সরকার বলছে, এই ইপিএ কেবল বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; বরং বাংলাদেশ ও জাপানের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ জোরদারের একটি কাঠামোগত ভিত্তি।
সরকার বলছে, এই ইপিএ কেবল বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; বরং বাংলাদেশ ও জাপানের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ জোরদারের একটি কাঠামোগত ভিত্তি।
ইপিএর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রুলস অব অরিজিন ও শুল্ক প্রক্রিয়া সহজীকরণ। চুক্তি অনুযায়ী, উভয় দেশ একে অপরকে পণ্যের উৎপত্তির প্রমাণপত্র দেবে এবং প্রয়োজনে তথ্য যাচাই ও বিনিময় করবে। নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য আলাদা উৎস বিধিও নির্ধারিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎস বিধি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে শুল্কমুক্ত সুবিধা কাগজেই থেকে যাবে। শুল্ক, সনদ, প্রত্যয়ন ও কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক সক্ষমতা না বাড়লে রপ্তানিকারকের খরচ ও সময় কমার বদলে বাড়তেও পারে।
একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের যোগ্য আইটি, প্রকৌশল ও সেবা কোম্পানির জন্য জাপানের সরকারি কেনাকাটায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এতে আন্তর্জাতিক মান, স্বচ্ছতা ও নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। চুক্তিতে শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় শেষ হলে মেধাস্বত্ব আইন ও প্রশাসন শক্তিশালী করতে বড় ধরনের ব্যয় ও নীতি সংস্কার প্রয়োজন হবে। এতে কিছু শিল্পে নীতিগত ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশও জাপানি পণ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক কমাবে। এতে আমদানি শুল্ক-আয় কমতে পারে এবং রাজস্ব ঘাটতির চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাপানি যন্ত্রপাতি ও উচ্চমানের ভোগ্যপণ্য সস্তা হলে দেশি শিল্প, বিশেষ করে নবীন শিল্পগুলো প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।
এ ছাড়া কৃষি, খাদ্য ও মৎস্যপণ্যে কঠোর স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি বিধি মানতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে জাপানের সঙ্গে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১৪১ কোটি মার্কিন ডলার, বিপরীতে আমদানি হয়েছে ১৮৭ কোটি ডলারের পণ্য। জেট্রোর কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ কাজুয়াকি কাতাওকা বলেন, শুল্কমুক্ত সুবিধা দামের প্রতিযোগিতায় সহায়তা করবে। তবে জাপানি ভোক্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য উচ্চমানের পণ্য উৎপাদনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের সঙ্গে ইপিএ বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ, বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে। তবে এই চুক্তি কোনো স্বয়ংক্রিয় সুফলের নিশ্চয়তা নয়। শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি মান, দক্ষতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নীতি সংস্কার সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত প্রস্তুতি ছাড়া এই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকিও কম নয়।