শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ১০:০২ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:

ইসলামের সমরনীতি : শান্তি প্রতিষ্ঠার নৈতিক সংগ্রাম

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬
ইসলাম মূলত শান্তির ধর্ম। মানুষকে শান্তির পথে আহবান করা এবং সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এর মৌলিক লক্ষ্য। তাই অহেতুক যুদ্ধবিগ্রহ, অশান্তি ও খুনখারাবির প্রতি ইসলাম কখনোই উৎসাহ দেয় না। মানবজাতির শান্তি ও কল্যাণের দূত বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত অপছন্দ করতেন।তাঁর শিক্ষা ছিল, মানুষের মধ্যে শান্তি, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।তবে ইতিহাসে দেখা যায়, মহানবী (সা.) নিজেও কিছু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সাহাবিদের যুদ্ধের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। কিন্তু তাঁর এসব যুদ্ধ কখনো ক্ষমতার লিপ্সা বা পররাজ্য দখলের উদ্দেশ্যে ছিল না। বরং সেগুলো ছিল মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো, নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।শত্রুর চাপিয়ে দেওয়া আগ্রাসনের মুখে আত্মরক্ষা করা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর যুদ্ধের মূল লক্ষ্য।মানব ইতিহাসে বেশির ভাগ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে ক্ষমতার লড়াই, হিংসা কিংবা দুর্বল জাতির ভূখণ্ড দখলের লোভ থেকে। কিন্তু মহানবী (সা.) এ ধরনের বর্বর সমরনীতির পরিবর্তে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক এক নতুন সমরনীতি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নীতিতে যুদ্ধ কখনো ধ্বংসের প্রতীক নয়, বরং তা ছিল অত্যাচার দূর করে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার একটি প্রয়োজনীয় উপায়।এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) মুসলমানদের সতর্ক করেছেন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু নাজর সালিম (রা.) থেকে বর্ণিত, আবু নাজর সালিম (রা.) উমর ইবনে উবাইদুল্লাহর মুক্ত করা গোলাম এবং তাঁর কাতিব (সচিব) ছিলেন। তিনি বলেন, তাঁর কাছে আব্দুল্লাহ  ইবনে আবু আওফা (রা.) চিঠি লিখলেন, আমি তা পড়লাম। তাতে লেখা ছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার কামনা কোরো না, বরং আ—্লাহ তাআলার কাছে নিরাপত্তা কামনা করো। (বুখারি, হাদিস : ৭২৩৭)হাদিসের এই বাণী আমাদের শিক্ষা দেয় যে ইসলাম আগ বাড়িয়ে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা পছন্দ করে না।কিন্তু ইসলাম ও মুসলমানের নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে যুদ্ধ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে, তখন তা থেকে পিছ পা হওয়ার সুযোগ নেই; বরং তখন তলোয়ারের নিচেই জান্নাত। (বুখারি, হাদিস : ২৯৬৬)এসব তথ্য দ্বারা বোঝা যায়, ইসলাম অন্যায়ভাবে যুদ্ধ কামনা করে না, বরং শান্তি কামনাই একজন মুমিনের প্রকৃত মনোভাব হওয়া উচিত। কিন্তু যদি অত্যাচার ও বিপর্যয় নেমে আসে, তখন ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে। জুলুমকে রুখে দিতে হবে। কিন্তু কখনো জুলুম করা যাবে না।আমাদের মহানবী (সা.) যুদ্ধের ক্ষেত্রেও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি সাহাবিদের কঠোরভাবে নির্দেশ দিতেন, ‘শত্রুশিবির থেকে গ্রেপ্তার হলেও তারা যেন কোনো নির্দোষ নারী, শিশু, দুর্বল ও অসমর্থ বৃদ্ধলোককে হত্যা না করে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬১৪)এমনকি তিনি আরো নির্দেশ দিতেন যে ‘তারা যেন ফলন্ত বৃক্ষ না কাটে কিংবা পরাজিতদের সম্পদ বিনষ্ট না করে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৭২৮)যুদ্ধের মধ্যেও এই মানবিক বিধান পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।পবিত্র কোরআনও যুদ্ধকে শুধু আত্মরক্ষা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সীমিত পরিসরে অনুমোদন দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে সেই লোকেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, কিন্তু সীমা অতিক্রম কোরো না। আল্লাহ নিশ্চয়ই সীমা অতিক্রমকারীকে ভালোবাসেন না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯০)এই লড়াই চালাতে হবে, সমাজ থেকে ফিতনা, অত্যাচার, অনাচার নির্মুল করা পর্যন্ত। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ফিতনা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত এবং দ্বিন আ—্লাহর জন্য নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, অতঃপর যদি তারা বিরত হয়, তবে জালিমদের ওপরে ছাড়া কোনো প্রকারের কঠোরতা অবলম্বন জায়েজ হবে না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৩)যেহেতু ইসলামের মূল লক্ষ্য যুদ্ধ নয়, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। তাই কোরআনের নির্দেশ হলো শত্রুপক্ষ সন্ধি করতে আগ্রহী হলে সন্ধি করে নেওয়া। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি তারা সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সেদিকে আগ্রহী হও এবং আল্লাহ রওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৬১)আবার বলা হয়েছে, ‘অতএব, তারা যদি তোমাদের থেকে সরে যায়, অতঃপর তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে এবং তোমাদের কাছে শান্তি প্রস্তাব উপস্থাপন করে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ রাখেননি।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৯০)পবিত্র কোরআন-হাদিসের এসব তথ্য দ্বারা বোঝা যায়, মহানবী (সা.) তাঁর জীবনে এই নীতিগুলোকে কঠোরভাবে অনুসরণ করেছেন। তাঁর সমরনীতি ছিল সুপরিকল্পিত এবং লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের প্রয়োজন হলেও যেন ক্ষয়ক্ষতি কম হয়, মানুষের জীবন ও সম্পদ যতটা সম্ভব নিরাপদ থাকে। তাই বলা যায়, ইসলামের সমরনীতি মূলত শান্তি প্রতিষ্ঠার এক নৈতিক সংগ্রাম, যেখানে অস্ত্রের লক্ষ্য ধ্বংস নয়; বরং ন্যায়, মানবতা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102