রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

রংপুর অঞ্চলে জামায়াতের উত্থান যে কারণে

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের ১৯টিতেই বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। ১৭টি আসনে সরাসরি জামায়াতের প্রার্থী এবং দুটি আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন শক্তির উত্থান নিশ্চিত করেছে দলটি। বিএনপির প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে বড় ব্যবধানে জয় এবং জাতীয় পার্টির তৃতীয় স্থানে নেমে যাওয়ার এই ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে রংপুর বিভাগে মাত্র একটি করে আসনে জয় পেয়েছিল জামায়াত। ২০০১ সালে বিভাগে জামায়াতের আসন বেড়ে চারটি হলেও ২০০৮ সালে এসে একটি আসনও পায়নি দলটি।অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির একচ্ছত্র আধিপত্যে থাকা এই অঞ্চলে দলের প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জেলে  থেকে প্রার্থী হন। পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সব কটিতেই জয় পেয়েছিলেন তিনি।সেই নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ১৭টি আসন পায় জাপা। ১৯৯১ সালের পর আরো তিনটি নির্বাচনে বিভাগে ভালো ফল করে দলটি। ১৯৯৬ সালে ২১টি, ২০০১ সালের নির্বাচনে ১৪টি এবং ২০০৮ সালে রংপুর বিভাগ থেকে ১২টি আসন পায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে রংপুর বিভাগে সাত, আর ২০২৪ সালের আওয়ামী লীগের   ‘ডামি’ নির্বাচনে রংপুর বিভাগে মেলে তিনটি আসন।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের অভূতপূর্ব জয়ের পর দলটির নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলভিত্তিক সাংগঠনিক কাজ, নিয়মিত কর্মসূচি ও প্রার্থী বাছাইয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্তের ফলেই এ সাফল্য এসেছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক  ছিল তরুণ ও নারী ভোটাররা। দেশের মোট ভোটারের একটি বড় অংশ এখন তরুণ প্রজন্ম। কর্মসংস্থান, শিক্ষার মান, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান-এসব ইস্যুতে তারা স্পষ্ট বক্তব্য খুঁজছিল। প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বাইরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা, রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য এবং ইস্যুভিত্তিক বক্তব্য তরুণদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।বিশেষ করে অনলাইন প্লাটফর্মে সংগঠিত প্রচারণা এবং তাতে  তরুণদের সক্রিয়তা দলটির পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।এছাড়া নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-এসব বিষয়কে সামনে রেখে দেওয়া প্রতিশ্রুতি নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। মাঠপর্যায়ে নারী কর্মীদের সক্রিয়তা এবং পরিবারভিত্তিক যোগাযোগ ও ধর্মভিত্তিক প্রচারণার কৌশল নির্বাচনের ফলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একইসঙ্গে দলটির নারী কর্মীদের সরাসরি ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছে ভোটের দিনে সেই ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করায় বড় সাফল্য পেয়েছে। অনেক এলাকায় দেখা গেছে, নারী ভোটারদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল সাধারণ মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক অসন্তোষ অনেক ভোটারকে বিকল্প খোঁজার দিকে ঠেলে দেয়। সেই জায়গায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পেরে জামায়াত সুবিধা পেয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ের প্রচারণায়ও ছিল ভিন্নতা। ছোট ছোট সভা, ঘরোয়া বৈঠক এবং সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময়-এসব কৌশল প্রচলিত বড় সমাবেশের চেয়ে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তৃণমূল সংগঠনগুলোকে সক্রিয় রেখে কেন্দ্রীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কৌশলও কাজ করেছে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং সমন্বিত প্রচারণা তাদের এ সাফল্যের একটি বড় কারণ।

অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতাও ফলে প্রভাব ফেলেছে। কোথাও কোথাও প্রার্থী বাছাই নিয়ে অসন্তোষ, কোথাও জোট সমীকরণের জটিলতা ভোটে বিভাজন তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে জামায়াত।

নির্বাচনের ফল অনুযায়ী দেখা গেছে, রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের ১৯টিতেই বিএনপিকে হারিয়ে ১১ দলীয় জোটের ১৭ জন জামায়াত এবং দুইজন এনসিপি থেকে এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ১৪টি বিএনপির কাছে দলটি হেরে গেলেও শুধু ঠাঁকুরগাও-১ আসন ছাড়া ১৩টিতেই বিএনপির সঙ্গে ভোটের ব্যবধান মাত্র পাঁচ থেকে ২০ হাজারের মধ্যে। আর জাতীয় পার্টির সঙ্গে জামায়াতের ভোটের ব্যবধান ৯০ শতাংশেরও বেশি।

রংপুর বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনের ফল নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য এ টি এম আজম খান বলেন, মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে। যেটা সারা দেশের ভোটের পরিসংখ্যান দেখলে বুঝতে পারবেন। এছাড়া জনগণের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে জামায়াত। তাই মানুষ পরিবর্তনের সুযোগকে বেছে নিয়েছে।

বিএনপি কম আসন পেল কেন
১৯৯১ সালে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র একটি ও ১৯৯৬ সালে তিনটি আসন পায় বিএনপি। ২০০১ সালে দলটি এই বিভাগে ৯টি আসন পায়। তবে ২০০৮ সালে জামায়াতের মতো বিএনপিও এই বিভাগে কোনো আসন পায়নি।

রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার কয়েকজন বিএনপি নেতার সঙ্গে কথা হলে তাঁরা বলেন, এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগে বিএনপির আরো  ভালো করার সুযোগ ছিল। কিন্তু নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, তৃণমূল কর্মীদের অবম্যূল্যায়ন-এসব কারণে সেই সুযোগ ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি।

তবে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে জনগণ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে। যেখানে বিএনপির প্রার্থীরা হেরেছেন, সেখানে ভোটের ব্যবধান খুব অল্প হয়েছে। অনেক জায়গায় ভোটাররা বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে ভোট দিয়েছে; মাঝখান দিয়ে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। ভালোভাবে সাংগঠনিক কাজ করলে আগামীতে ভালো হবে।’

রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ত্বহা হোসাইন বলেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতায় ভোটাররা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির মতো সুসংগঠিত ও পুনর্গঠিত শক্তির দিকে ঝুঁকেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা জাতীয় পার্টির পরিবর্তে নতুন শক্তির ওপর আস্থা রেখেছে। এজন্য জাতীয় পার্টির এমন বিপর্যয় হয়েছে। রংপুরে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল, স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় ও উদ্দীপনার ঘাটতি, হেভিওয়েট প্রার্থী বাদ দিয়ে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া সুযোগ নেয় তারা।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, এই ফল ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তরুণ ও নারী ভোটারদের উপেক্ষা করে কোনো দলই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে না। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংক্রান্ত সমস্যাগুলোকে প্রাধান্য দিতে না পারলে ভোটের সমীকরণ দ্রুত বদলে যেতে পারে।

ফখরুল আনাম আরো বলেন, এই ফলের পেছনে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক নেতৃত্বের দুর্বলতাও ছিল। তাঁরা কী করতে চান, তার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। তাঁরা রংপুর অঞ্চলের মানুষের ইমোশন (আবেগ) নিয়ে রাজনীতি করেছেন। কিন্তু মানুষ এবার সেই ইমোশন থেকে বেরিয়ে এসেছে, যেটা কাজে লাগিয়েছে জামায়াত।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102