মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৬:৫৭ অপরাহ্ন

রংপুর বিভাগে ভোটযুদ্ধে জামানত হারালেন ৯ নারী প্রার্থী

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের আট জেলার ৩৩টি আসনে লড়েছেন ৯ নারী প্রার্থী। তাদের মধ্যে চারজন ছিলেন স্বতন্ত্র। ভোটের লড়াইয়ে প্রত্যাশিত সাফল্য তো দূরের কথা, প্রত্যেকেই জামানত হারিয়েছেন। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৮৭৬ এবং সর্বনিম্ন ১৫৩।

রংপুর-৩ (সদর ও রসিক) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রিটা রহমান সূর্যমুখী প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৪৬১ ভোট। একই আসনে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী থেকে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী ঈগল প্রতীক নিয়ে প্রচার চালালেও ভোটের চার দিন আগে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তবুও ব্যালটে নাম থাকায় তিনি পেয়েছেন ২৩০ ভোট।রংপুর-৪ (পীরগাছা ও কাউনিয়া) আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী প্রগতি বর্মণ তমা কাঁচি প্রতীকে পেয়েছেন ২৪৩ ভোট।

 রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকিয়া জাহান চৌধুরী সূর্যমুখী প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন মাত্র ১৫৩ ভোট।

ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রাণীশংকৈল) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নূরুন নাহার বেগম লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ২ হাজার ৮৭৬ ভোট, যা নারী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ঠাকুরগাঁও-৩ (রাণীশংকৈল, পীরগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা মনি ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ২৭৯ ভোট।

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছালমা আক্তার কলস প্রতীকে পেয়েছেন ৩৭৮ ভোট।

গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি ও সাঘাটা) আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী রাহেলা খাতুন কাঁচি প্রতীকে পেয়েছেন ২৪৯ ভোট।

এ ছাড়া দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে দুই নারী প্রার্থীর মধ্যে বাসদের কিবরিয়া হোসেন মই প্রতীকে পেয়েছেন ২৮৩ ভোট এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগের লায়লা তুল রীমা হারিকেন প্রতীকে পেয়েছেন ২১৪ ভোট।

অন্যদিকে পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার কোনো আসনেই নারী প্রার্থী ছিলেন না। যদিও তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে এসব জেলায় বেশ কয়েকজন নারী প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ ও প্রচার চালিয়েছিলেন।

নারী প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় মনোনয়ন পেতে গিয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সাংগঠনিক প্রভাব।

মাঠপর্যায়ে কাজ ও জনপ্রিয়তা থাকলেও মনোনয়ন বোর্ডে সিদ্ধান্ত হয় ভিন্নভাবে, যেখানে নারীদের নাম খুব কমই উঠে আসে।গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী রাখার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশন সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করে। কিন্তু কোনো বড় রাজনৈতিক দল এখনো এই বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে পারেনি।জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের প্রস্তাবে অধিকাংশ দল একমত হয় এবং এবারের নির্বাচনে সেই লক্ষ্য রেখে সনদ চূড়ান্ত করা হয়। তবে বাস্তবে দলগুলো সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। বিএনপি মোট প্রার্থীর ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। আর জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনেই নারী প্রার্থী দেয়নি।

ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা মনি বলেন, কোনো দলই নারীদের সেভাবে মূল্যায়ন করে না। তাই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি।

ভোটের রাজনীতিতে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কেবল মৌখিক উৎসাহ বা প্রতীকী মনোনয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গভীর ও বাস্তবভিত্তিক কাঠামোগত সংস্কার বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আমিন।

তার মতে, তৃণমূল পর্যায় থেকে নারীদের নেতৃত্ব বিকাশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্তি এবং আর্থ-সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে দলগুলোকেই উদ্যোগী হতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান, দেশের প্রতিটি আন্দোলনে নারীরা সম্মুখসারিতে ছিলেন। তাই নারীর অংশগ্রহণকে আর ‘সহানুভূতি’ বা ‘অগ্রাধিকার’ হিসেবে নয়, বরং সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাস্তবায়নে সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি।

নাসিমা আমিন মনে করেন, নারীদের এগিয়ে আনতে রাজনৈতিক দলের ভেতরে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। তার বক্তব্য অনুয়ায়ী, তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক বিকাশে সব দলকে আন্তরিক হতে হবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক আন্দোলন পর্যন্ত দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নারীদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ভোটের মাঠে সেই উপস্থিতি প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, নারীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রতীকী অংশগ্রহণ নয়, প্রয়োজন কার্যকর নীতিগত ও সাংগঠনিক পরিবতন।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102