বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:১১ পূর্বাহ্ন

শবেবরাত: রহমত, তওবা ও আত্মশুদ্ধির রাত

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ইসলামের বারো মাসের ধারায় শা‘বান হচ্ছে রমজান প্রস্তুতির মাস। এই মাসের মধ্যভাগে যে রাতটি মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে আলোচিত, তা হলো শবেবরাত। এ রাতকে ঘিরে আবেগ, ইবাদত, ভুল ধারণা; সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি বহুস্তরপূর্ণ। কোরআন-হাদিসের আলোকে শবেবরাতকে বুঝতে হলে প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, যাতে ফজিলতের স্বীকৃতির পাশাপাশি বিদআত ও কুসংস্কার থেকেও বাঁচা যায়।

শবেবরাত : নাম ও অর্থের পটভূমি

‘শবেবরাত’ শব্দবন্ধটি গঠিত হয়েছে দুটি ভিন্ন ভাষার শব্দ দিয়ে। ‘শব’ ফার্সি শব্দ, যার অর্থ রাত। আর ‘বরাআত’ আরবি শব্দ, যার অর্থ মুক্তি বা দায়মুক্তি। এ দুটি মিলিয়ে অর্থ দাঁড়ায় মুক্তির রাত।

যদিও হাদিসে এই নামটি সরাসরি ব্যবহৃত হয়নি, তবে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান’— অর্থাৎ শা‘বান মাসের মধ্যরাত— হিসেবে এ রাতের উল্লেখ পাওয়া যায়। মুসলিম মনীষীদের একটি বড় অংশ এই নামকরণকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেছেন, কারণ এ রাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ব্যাপক ক্ষমা ও অনুগ্রহের ঘোষণা রয়েছে। 

শবেবরাতের ফজিলত : হাদিসের আলোকে

বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য একাধিক হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শাবান মাসের মধ্যরাত আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। মুআয ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।

(সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৫৬৬৫; সুনানে ইবনে মাজাহ্, হাদিস: ১৩৯০)আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিসেও দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) এ রাতে দীর্ঘ সিজদায় মশগুল ছিলেন এবং তিনি স্পষ্ট করে বলেন—এ রাতে আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করেন, দয়া প্রার্থীদের প্রতি দয়া করেন, তবে বিদ্বেষীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকী ৩/৩৮২-৩৮৩)

এ রাতের মূল শিক্ষা

শবেবরাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি। এটি কোনো উৎসবের রাত নয়, বরং আত্মসমালোচনা, তাওবা ও আল্লাহমুখী হওয়ার রাত। এখানে নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ নামাজ বা নির্ধারিত রাক‘আতের বিধান নেই। বরং যে আমল মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়—সেগুলিই এ রাতে বেশি গুরুত্ব পায়।

শবেবরাতে করণীয় নেক আমল

এই রাতে করণীয় আমলগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • ফরজ নামাজসমূহ যথাযথভাবে আদায় করা, বিশেষত মাগরিব, এশা ও ফজর জামাআতের সঙ্গে আদায় করা।
  • নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ও দরুদ পাঠ।
  • আন্তরিক তাওবা ও ইস্তিগফার—যার মধ্যে পাপের অনুশোচনা, পাপ ত্যাগ, ভবিষ্যতে না করার দৃঢ়সংকল্প এবং বান্দার হক আদায়ের চেষ্টা অন্তর্ভুক্ত।
  • গুরুত্বের সঙ্গে দু‘আ করা, কেননা হাদিসে এ রাতে দোয়া কবুলের কথা বিশেষভাবে এসেছে।
  • সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকা করা এবং নফল ইবাদতের সাওয়াব মৃত মুসলিমদের জন্য পাঠানো।
  • শাবান মাসের ১৫ তারিখে নফল রোযা রাখা।

নফল ইবাদত : একাকী হওয়াই উত্তম

ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী নফল ইবাদত গোপনে ও একাকী করাই উত্তম। ফরজ নামাজ অবশ্যই জামাআতের সঙ্গে আদায়যোগ্য, কিন্তু নফল আমলের ক্ষেত্রে সমবেত আয়োজন, উচ্চৈঃস্বরে জিকির বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির কোনো প্রমাণ নেই। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনের যুগেও এ ধরনের সমষ্টিগত নফল আমলের প্রচলন ছিল না। তবে অলসতার আশঙ্কায় কেউ মসজিদে এসে ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত করলে তাতে দোষ নেই।

যারা এ রাতেও ক্ষমা থেকে বঞ্চিত

হাদিসের আলোকে জানা যায় যে কিছু মানুষ এই ব্যাপক ক্ষমার রাতেও বঞ্চিত থাকে, যতক্ষণ না তারা তাওবা করে ফিরে আসে। এর মধ্যে রয়েছে— মুশরিক, হিংসুক, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য, মদ্যপায়ী এবং অন্যায় হত্যায় লিপ্ত ব্যক্তি। এটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা—ইবাদতের পাশাপাশি চরিত্র ও সামাজিক সম্পর্ক সংশোধনও অপরিহার্য।

শবেবরাতে বর্জনীয় বিষয়

শবেবরাতকে কেন্দ্র করে কিছু কুসংস্কার ও অনৈসলামিক চর্চা সমাজে প্রচলিত হয়েছে। যেমন— আতশবাজি ফোটানো, আলোকসজ্জা, বিশেষ খাবার রান্নাকে ইবাদতের অংশ মনে করা ইত্যাদি। এগুলোর কোনোটি হাদিস বা সালাফে সালেহীনের আমল দ্বারা প্রমাণিত নয়। বরং এগুলো অপচয়, অনুকরণ ও ইবাদতের পরিবেশ বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শবেবরাত আমাদের জন্য এক অনন্য সুযোগ— নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার, আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এবং বিদ্বেষ ও গুনাহের বোঝা নামিয়ে রাখার। এই রাতের মর্যাদা রক্ষা মানে—অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা বর্জন করে আন্তরিক ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে এ বরকতপূর্ণ রাতের যথাযথ মূল্যায়ন করার এবং তাঁর ক্ষমাপ্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তাওফিক দান করেন। আমীন।

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102