শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৫১ অপরাহ্ন

ভাষা-চেতনার বিবর্তন ও আগামীর শিক্ষা: আনুষ্ঠানিকতার মোহমুক্তি ও শুদ্ধ মনন বিনির্মাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম: শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণ, যা আমাদের শিখিয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর অদম্য সাহস। রক্তস্নাত সেই রাজপথ থেকে আমরা কেবল একটি ভাষার অধিকারই পাইনি, পেয়েছিলাম এক জাতিসত্তার পরিচয়। অথচ ২০২৬ সালের এই লগ্নে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করি, তখন এক তীব্র বিষাদ আমাদের গ্রাস করে। আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি মানেই রঙিন আলপনা, আলোকসজ্জা, প্রভাতফেরির মিছিল আর পুষ্পস্তবকের পাহাড়। কিন্তু এই উৎসবমুখর আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে একুশের মূল চেতনা—যথা মাথা নত না করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সত্য উচ্চারণের সাহস—ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করি, রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যে আয়োজনগুলো হয়, তা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে খুব একটা রেখাপাত করে না। দিবসটি পার হলেই আমরা আবার সেই পুরনো ভাষাগত অরাজকতা আর সাংস্কৃতিক দাসত্বে ফিরে যাই। এই দায় কেবল রাষ্ট্রের নয়, বরং যারা বুদ্ধিজীবী কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, তাদের ওপরও এই ব্যর্থতার দায় অনেকাংশে বর্তায়।
দুই:
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে যখন আমি তরুণ প্রজন্মের দিকে তাকাই, তখন এক গভীর শূন্যতা অনুভব করি। আমাদের নতুন প্রজন্মের মাঝে মাতৃভাষা চর্চার প্রতি এক ধরণের চরম উদাসীনতা কাজ করছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা তার নিজস্ব সক্রিয়তা ও গাম্ভীর্য হারিয়ে ফেলছে। বাংলা ও ইংরেজির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ বা ‘বাংলিশ’ চর্চা এখন স্মার্টনেসের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই মিশ্রিত ভাষা আসলে একটি জাতির ‘শিকড়হীনতার’ প্রতীক। সঠিক শব্দ চয়ন, শুদ্ধ উচ্চারণ কিংবা বাংলা বাক্যের যথাযথ গাঁথুনি—কোনোটারই তোয়াক্কা করছে না আজকের প্রজন্ম। এর প্রভাব কেবল ভাষার ওপর পড়ছে না, বরং এটি আমাদের জাতীয় মনস্তত্ত্বকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আমরা এমন একটি সমাজ তৈরি করছি যারা নিজের সংস্কৃতিকে তুচ্ছ মনে করে এবং পরগাছার মতো ভিনদেশি সংস্কৃতির ওপর ভর করে বেঁচে থাকতে চায়। অথচ একুশ আমাদের শিখিয়েছিল সমতা বিধান ও বৈষম্য হ্রাসের দীক্ষা। যখন নিজের ভাষা অবহেলিত হয়, তখন সমাজে এক ধরণের সাংস্কৃতিক শ্রেণিবৈষম্য তৈরি হয়, যা জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
তিন:
বিশ্বের সফল জাতিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের উন্নতির মূলমন্ত্রই হলো মাতৃভাষায় শিক্ষা ও গবেষণা। জাপানের কথা ধরা যাক; তারা বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আদ্যোপান্ত জাপানি ভাষায় রচিত। এমনকি ফিনল্যান্ড, যারা আধুনিক বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা ব্যবস্থার উদাহরণ, সেখানেও প্রাথমিক স্তরে শিশুর মাতৃভাষাকেই একমাত্র গুরুত্ব দেওয়া হয়। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞান (Neurolinguistics) স্পষ্টভাবে বলছে, শিশুর ১০ থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তার মগজের বিকাশ ও চিন্তা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার জন্য মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। অথচ আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শিশুদের জীবন নিয়ে এক ধরণের বৈজ্ঞানিক জুয়া খেলা হচ্ছে। শৈশব থেকেই তাদের ওপর একাধিক ভাষার অপ্রয়োজনীয় বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আমরা তাদের মনোজগৎকে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলছি। ফলে শিশুরা না শিখছে গভীর চিন্তা করতে, না পারছে কোনো একটি ভাষায় প্রকৃত দক্ষতা অর্জন করতে। এই জগাখিচুড়ি শিক্ষা পদ্ধতি সৃজনশীলতা হত্যার এক নামান্তর।
