এই সুবিশাল ও বিস্ময়কর মহাবিশ্ব শুধু দৈব ঘটনায় গঠিত কোনো ব্যবস্থা নয়, বরং একজন মহান স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা, সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ও অপার প্রজ্ঞার এক জীবন্ত প্রকাশ। আসমান ও জমিনের সৃষ্টি, রাত ও দিনের আবর্তন, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা, উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্য, এমনকি মানুষের নিজস্ব সৃষ্টি—সবকিছুই স্রষ্টার শক্তি ও মহত্ত্বের স্পষ্ট নিদর্শন বহন করে। যে কেউ এই মহাবিশ্বের বিস্ময়কর প্রকাশ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে অনায়াসেই তার স্রষ্টার অতুলনীয় মহত্ত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
আসমান সৃষ্টি : এই মহাবিশ্বে আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে আছে স্রষ্টার অসীম ক্ষমতার এক সুস্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ নিদর্শন।তিনি সাত স্তরের আকাশ সৃষ্টি করেছেন সম্পূর্ণ ত্রুটিহীনভাবে—কোনো ফাঁকফোকর বা অসম্পূর্ণতা ছাড়াই। কোনো দৃশ্যমান স্তম্ভ ছাড়াই তিনি সেগুলোকে উঁচু করে স্থাপন করেছেন, ধারণ করে রেখেছেন এবং পতন বা বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করেছেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি তাদের ঊর্ধ্বে আকাশের দিকে তাকায়নি, আমি কিভাবে তা সৃষ্টি করেছি, সুসজ্জিত করেছি এবং তাতে কোনো ফাটল রাখিনি?’ (সুরা: কফ, আয়াত : ৬)
তিনি রাতকে দিনের ওপর আচ্ছাদিত করেন এবং দিনকে রাতের ওপর আচ্ছাদিত করেন। তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণাধীন করেছেন; প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত নিজ নিজ পথে চলমান থাকে। জেনে রাখো, তিনিই পরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল।’ (সুরা : ঝুমার, আয়াত : ৫)
পাহাড় সৃষ্টি : পাহাড়ের সৃষ্টিও স্রষ্টার আরেক বিস্ময়কর প্রকাশ। পৃথিবী সৃষ্টির পর, আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞানের নির্দেশে এতে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী স্থিতিশীল থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি পৃথিবীতে দৃঢ়ভাবে স্থাপিত পাহাড় স্থাপন করেছেন, যাতে তা তোমাদের নিয়ে কাঁপে না এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন নদী ও পথ, যেন তোমরা সঠিক পথে চলতে পারো।’
(সুরা : নাহল, আয়াত : ১৫)
উদ্ভিদ সৃষ্টি : মহান আল্লাহ পৃথিবীকে অনুর্বর ও নিষ্প্রাণ করে রাখেননি; বরং তিনি এতে অগণিত প্রকারের উদ্ভিদ, ফল ও ফুল সৃষ্টি করেছেন, যার মাধ্যমে সৃষ্টিজগতে এসেছে অপরিসীম বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য। ফলের মধ্যেই লক্ষ করা যায় কত বিচিত্র রূপ—কিছু মিষ্টি, কিছু টক; কিছু মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিছু পশুপাখির আহার হয়, আবার কিছু শুধু সৌন্দর্য ও শোভা বৃদ্ধির জন্য সৃষ্টি। আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি পৃথিবীর দিকে তাকায়নি, আমি তাতে কত রকমের উত্কৃষ্ট ও সুন্দর বস্তু উৎপন্ন করেছি? নিশ্চয়ই এতে রয়েছে এক নিদর্শন; কিন্তু তাদের বেশির ভাগ বিশ্বাস স্থাপন করে না।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৭-৮)
মানুষ সৃষ্টি : মানুষ সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে আমাদের সুস্পষ্টভাবে অবহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘যিনি তাঁর সৃষ্ট প্রতিটি বস্তুকে নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের সৃষ্টির সূচনা করেছেন মাটি থেকে। এরপর তিনি তার বংশধরকে তুচ্ছ এক তরল পদার্থের নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি তাকে সুবিন্যস্ত আকৃতি দান করেছেন এবং তার মধ্যে তার রুহ ফুঁকে দিয়েছেন। আর তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও হৃদয়। তবু তোমরা খুব অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’
(সুরা : সাজদাহ, আয়াত : ৭-৯)
প্রাণিজগৎ সৃষ্টি : প্রাণিজগতের সৃষ্টি সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আর আল্লাহ প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ পেটের ওপর ভর দিয়ে চলে, কেউ দুই পায়ে চলে, আবার কেউ চার পায়ে চলে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৪৫)
একই আয়াতে তিনি প্রাণীদের চলনভঙ্গি, আকৃতি ও প্রকৃতির পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন, যদিও তাদের সবার সৃষ্টির উপাদান এক ও অভিন্ন। আর লক্ষ করবে যে এই বৈচিত্র্য কিভাবে প্রতিটি প্রাণীর নিজ নিজ পরিবেশ ও জীবনধারার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মানানসই, সে অবশ্যই বুঝতে পারবে, এই সৃষ্টি কতটা নিখুঁত, সুসমন্বিত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ।
সুতরাং মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা ও আকাশের বিস্তার থেকে শুরু করে পৃথিবীর গভীরে প্রোথিত পাহাড়, ক্ষুদ্র উদ্ভিদ থেকে বিচিত্র প্রাণী আর মানুষের জটিল ও পরিপূর্ণ সৃষ্টি—সবই মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও নিখুঁত সৃষ্টিকৌশলের সাক্ষ্য দেয়। এই সৃষ্টিতে রয়েছে ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্র্য, শক্তির সঙ্গে প্রজ্ঞা এবং সৌন্দর্যের সঙ্গে উদ্দেশ্যপূর্ণতা। কিন্তু এসব নিদর্শন থেকে উপকৃত হয় তারাই, যারা চিন্তা করে, উপলব্ধি করে এবং হৃদয় দিয়ে সত্যকে গ্রহণ করে। অতএব, এই মহাবিশ্ব আমাদের জন্য শুধু বসবাসের স্থান নয়, বরং এটি স্রষ্টাকে চেনার, তাঁর মহত্ত্ব উপলব্ধি করার এবং কৃতজ্ঞ ও সচেতন জীবনযাপনের এক উন্মুক্ত আহবান।