সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
দুর্গাপুরে খালের ওপর অবৈধ ৩৫টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির জন্য স্নাতক পাস বাধ্যতামূলক, সরকারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত মিরপুরে সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে এ. খালেক চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের ঈদ উপহার সামগ্রী বিতরণ তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তরা স্কয়ার মার্কেটে তাণ্ডব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে বিএনপি সরকার -কৃষিমন্ত্রী আজ থেকে বিমানবন্দর স্টেশনে থামবে না ঢাকাগামী ৯ ট্রেন খিলক্ষেতে ডেসকোর কাজে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে তিন কর্মীর মৃত্যু ৪২ জেলা পরিষদে দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগ, জামায়াতের প্রতিবাদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদেই জানতে চাওয়া হবে : নাহিদ ইসলাম বিএনপি যা প্রতিশ্রুতি দেয় তা বাস্তবায়ন করে

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির জন্য স্নাতক পাস বাধ্যতামূলক, সরকারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

জাহিদ ইকবাল: শিক্ষা কোনো জাতির জন্য শুধু একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির চেতনা, সমাজ, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ শিলালিপি। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষা শুধুমাত্র পাঠ্যক্রমও নয়—এটি নাগরিক দক্ষতা, নেতৃত্ব প্রকল্প, ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তি। তাই সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যোগ্যতা, নীতিগত বোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় অগ্রগতির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা সভাপতির মতো গুরুদায়িত্বে প্রায়শই শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুর্বলতা দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রী আ. ন. ম. এহছানুল হক মিলনের ঘোষণা—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে স্নাতক পাস বাধ্যতামূলক—একটি যুগান্তকারী ঘোষণা। এটি শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি শিক্ষার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বাংলাদেশে প্রায় ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৩ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৬ হাজার কলেজ এবং প্রায় ৯ হাজার মাদরাসা রয়েছে। এদের অধিকাংশ পরিচালিত হয় স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে। এই কমিটি শিক্ষক নিয়োগ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীর সার্বিক কল্যাণের দায়িত্ব পালন করে। তাই কমিটির নেতৃত্বের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রতিষ্ঠানের সফলতা ও শিক্ষার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদ প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব বা সামাজিক সম্মানের ভিত্তিতে দখল করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্বশিক্ষিত বা সীমিত শিক্ষিত ব্যক্তিরা এই পদে থাকলেও প্রশাসনিক ও একাডেমিক সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে নিতে পারেননি। শিক্ষক নিয়োগ, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার মান নিয়ে অনেক বিতর্ক ও সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দৃষ্টান্তও এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানে স্কুল বোর্ড বা গভর্নিং বডিতে সাধারণত উচ্চশিক্ষিত ও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত মানুষদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা শিক্ষার নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত থাকায় বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত হয়। শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। স্নাতক পাস বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত দেশের শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারী ব্যক্তি অন্তত শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক নীতি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক ধারণা সম্পর্কে অবগত থাকে। এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে যুক্তিসঙ্গত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং বাস্তবসম্মত করে তোলে।

স্বশিক্ষিত বকলমদের যুগ দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ছিল। অনেক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পরিচালিত হতো, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার চেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি নির্বাচন পেতেন। কিন্তু এখন সেই যুগ শেষ। স্বশিক্ষিত বা সীমিত শিক্ষিতদের জয়জয়কার বন্ধ করে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যোগ্যতা এবং শিক্ষাগত মান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি শিক্ষার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়াও, শুধু বিদ্যালয় বা কলেজের ম্যানেজিং কমিটি নয়, এ সিদ্ধান্ত দেশের বৃহত্তর শিক্ষানীতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবে। শিক্ষিত নেতৃত্ব শুধুমাত্র স্কুল-কলেজের মান বৃদ্ধি করবে না; এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা ও জ্ঞানপ্রিয়তার সংস্কৃতিও গড়ে তুলবে। শিক্ষকরা তাদের কাজের প্রতি আরও উৎসাহী হবেন, অভিভাবকের আস্থা বাড়বে এবং শিক্ষার্থীরা একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল পরিবেশে শিক্ষাগ্রহণ করবে। বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে শিক্ষার মানোন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত হলে শিক্ষার পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে। শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করতে পারবে এবং দেশের মানবসম্পদ আরও উন্নত হবে।

এই সিদ্ধান্ত আরও বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে পারে। আজ যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির জন্য স্নাতক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে জাতীয় ও স্থানীয় পরিষদে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের জন্যও শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা জরুরি। সংসদে বসে আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণের জন্য শিক্ষাগত ভিত্তি থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে স্নাতক বাধ্যতামূলক করা হলে পেশার মান বৃদ্ধি পাবে এবং তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি এবং সাংবাদিকতা—এই তিনটি ক্ষেত্র একটি দেশের চিন্তাভাবনা, নীতি এবং সামাজিক চেতনার প্রধান স্তম্ভ। যদি এই তিন স্তম্ভে শিক্ষিত, সচেতন এবং যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ধীরে ধীরে একটি সুশিক্ষিত সমাজ গড়ে উঠবে। এমন একটি সমাজ, যা উন্নত, মানবিক এবং মর্যাদাপূর্ণ হবে।

সরকারকে এজন্য প্রাণঢালা অভিনন্দন, কারণ দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব সমস্যাকে চিহ্নিত করে তার সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া সহজ কাজ নয়। এই সাহসী সিদ্ধান্ত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যোগ্যতা ও শিক্ষার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি শুধু একটি নীতি নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের নির্মাণ প্রকল্প।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102