খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ের প্রচারণায়ও ছিল ভিন্নতা। ছোট ছোট সভা, ঘরোয়া বৈঠক এবং সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময়-এসব কৌশল প্রচলিত বড় সমাবেশের চেয়ে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তৃণমূল সংগঠনগুলোকে সক্রিয় রেখে কেন্দ্রীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কৌশলও কাজ করেছে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং সমন্বিত প্রচারণা তাদের এ সাফল্যের একটি বড় কারণ।
অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতাও ফলে প্রভাব ফেলেছে। কোথাও কোথাও প্রার্থী বাছাই নিয়ে অসন্তোষ, কোথাও জোট সমীকরণের জটিলতা ভোটে বিভাজন তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে জামায়াত।
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী দেখা গেছে, রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের ১৯টিতেই বিএনপিকে হারিয়ে ১১ দলীয় জোটের ১৭ জন জামায়াত এবং দুইজন এনসিপি থেকে এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ১৪টি বিএনপির কাছে দলটি হেরে গেলেও শুধু ঠাঁকুরগাও-১ আসন ছাড়া ১৩টিতেই বিএনপির সঙ্গে ভোটের ব্যবধান মাত্র পাঁচ থেকে ২০ হাজারের মধ্যে। আর জাতীয় পার্টির সঙ্গে জামায়াতের ভোটের ব্যবধান ৯০ শতাংশেরও বেশি।
রংপুর বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনের ফল নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য এ টি এম আজম খান বলেন, মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে। যেটা সারা দেশের ভোটের পরিসংখ্যান দেখলে বুঝতে পারবেন। এছাড়া জনগণের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে জামায়াত। তাই মানুষ পরিবর্তনের সুযোগকে বেছে নিয়েছে।
বিএনপি কম আসন পেল কেন
১৯৯১ সালে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র একটি ও ১৯৯৬ সালে তিনটি আসন পায় বিএনপি। ২০০১ সালে দলটি এই বিভাগে ৯টি আসন পায়। তবে ২০০৮ সালে জামায়াতের মতো বিএনপিও এই বিভাগে কোনো আসন পায়নি।
রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার কয়েকজন বিএনপি নেতার সঙ্গে কথা হলে তাঁরা বলেন, এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগে বিএনপির আরো ভালো করার সুযোগ ছিল। কিন্তু নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, তৃণমূল কর্মীদের অবম্যূল্যায়ন-এসব কারণে সেই সুযোগ ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি।
তবে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে জনগণ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে। যেখানে বিএনপির প্রার্থীরা হেরেছেন, সেখানে ভোটের ব্যবধান খুব অল্প হয়েছে। অনেক জায়গায় ভোটাররা বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে ভোট দিয়েছে; মাঝখান দিয়ে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। ভালোভাবে সাংগঠনিক কাজ করলে আগামীতে ভালো হবে।’
রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ত্বহা হোসাইন বলেন, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতায় ভোটাররা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির মতো সুসংগঠিত ও পুনর্গঠিত শক্তির দিকে ঝুঁকেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা জাতীয় পার্টির পরিবর্তে নতুন শক্তির ওপর আস্থা রেখেছে। এজন্য জাতীয় পার্টির এমন বিপর্যয় হয়েছে। রংপুরে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল, স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় ও উদ্দীপনার ঘাটতি, হেভিওয়েট প্রার্থী বাদ দিয়ে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া সুযোগ নেয় তারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, এই ফল ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তরুণ ও নারী ভোটারদের উপেক্ষা করে কোনো দলই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে না। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংক্রান্ত সমস্যাগুলোকে প্রাধান্য দিতে না পারলে ভোটের সমীকরণ দ্রুত বদলে যেতে পারে।
ফখরুল আনাম আরো বলেন, এই ফলের পেছনে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক নেতৃত্বের দুর্বলতাও ছিল। তাঁরা কী করতে চান, তার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। তাঁরা রংপুর অঞ্চলের মানুষের ইমোশন (আবেগ) নিয়ে রাজনীতি করেছেন। কিন্তু মানুষ এবার সেই ইমোশন থেকে বেরিয়ে এসেছে, যেটা কাজে লাগিয়েছে জামায়াত।