বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪০ অপরাহ্ন

রমজানের মাঝপথে আত্মজিজ্ঞাসা

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬
রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এই রমজান মাসের অর্ধেক সময় আমরা ইতিমধ্যে অতিক্রম করে এসেছি। যেই মাস আমাদের সামনে উপনিত হয়েছিল ফিরে আসার আহ্বান নিয়ে, শুদ্ধ হওয়ার আহ্বান নিয়ে, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের আহ্বান নিয়ে। প্রথম রোজার দিনে আমাদের অন্তরে যে আবেগ, যে সংকল্প, যে অশ্রুসিক্ত আবেদন ছিল; মধ্য রমজানে দাঁড়িয়ে কি আমরা সেই একই উষ্ণতা অনুভব করছি? নাকি ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর প্রাত্যহিক অভ্যাসের চাপে সেই উষ্ণতা কিছুটা ম্লান হয়ে গিয়েছে?সময় সত্যিই দ্রুত বয়ে যায়। দিনগুলো, সাহরি ও ইফতারের বরকতময় সময়গুলো গড়িয়ে যাচ্ছে, তারাবির রাকাতগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমাদের হৃদয়ের ভেতর কি কোনো পরিবর্তন ঘটছে? রোজা কি কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার অনুশীলনে সীমাবদ্ধ থাকছে, নাকি তা অন্তরকে নরম করছে, চোখকে সংযত করছে, জিহ্বাকে সত্য ও সৌজন্যের দিকে ফিরাচ্ছে? আমরা কি আগের চেয়ে একটু বেশি ধৈর্যশীল, একটু বেশি বিনয়ী, একটু বেশি দয়ালু হতে পেরেছি?কারণ রমজান তো আত্মার জাগরণের মাস।এ মাসে আকাশের দরজা খোলা রয়েছে, রহমত নাজিল চ্ছে, গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কি আমরা পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করছি? তাই রমজানের মাঝপথে এসে মোজাসাবা জরুরি। নিজেকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন যে, আমার নামাজে কি একাগ্রতা বেড়েছে, কোরআনের আয়াত কি হৃদয়কে বিগলিত করছে, অন্যায়ের প্রতি আমার অবস্থান কি দৃঢ় হয়েছে?আসলে এই সময়টা এক নীরব মোড়। সামনে শেষ দশক, যেখানে রয়েছে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান আর ইতিকাফের নির্জনতা।এর আগে যদি আমরা নিজের ভেতরে তাকাই, তাহলে বাকি সময়টুকু নতুন উদ্যমে সাজানো সম্ভব। তাই রমজানের মাঝপথে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো; আমরা কি এই মাসের প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকে এগোচ্ছি?পবিত্র কোরআনে রোজার উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে: ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা আয়াত : ১৮৩)এ আয়াতে রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন বলা হয়েছে। যার ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) লিখেছেন, রোজা মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে এবং পাপ থেকে বিরত থাকার মানসিক শক্তি তৈরি করে।তিনি বলেন, রোজা শয়তানের প্রভাব দুর্বল করে, কারণ তা মানুষের কামনা-বাসনাকে সংযত করে। (তাফসিরে ইবনে কাসির ২/১৮৩)ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন, তাকওয়া হলো আল্লাহর ভয়কে অন্তরে ধারণ করে তাঁর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকা। রোজা যেহেতু গোপন ইবাদত, তাই এতে রিয়া বা লোকদেখানো প্রবণতা কম থাকে; ফলে এটি সরাসরি তাকওয়া গঠনে ভূমিকা রাখে। (আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন, ২/১৮৩)এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের রোজা কি সত্যিই তাকওয়া তৈরি করছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)এই হাদিস আমাদের সামনে আয়নার মতো সত্য তুলে ধরে।