এই আয়াতে আল্লাহর ‘সৈন্য’ বলতে বোঝানো হয়েছে তাঁর ধার্মিক, ঈমানদার ও অনুগত বান্দাদের, যারা আল্লাহর প্রিয় বন্ধু ও মিত্র। তারা আল্লাহর আনুগত্য করে, কখনোই তাঁর অবাধ্য হয় না এবং যা আদেশ করা হয় তা-ই পালন করে। তারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ইবাদত করে, তাঁর বিধান অনুসরণ করে এবং তাঁর রাসুল (সা.) এর সুন্নাহ মেনে চলে, কোনো রকম ভণ্ডামি, প্রদর্শন কিংবা অহংকার ছাড়াই।
পঙ্গপাল, উকুন ও ব্যাঙও আল্লাহর সৈন্য : আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘অতঃপর আমরা তাদের ওপর প্রেরণ করেছিলাম বন্যা, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে। তবু তারা অহংকার করেছিল এবং তারা ছিল অপরাধী এক জাতি।’
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৩৩)
আল্লাহ যাকে যেমনভাবে চান, যাকে দিয়ে যা ইচ্ছা করান। কখনো তিনি তাঁর অনুগত বান্দাদের মাধ্যমে সাহায্য পাঠান, আবার কখনো ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বলে মনে হওয়া সৃষ্টিকেও শাস্তির মাধ্যম বানান। সব কিছু আল্লাহর আদেশে এবং তাঁর ইচ্ছাধীন।
প্রাকৃতিক ঘটনাও আল্লাহর সৈন্য : প্রাকৃতিক ঘটনাপ্রবাহ আল্লাহ তাআলার সৈন্য। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, তাঁর আদেশ ও ইচ্ছার অধীনেই প্রাকৃতিক ঘটনা সংঘটিত হয়। আর এই প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বাতাস ও বৃষ্টি। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন : ‘পানি ও বাতাস, এই দুটি আল্লাহর সৈন্য। আর বাতাস হলো আল্লাহর সৈন্যদের মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী।’
(সুয়ুতি, আসরারুল কাউন, পৃষ্ঠা : ৭৮)
আল্লাহ তাআলা আদ জাতিকে বাতাসের মাধ্যমেই শাস্তি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন : ‘আর আদ জাতির ক্ষেত্রে-যখন আমি তাদের ওপর এক অনুর্বর ধ্বংসাত্মক বাতাস প্রেরণ করেছিলাম।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৪১)
এভাবেই আল্লাহ তাআলা নুহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ওপর যে শাস্তি নাজিল করেছিলেন, সে সম্পর্কে তিনি বলেন : ‘নুহের সম্প্রদায় এর আগেই অস্বীকার করেছিল। তারা আমাদের বান্দাকে মিথ্যাবাদী বলেছিল এবং বলেছিল, ‘সে তো এক উন্মাদ।’ আর তাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করা হয়েছিল। তখন সে তার প্রতিপালককে ডেকে বলেছিল, ‘নিশ্চয়ই আমি পরাজিত, অতএব আপনি সাহায্য করুন।’ অতঃপর আমরা প্রবল মুষলধারে বৃষ্টির মাধ্যমে আকাশের দরজাগুলো খুলে দিয়েছিলাম।’ (সুরা : কামার, আয়াত : ৯-১১) অতএব বাতাস, বৃষ্টি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তি কোনো স্বাধীন বা স্বতন্ত্র ক্ষমতার অধিকারী নয়; বরং এগুলো আল্লাহর আদেশে পরিচালিত তাঁরই সৈন্য, যাদের মাধ্যমে তিনি কখনো রহমত বর্ষণ করেন, আবার কখনো শাস্তি কার্যকর করেন।
প্লাবন, ভূমিকম্প ও ভূমিধস আল্লাহর সৈন্য : আল্লাহর সৈন্য হিসেবে মহাবন্যার কথা কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘অতঃপর আমি তাদের ওপর প্রেরণ করেছিলাম বন্যা, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে। তবু তারা অহংকার করেছিল এবং তারা ছিল এক অপরাধী জাতি।’
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৩৩)
কোরআনে ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘কিন্তু তারা তাকে অস্বীকার করেছিল। ফলে ভূমিকম্প তাদের পাকড়াও করল, আর তারা নিজ নিজ ঘরে মৃত অবস্থায় পড়ে রইল।’
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৭৮)
বজ্রপাত ও মহামারি আল্লাহর সৈন্য : বজ্রপাত সম্পর্কেও কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আর সামুদ জাতির ব্যাপারে—যখন তাদের বলা হয়েছিল, ‘কিছু সময়ের জন্য ভোগ করে নাও’, তখন তারা তাদের প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করেছিল। ফলে বজ্রপাত তাদের পাকড়াও করল, যখন তারা তা স্বচক্ষে দেখছিল।’
(সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৪৩-৪৪)
সুতরাং বজ্রপাতও আল্লাহর আদেশাধীন এক শক্তিশালী মাধ্যম, যার দ্বারা তিনি অবাধ্য জাতিকে শাস্তি দিয়েছেন।
এভাবেই রোগব্যাধি ও মহামারি আল্লাহর সৈন্যদের অন্তর্ভুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া নানা জীবাণু ও ভাইরাস সবই আল্লাহর সৃষ্ট এবং তাঁর ইচ্ছাধীন। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাস হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র জীব, যেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলো দেখতে হলে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের প্রয়োজন হয়, যা লাখ লাখ গুণ বড় করে দেখায়। অথচ এই অতিক্ষুদ্র সৃষ্টিগুলোই তাদের প্রভাবের দিক থেকে অত্যন্ত ব্যাপক ও শক্তিশালী। যার ফলে অনেক সময় এগুলোর বিরুদ্ধে সুরক্ষা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
অতএব আল্লাহর সৈন্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের কোনো নির্দিষ্ট বাহিনী নয়; বরং সমগ্র সৃষ্টিজগৎ তাঁর আদেশাধীন এক বিশাল বাহিনী।