রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:১২ অপরাহ্ন

আল্লাহর দৃশ্য ও অদৃশ্য সৈন্যবাহিনী

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
আল্লাহ তাআলা সর্বশক্তিমান, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিটি কণা তাঁর আদেশের অধীন। তিনি যাকে চান তাকে সাহায্য করেন, আর যাকে চান সতর্ক করেন কিংবা শাস্তি দেন। আল্লাহর এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রয়েছে অসংখ্য সৈন্য।কিছু দৃশ্যমান, কিছু অদৃশ্য; কিছু মহান ও শক্তিশালী, আবার কিছু আমাদের চোখে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বলে মনে হয়। ফেরেশতা, মানুষ, প্রাকৃতিক শক্তি, বাতাস-বৃষ্টি, বজ্রপাত, ভূমিকম্প, এমনকি অতিক্ষুদ্র জীবাণু ও ভাইরাস—সবই আল্লাহর সৈন্য, যারা তাঁর ইচ্ছা ও হিকমত অনুযায়ী কাজ করে।
আল্লাহর সৈনবাহিনীর সংখ্যা : প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলা এমন অসংখ্য সৈন্যের অধিকারী, যাদের সম্পর্কে তিনি ছাড়া আর কেউ অবগত নয়। আল্লাহ বলেন : ‘আর তোমার প্রতিপালকের সৈন্যদের সংখ্যা তিনি ছাড়া কেউ জানে না।’ (সুরা : মুদ্দাসসির, আয়াত : ৩১)আল্লাহ তাআলা আরো বলেন : ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সব সৈন্য আল্লাহরই; আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ৭)

ফেরেশতারা  : আল্লাহ তাঁর সৈন্যদের মধ্য থেকে মাত্র অল্প কয়েকজনের নাম আমাদের জানিয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই ফেরেশতা।  আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আকাশমণ্ডলী কাঁপছে, আর তাদের কাঁপা যথার্থ। যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তাঁর শপথ! সেখানে এক বিঘত পরিমাণ স্থানও নেই, যেখানে কোনো ফেরেশতা নেই, যে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহর প্রশংসা করছে।(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০২০)
আর ফেরেশতাদের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো মুমিনদের শক্তিশালী করা ও তাদের অন্তরে দৃঢ়তা দান করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন তোমাদের প্রতিপালক ফেরেশতাদের কাছে প্রত্যাদেশ করেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। সুতরাং যারা ঈমান এনেছে, তাদের দৃঢ় ও শক্তিশালী করো। আর আমি কাফিরদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করব। অতএব তোমরা তাদের ঘাড়ের ওপর আঘাত করো এবং তাদের প্রত্যেক আঙুলের ডগায় আঘাত হানো।(সুরা : আনফাল, আয়াত : ১২)
এই আয়াত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ফেরেশতারা আল্লাহর সৈন্য। তারা আল্লাহ যা আদেশ করেন তা-ই পালন করেন এবং আল্লাহর বন্ধু ও মুমিন বান্দাদের সাহায্য ও সমর্থন করেন।আল্লাহর নেককার বান্দারা তাঁর সৈন্য : আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আর অবশ্যই আমাদের সৈন্যরাই বিজয়ী হবে।’ (সুরা : সাফফাত, আয়াত : ১৭৩)

এই আয়াতে আল্লাহর ‘সৈন্য’ বলতে বোঝানো হয়েছে তাঁর ধার্মিক, ঈমানদার ও অনুগত বান্দাদের, যারা আল্লাহর প্রিয় বন্ধু ও মিত্র। তারা আল্লাহর আনুগত্য করে, কখনোই তাঁর অবাধ্য হয় না এবং যা আদেশ করা হয় তা-ই পালন করে। তারা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ইবাদত করে, তাঁর বিধান অনুসরণ করে এবং তাঁর রাসুল (সা.) এর সুন্নাহ মেনে চলে, কোনো রকম ভণ্ডামি, প্রদর্শন কিংবা অহংকার ছাড়াই।

পঙ্গপাল, উকুন ও ব্যাঙও আল্লাহর সৈন্য :  আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘অতঃপর আমরা তাদের ওপর প্রেরণ করেছিলাম বন্যা, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে। তবু তারা অহংকার করেছিল এবং তারা ছিল অপরাধী এক জাতি।’

(সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৩৩)

আল্লাহ যাকে যেমনভাবে চান, যাকে দিয়ে যা ইচ্ছা করান। কখনো তিনি তাঁর অনুগত বান্দাদের মাধ্যমে সাহায্য পাঠান, আবার কখনো ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বলে মনে হওয়া সৃষ্টিকেও শাস্তির মাধ্যম বানান। সব কিছু আল্লাহর আদেশে এবং তাঁর ইচ্ছাধীন।