চার:
অনেকে মনে করেন, মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দিলে আমরা হয়তো বিশ্বায়ন থেকে পিছিয়ে পড়ব। এই ধারণাটি কেবল ভুলই নয়, বরং বিপজ্জনক। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জার্মানির উদাহরণ দেখুন; তারা তাদের মাতৃভাষায় দক্ষ হওয়ার পর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইংরেজি বা অন্যান্য প্রভাবশালী ভাষা রপ্ত করে বিশ্ব জয় করছে। আমাদের প্রস্তাবনা হলো—একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত (প্রাথমিক স্তর) শিক্ষা হবে সম্পূর্ণ মাতৃভাষায়। এরপর শিশুকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে আন্তর্জাতিক ভাষাগুলোতে দক্ষ করে তুলতে হবে। ভাষা শিক্ষা হতে হবে বৈজ্ঞানিক স্তর বিন্যাসের মাধ্যমে, যেখানে মাতৃভাষা হবে ভিত্তি আর বিদেশি ভাষা হবে সেই ভিত্তির ওপর আধুনিক ইমারত। বর্তমান সময়ে আমরা ইমারত গড়তে গিয়ে ভিত্তিটিকেই ধসিয়ে দিচ্ছি।
পাঁচ:
শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংহত করার ক্ষেত্রে দক্ষ শিক্ষকের বিকল্প নেই। কেবল ভালো কারিকুলাম প্রণয়ন করলেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হবে না যদি না তা শ্রেণিকক্ষে বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকেন। এটি আনন্দের সংবাদ যে, বর্তমানে রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা-সহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষককে কেবল তার বিষয়ের ওপর জ্ঞান থাকলেই চলবে না, বরং তাকে মাতৃভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ এবং একুশের মহান চেতনার ধারক হতে হবে। তবে এই প্রচেষ্টাগুলো যদি বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে, তবে তার প্রভাব হবে অতি সামান্য। এখনই সময় একটি ‘সমন্বিত জাতীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ কাউন্সিল’ গঠন করা, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের শিক্ষকদের নিয়মিত আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও ভাষা-মনন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
ছয়:
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত পোশাকি আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে গুণগত মানের ওপর জোর দেওয়া। সভা-সেমিনারে যে আলোচনাগুলো হয়, সেগুলোর কার্যকর প্রতিফলন দেখতে চাই আমাদের পাঠ্যক্রমে, আমাদের আদালতে এবং আমাদের দাপ্তরিক কাজে। রাষ্ট্রের যে কোটি কোটি টাকা উৎসবে ব্যয় হয়, সেই অর্থের একটি বড় অংশ যদি উচ্চশিক্ষার মানসম্মত অনুবাদ কর্মে বা ভাষা গবেষণায় ব্যয় করা হতো, তবে আজ আমাদের উচ্চশিক্ষার মান ভিন্ন হতে পারতো। একুশ মানে নিছক শোকের কালো ব্যাজ ধারণ নয়, একুশ মানে যুগপৎ সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এবং নিপীড়িতের পাশে থাকার শপথ। একুশের সেই বিপ্লবী চেতনাকে আমাদের প্রতিদিনের জীবনচর্যায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
উপসংহার:
ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির সম্মিলিত স্বপ্ন ও সংগ্রামের বাহন। আমাদের নতুন প্রজন্মকে শিকড়হীনতার গহ্বর থেকে টেনে তুলতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শুদ্ধভাবে মাতৃভাষা চর্চা এবং সুস্থ ধারার সংস্কৃতির বিকাশই পারে আমাদের একটি মেরুদণ্ডসম্পন্ন জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় টিকিয়ে রাখতে। আসুন, আমরা ২০২৬ সালকে একটি সুস্থ ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের বছরে রূপান্তর করি। দেশের সকল সচেতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই প্রক্রিয়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন কেবল বছরে একদিনের পুষ্পস্তবকে নয়, বরং ৩৬৫ দিনের শুদ্ধ চর্চা ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনে প্রতিষ্ঠিত হোক—এটাই হোক আমাদের আজকের দৃপ্ত অঙ্গীকার।
লেখক: ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ রয়েল ইউনিভার্সিটি অভ ঢাকা

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102