বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:২২ পূর্বাহ্ন

চিকিৎসকের পেশা যেভাবে ইবাদতে রূপ নিতে পারে

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট টাইম: শনিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬

ইসলামের দৃষ্টিতে চিকিৎসা পেশা একটি সম্মানিত পেশা। এটি পেশা শুধু জীবিকা নির্বাহের একটি উপায়ই নয়, বরং এটি এক ধরনের ইবাদতও বটে। একজন চিকিৎসক যত দক্ষ ও জ্ঞানী হোন না কেন, যদি তাঁর অন্তর পবিত্র ও আচরণ সুন্দর না থাকে, তাহলে রোগীর কাছে তাঁর প্রভাব সীমিত থাকে। তাই চিকিৎসকের জন্য নৈতিক আদব, আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিচে এমনই কিছু ইসলামী আদব সংকলন করা হলো, যা একজন চিকিৎসককে আরো মানবিক, সতর্ক ও সৎ হতে সাহায্য করবে।
আদব বলতে বোঝানো হয় উত্তম নৈতিক গুণাবলি ধারণ করা। এখানে সেসব শিষ্টাচার ও আচরণ আলোচনার চেষ্টা করব, যেগুলো একজন চিকিৎসককে আরো মানবিক করে তুলতে সহায়ক হবে।

১. অন্তরের পবিত্রতা ও নিয়তের বিশুদ্ধতা

চিকিৎসক যেন তাঁর এই কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সওয়াব কামনা করেন।

তিনি যেন নিজের খ্যাতি, পারিশ্রমিক বা প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কাজ না করেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভর করে, আর প্রতিটি ব্যক্তির জন্য তা-ই আছে, যা সে নিয়ত করেছে।’ (বুখারি হাদিস : ১)

 

২. কাজের নিপুণতা ও দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা 

চিকিৎসক যেন নিজের কাজকে সর্বোচ্চ দক্ষতা ও যত্নসহকারে সম্পাদন করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন, যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, সে যেন তা ভালোভাবে করে।

’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা : ৭/৩৪৯)

 

৩. আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও নির্ভরতা

চিকিৎসক বিশ্বাস রাখবেন যে তাঁর জ্ঞান ও চিকিৎসা শুধু একটি উপায় মাত্র। সুস্থতা ও নিরাময়ের প্রকৃত মালিক হলেন আল্লাহ তাআলা। তিনি যখন ইচ্ছা করবেন আরোগ্য দেবেন। ইরশাদ হয়, ‘আর আমি যখন অসুস্থ হই, তিনিই আমাকে আরোগ্য দেন।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৮০)

৪. তাকদিরে সন্তুষ্ট থাকা

চিকিৎসক বিশ্বাস রাখবেন যে সুস্থতা বা মৃত্যু সবই আল্লাহর হুকুম ও পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য অনুযায়ী।

ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে ছিলাম। তখন তিনি বললেন, জেনে রাখো, যদি গোটা মানবজাতি তোমার উপকার করতে চায়, তারা উপকার করতে পারবে না, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করেছেন ততটুকু ছাড়া। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করতে চায়, তারা ক্ষতি করতে পারবে না, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন শুধু ততটুকুই। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৬) চিকিৎসক কখনোই নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে অহংকার করবেন না। ভাববেন না যে তিনিই রোগ নিরাময় করেন।

৫. শরিয়তের আলোকে চিকিৎসায় উপদেশ দেওয়া

চিকিৎসকের উচিত রোগীকে শুধু ওষুধ নয়, বরং শরিয়তের আলোকে নিরাময়ের পথেও উৎসাহ দেওয়া। যেমন—আল্লাহর জিকিরে যত্নবান হওয়া, সদকা করা। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘মহানবী (সা.) তিন ভাবে চিকিৎসা করতেন, (১) প্রাকৃতিক ওষুধ দিয়ে, (২) আল্লাহর দেওয়া ইলাহী চিকিৎসা দ্বারা, (৩) অথবা এই দুইয়ের সমন্বয়ে।’ (জাদুল মা’আদ : ৪/২২)

আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন কারো উপর চোখ লাগলে তার জন্য রুকিয়া করা হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৭৩৮)

৬. চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করা

রোগীর ছুটি প্রয়োজন কি না, অস্ত্রোপচার জরুরি কি না, গর্ভনিরোধক ব্যবহার করা জায়েজ কি না কিংবা ডিম্বাশয় অপসারণ করা প্রয়োজন কি না ইত্যাদি ক্ষেত্রে চিকিৎকের উচিত আল্লাহকে ভয় করে সঠিক পরামর্শ দেওয়া। কারণ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়, সে যেন আমানতদার হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১২৮)

৭. হারাম কিছু দিয়ে চিকিৎসা না করা : আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ রোগও নাজিল করেছেন এবং তার প্রতিকার (ওষুধ)ও দিয়েছেন। প্রত্যেক রোগের জন্য একটি নির্দিষ্ট ওষুধ রেখেছেন। সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, তবে হারাম জিনিস দিয়ে চিকিৎসা কোরো না।’ (সহিহুল জামে : ১৬৩৩)

৮. রোগীকে পরীক্ষার বস্তু না বানানো 

রোগীর ওপর এমন কোনো ওষুধ বা অপারেশন প্রয়োগ করা যাবে না, যা আগে নিশ্চিতভাবে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়নি, বিশেষ করে যদি এতে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ এটা আল্লাহ কর্তৃক আদম সন্তানকে সম্মানিত করার পরিপন্থী। তবে যদি কোনো ওষুধ প্রয়োগ না করলে ক্ষতির আশঙ্কা আরো বেশি হয়, তাহলে কম ক্ষতি বিবেচনায় ওই ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে।

৯. রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনায়

নেওয়া : ওষুধ লিখে দেওয়ার সময় বা রোগীকে ভর্তি করানো, অপারেশন কিংবা টেস্টের পরামর্শ দেওয়ার সময় রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। এক মুসলমান হিসেবে অপর ভাইকে সাহায্য করা তার দায়িত্ব।

১০. রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা 

রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা এবং প্রয়োজন ছাড়া তার শরীরের গোপন অঙ্গ দেখার চেষ্টা না করা। যতটুকু অংশ না দেখলেই নয় ততটুকুই শুধু দেখা।

১১. রোগীদের সঙ্গে কোমল আচরণ

করা : রোগীদের সঙ্গে ব্যবহার, ফি নির্ধারণসহ সার্বিক কথাবার্তায় দয়ালু ও নম্র হওয়া উচিত। নবী (সা.) বলেন,‘নিশ্চয়ই আল্লাহ রফিক (কোমল); তিনি কোমলতা পছন্দ করেন এবং যা কোমলতার মাধ্যমে দেন, তা কঠোরতার মাধ্যমে দেন না (মুসলিম, হাদিস : ২৫৯৩)

তাই আসুন, আমরা চিকিৎসা পেশাকে শুধু একটি পেশা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করি এবং রোগীদের প্রতি সদয় ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করি।

লেখক : প্রfবন্ধিক ও অনুবাদক,  Saifpas352@gmail.com

 

নিউজটি শেয়ার করুন..

  • Print
  • উত্তরা নিউজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
এ জাতীয় আরো খবর..
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৩-২০২৫ | Technical Support: Uttara News Team
themesba-lates1749691102