটনায় ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয় এবং ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
এ জাতীয় আরো খবর..