রোজা শুধু খাদ্য ত্যাগের নাম নয়; এটি জিহ্বা, চোখ, কান ও অন্তরের সংযমের নাম। যদি রমজানের মাঝপথে এসে আমরা দেখি যে, মিথ্যা, গীবত, হিংসা, দুর্নীতি বা অন্যায় আচরণ আমাদের জীবন থেকে কমেনি, তবে বুঝতে হবে রোজার আত্মিক ফল আমরা পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি।রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন: ‘কত রোজাদার আছে, যার রোজা থেকে প্রাপ্তি শুধু ক্ষুধা।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৯০)এ হাদিস আমাদের ভাবিয়ে তোলে। রোজা যদি চরিত্র গঠন না করে, তাহলে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। তাই মাঝপথে এসে আত্মসমালোচনা অতীব জরুরি।রমজান কোরআনের মাস। মহান আল্লাহ বলেন: ‘রমজান সেই মাস, যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। (সুরা আল-বাকারা আয়াত : ১৮৫)ইমাম শাফেয়ী রহ. রমজানে অধিক কোরআন তিলাওয়াতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। ইমাম মালিক রহ. রমজান শুরু হলে হাদিস পাঠের আসর কমিয়ে কোরআন পাঠে মনোনিবেশ করতেন। (ইবন রজব, লাতায়িফুল মা‘আরিফ) এসব ঐতিহাসিক তথ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রমজান শুধু সামাজিক উৎসব নয়; এটি কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের সময়। মধ্য রমজানে আমারে হিসাব মিলানো দরকার আমরা কোরআনের সাথে কতোটুকু সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছি?আত্মসমালোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো আমল ও চরিত্রের ধারাবাহিকতা। আল্লাহ বলেন: নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক সম্মানিত, যে অধিক তাকওয়াবান। (সুরা হুজুরাত আয়াত : ১৩)ইমাম নববী রহ. তাকওয়ার ব্যাখ্যায় বলেন, এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয় এবং গোপনে-প্রকাশ্যে তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকে। (শরহু সহিহ মুসলিম, ভূমিকা অংশে তাকওয়ার আলোচনা)রমজানের মাঝপথে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা উচিত; আমার নামাজে কি একাগ্রতা বেড়েছে? কোরআনের সঙ্গে কি নিয়মিত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে? গরিব ও অভাবীদের প্রতি সহমর্মিতা কি গভীর হয়েছে? আমার রাগ, অহংকার ও ভাষার কটুতা কি কমেছে?সুতরাং রমজানের মাঝপথে দাঁড়িয়ে আমাদের হিসাব শুধু অতীত কয়েক দিনের নয়; বরং বাকি দিনগুলোকে কীভাবে অর্থবহ করব, তারও পরিকল্পনার। রোজা যদি তাকওয়া, সংযম, কোরআনপ্রেম ও মানবিকতা বৃদ্ধি না করে, তবে আমাদের নতুন করে শুরু করতে হবে। আর যদি সামান্য হলেও পরিবর্তন এসে থাকে, তবে সেটিকে স্থায়ী রূপ দিতে হবে।রমজান চলে যায়, কিন্তু তাকওয়ার প্রয়োজন সারা বছর। তাই এই মাঝপথে দাঁড়িয়ে সৎ সাহসে নিজের হৃদয়ের দিকে তাকানোই হতে পারে রমজানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।আসুন, আমরা এই মাঝপথকে অবহেলা না করি। এখনও সময় আছে। যে গাফলতি হয়েছে, তা স্বীকার করে নেওয়াই তো তাওবার প্রথম ধাপ। আল্লাহর দরজা এখনও খোলা, রহমতের ধারা এখনও প্রবাহমান। আজ রাতে, এই মুহূর্তে আমরা যদি আন্তরিকভাবে বলি; হে আল্লাহ, আমাদের রোজাকে কবুল করুন, আমাদের ত্রুটি মাফ করুন, আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করুন। তবে নিশ্চয়ই তিনি নিরাশ করবেন না।রমজান চলে যাবে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ছাপ যেন আমাদের জীবনে থেকে যায়। তাই আসুন, আমরা শুধু ক্ষুধার কষ্ট নয়, গুনাহের কষ্টও অনুভব করি; শুধু ইফতারের আনন্দ নয়, ক্ষমা পাওয়ার আনন্দও খুঁজি। বাকি দিনগুলোকে এমনভাবে সাজাই, যেন ঈদের দিন আমরা শুধু নতুন পোশাকে নয়, নতুন হৃদয় নিয়েও দাঁড়াতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102