বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:৩২ অপরাহ্ন

পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট রাখতে কোরআনের নির্দেশনা

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৫৩

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

وَ قُلۡ لِّعِبَادِیۡ یَقُوۡلُوا الَّتِیۡ هِیَ اَحۡسَنُ ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ یَنۡزَغُ بَیۡنَهُمۡ ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ كَانَ لِلۡاِنۡسَانِ عَدُوًّا مُّبِیۡنًا ﴿۵۳﴾

সরল অনুবাদ

৫৩. আর আমার বান্দাদের বলুন, তারা যেন এমন কথা বলে যা উত্তম। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উসকানি দেয়; নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

সুরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াতটিতে তিনটি মূল বিষয় রয়েছে :
১. উত্তম ও কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ
২. মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করার ক্ষেত্রে শয়তানের ভূমিকা
৩. শয়তানের প্রকাশ্য শত্রুতা সম্পর্কে সতর্কতা

এটি শুধু ব্যক্তিগত আচার-ব্যবহারের শিক্ষা নয়; বরং পারিবারিক, সামাজিক ও দ্বিনি পরিবেশে শান্তি রক্ষার একটি মৌলিক নীতি।

ইমাম তাবারী (রহ.) বলেন, এখানে “الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ” অর্থ এমন কথা, যা নম্র, সত্য, ন্যায়সঙ্গত এবং হৃদয়গ্রাহী।তিনি উল্লেখ করেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যেন তারা একে অপরের সঙ্গে এমন ভাষায় কথা বলে যা ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি না করে। তিনি আরো বলেন, কঠোর, তিক্ত বা অপমানজনক কথা শয়তানের জন্য সুযোগ তৈরি করে। তখন শয়তান মানুষের মনে রাগ, প্রতিশোধ ও বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দেয় এবং সামান্য কথাকে বড় সংঘাতে পরিণত করে। (তাফসির আত-তাবারী)ইবনে কাসীর (রহ.) লিখেছেন, এই আয়াতের অর্থ হলো মুসলমানরা যেন সব অবস্থায় সর্বোত্তম পদ্ধতিতে কথা বলে—বিশেষ করে বিরোধ বা মতভেদের সময়।তিনি বলেন, কঠোর ভাষা মানুষকে উসকে দেয়, তারপর শয়তান সেই উত্তেজনাকে বাড়িয়ে দেয়; ফলাফল হয় শত্রুতা, বিভেদ ও কখনো সহিংসতা। তিনি আরো উল্লেখ করেন, এই আয়াতটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক, দাওয়াত, বিতর্ক এবং মতবিরোধের ক্ষেত্রে। (তাফসির ইবনে কাসীর)ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, ‘উত্তম কথা’ বলতে বোঝায়—নরম ভাষা, সম্মানজনক সম্বোধন, অপমান ও কটূক্তি থেকে বিরত থাকা;  এমন কথা বলা যা হৃদয়ে প্রশান্তি আনে।তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে অধিকাংশ ঝগড়া শুরু হয় কথার মাধ্যমে।একটি কঠিন বাক্য কখনো বছরের সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। আর শয়তান এই সুযোগটাই খোঁজে। (আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন)ইমাম রাজী (রহ.) এই আয়াতকে মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, মানুষের অন্তরে ক্রোধ ও অহংকারের প্রবণতা থাকে। কঠিন ভাষা সেই প্রবণতাকে উসকে দেয়।তখন শয়তান সেই আবেগকে বাড়িয়ে দেয় এবং মানুষ যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলে।

আয়াতের বাস্তব শিক্ষা

১. কথার মধ্যেই শান্তি ও অশান্তির বীজ থাকে
২. মতভেদ হলে ভাষা আরো কোমল হওয়া উচিত
৩. সামাজিক বিভেদ ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের পেছনে শয়তানের প্ররোচনা থাকে
৪. বিতর্কে জিতার চেয়ে সম্পর্ক রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ
৫. দাওয়াত, শিক্ষা, পরিবার, রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই উত্তম ভাষা ইসলামের নির্দেশএই আয়াত মানুষকে ভাষার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের শিক্ষা দেয়। অনেক সময় মানুষ নামাজ-রোজায় যত্নবান হলেও কথাবার্তায় অসতর্ক থাকে, অথচ সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ হয় ভাষা। আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে দিয়েছেন, কঠোর ও তিক্ত বাক্য শুধু মানুষের হৃদয় ভাঙে না, বরং শয়তানের কাজকে সহজ করে দেয়। তাই একজন মুমিনের পরিচয় হলো— তার ভাষা হবে কোমল, সম্মানজনক এবং কল্যাণমুখী।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102