প্রাকৃতিক ঘটনাও আল্লাহর সৈন্য :  প্রাকৃতিক ঘটনাপ্রবাহ আল্লাহ তাআলার সৈন্য। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, তাঁর আদেশ ও ইচ্ছার অধীনেই প্রাকৃতিক ঘটনা সংঘটিত হয়। আর এই প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বাতাস ও বৃষ্টি। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন : ‘পানি ও বাতাস, এই দুটি আল্লাহর সৈন্য। আর বাতাস হলো আল্লাহর সৈন্যদের মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী।’

(সুয়ুতি, আসরারুল কাউন, পৃষ্ঠা : ৭৮)

আল্লাহ তাআলা আদ জাতিকে বাতাসের মাধ্যমেই শাস্তি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন : ‘আর আদ জাতির ক্ষেত্রে-যখন আমি তাদের ওপর এক অনুর্বর ধ্বংসাত্মক বাতাস প্রেরণ করেছিলাম।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৪১)

এভাবেই আল্লাহ তাআলা নুহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ওপর যে শাস্তি নাজিল করেছিলেন, সে সম্পর্কে তিনি বলেন : ‘নুহের সম্প্রদায় এর আগেই অস্বীকার করেছিল। তারা আমাদের বান্দাকে মিথ্যাবাদী বলেছিল এবং বলেছিল, ‘সে তো এক উন্মাদ।’ আর তাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করা হয়েছিল। তখন সে তার প্রতিপালককে ডেকে বলেছিল, ‘নিশ্চয়ই আমি পরাজিত, অতএব আপনি সাহায্য করুন।’ অতঃপর আমরা প্রবল মুষলধারে বৃষ্টির মাধ্যমে আকাশের দরজাগুলো খুলে দিয়েছিলাম।’ (সুরা : কামার, আয়াত : ৯-১১) অতএব বাতাস, বৃষ্টি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তি কোনো স্বাধীন বা স্বতন্ত্র ক্ষমতার অধিকারী নয়; বরং এগুলো আল্লাহর আদেশে পরিচালিত তাঁরই সৈন্য, যাদের মাধ্যমে তিনি কখনো রহমত বর্ষণ করেন, আবার কখনো শাস্তি কার্যকর করেন।

প্লাবন, ভূমিকম্প ও ভূমিধস আল্লাহর সৈন্য : আল্লাহর সৈন্য হিসেবে মহাবন্যার কথা কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘অতঃপর আমি তাদের ওপর প্রেরণ করেছিলাম বন্যা, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে। তবু তারা অহংকার করেছিল এবং তারা ছিল এক অপরাধী জাতি।’

(সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৩৩)

কোরআনে ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘কিন্তু তারা তাকে অস্বীকার করেছিল। ফলে ভূমিকম্প তাদের পাকড়াও করল, আর তারা নিজ নিজ ঘরে মৃত অবস্থায় পড়ে রইল।’

(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৭৮)

বজ্রপাত ও মহামারি আল্লাহর সৈন্য : বজ্রপাত সম্পর্কেও কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আর সামুদ জাতির ব্যাপারে—যখন তাদের বলা হয়েছিল, ‘কিছু সময়ের জন্য ভোগ করে নাও’, তখন তারা তাদের প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করেছিল। ফলে বজ্রপাত তাদের পাকড়াও করল, যখন তারা তা স্বচক্ষে দেখছিল।’

(সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৪৩-৪৪)

সুতরাং বজ্রপাতও আল্লাহর আদেশাধীন এক শক্তিশালী মাধ্যম, যার দ্বারা তিনি অবাধ্য জাতিকে শাস্তি দিয়েছেন।

এভাবেই রোগব্যাধি ও মহামারি আল্লাহর সৈন্যদের অন্তর্ভুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া নানা জীবাণু ও ভাইরাস সবই আল্লাহর সৃষ্ট এবং তাঁর ইচ্ছাধীন। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাস হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র জীব, যেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলো দেখতে হলে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের প্রয়োজন হয়, যা লাখ লাখ গুণ বড় করে দেখায়। অথচ এই অতিক্ষুদ্র সৃষ্টিগুলোই তাদের প্রভাবের দিক থেকে অত্যন্ত ব্যাপক ও শক্তিশালী। যার ফলে অনেক সময় এগুলোর বিরুদ্ধে সুরক্ষা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

অতএব আল্লাহর সৈন্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের কোনো নির্দিষ্ট বাহিনী নয়; বরং সমগ্র সৃষ্টিজগৎ তাঁর আদেশাধীন এক বিশাল বাহিনী।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102