sufia

আকাশ আহমেদ(বিশেষ প্রতিনিধি):–প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের উদ্বোধন হয়েছে। গত বুধবার সকালে ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) এ প্রদর্শনী শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই প্রদর্শনীতে এবার চমক হিসেবে এসেছে মানবীর আদলে তৈরি রোবট সোফিয়া। আর এ রোবট সোফিয়া উন্মাদনায় গতকাল মেতেছিল তরুণ–তরুণীরা। ভিড় করেছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। পরে সোফিয়ায় মুগ্ধ হয়ে ফিরল সবাই। যেন সোফিয়ায় মুগ্ধ হল বাংলাদেশ। আর রোবট মানবী সোফিয়াও জানাল– বাংলাদেশ সুন্দর। এখানে এসে সে আনন্দিত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্য–প্রযুক্তি খাতের বিকাশের ফলে সামনে নতুন শিল্প বিপ্লবের সুযোগ তৈরি হয়েছে মন্তব্য করে তরুণ প্রজন্মকে আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আগামী প্রজন্মের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে–রেডি ফর টুমরো।’ প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের উদ্বোধন ঘোষণার পরপরই হলুদ–সাদা জামদানির টপ আর স্কার্ট পরিহিত সোফিয়াকে অনুষ্ঠান মঞ্চে নিয়ে আসা হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের উত্তরও দেয় সোফিয়া। বাংলাদেশের তরুণরা নিজেদের মেধা–যোগ্যতায় বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছে মন্তব্য করে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আগামীর জন্য বাংলাদেশকে তৈরি করে যেতে চাই। একবার যেহেতু উন্নয়নের চাকা গতিশীল হয়েছে, সেটা আর কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না।’ শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় তথ্য–প্রযুক্তি খাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেন এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে বাংলাদেশের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরেন।

তথ্য–প্রযুক্তি খাতের কয়েকটি সংগঠনের সহযোগিতায় সরকারের আইসিটি বিভাগ ও বেসিস ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড–২০১৭’–এর আয়োজন করেছে, যার প্রতিপাদ্য ‘রেডি ফর টুমরো’। শেখ হাসিনা বলেন, ডিজিটাল পদ্ধতি আমাদের অনেক কাছে নিয়ে এসেছে। শেখ হাসিনা বলেন, তথ্য–প্রযুক্তির বিকাশের ফলে আমাদের সামনে এক নতুন শিল্প বিল্পবের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই খাতে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছর বা তার নিচে। আমাদের এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। এজন্য বাংলাদেশের যুব সমাজকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উলেহ্মখ করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, এজন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ থেকে প্রায় ৫০ হাজার ছেলেমেয়েকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে তোলা হচ্ছে রোবোটিক্স, বিগডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস, ডেটা এনালিটিক্স ল্যাব। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য প্রযুক্তিতে প্রতিবছর ১০ হাজার স্নাতক বের হওয়ার কথা তুলে ধরে জাপানের ১০ হাজার অ্যাপার্টমেন্টকে স্মার্ট করার কাজ বাংলাদেশের তরুণদের দেয়ার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফ্রিল্যান্সিং সাইট আপওয়ার্ক, ইল্যান্স এবং ফ্রিল্যান্সারের প্রথম দশটির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা। বিশ্বে ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যার দিক থেকে আমরা রয়েছি দ্বিতীয় স্থানে। এ খাতে বাংলাদেশ এক নম্বর হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য–প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ এবং বেসিসের সভাপতি মোস্তফা জব্বার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আইসিটি খাতের অগ্রগতির ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। উদ্বোধন ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।

দর্শকদের চিৎকারে ‘সমস্যায়’ সোফিয়া :

বাঙালি মেয়ের পোশাকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে দর্শকদের সামনে এসে উচ্চস্বরের চিৎকারে সমস্যায় পড়েছে রোবট সোফিয়া। ‘টেক–টক উইথ সোফিয়া’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠানের জন্য বেলা আড়াইটায় মানুষের আদলে তৈরি এই রোবটকে নিয়ে আসা হয় সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে; সেখানে তখন উপচে পড়া ভিড়। প্রচণ্ড হইচইয়ের মধ্যে সঞ্চালকরা এ সময় দর্শকদের উদ্দেশে বলতে থাকেন– ‘আপনাদের শব্দে সোফিয়ার সমস্যা হচ্ছে, সে এত শব্দে সাড়া দিতে সমস্যায় পড়বে।’ অনুষ্ঠানস্থলের মূল ফটকে দেখা যায় দর্শকদের দীর্ঘ সারি। পরে মূল ফটক খুলে দেয়া হলেও কেবল নিবন্ধিতদের একাংশের ভেতরে ঢোকার সুযোগ হয়। অনুষ্ঠান শুরুর সময়ও হাজারখানেক দর্শককে বাইরে অপে া করতে দেখা যায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এই রোবট প্রশ্ন শুনে ইংরেজিতে উত্তর দিতে পারে, কণ্ঠ ও চেহারাও শনাক্ত করতে পারে, চেহারায়, হাসি বা রাগের মত অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে পারে। অনুষ্ঠানে প্রায় ১০ মিনিট সঞ্চালকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয় রোবট সোফিয়া। সে জানায়, ‘সুন্দর বাংলাদেশ’ এসে সে আনন্দিত। তবে দর্শক সারি থেকে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ আসার আগেই ৩টা ২০ মিনেটে অনুষ্ঠান শেষ করা হয়। সঞ্চালক শাওন সোফিয়ার সুন্দর পোশাকের প্রশংসা করে সোফিয়ার কাছে জানতে চান, এই পোশাক সম্পর্কে সে কী জানে। উত্তরে সোফিয়া বলে, সে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানির পোশাক পরেছে, যার মোঘল ইতিহাস রয়েছে। ইউনেস্কো এই মিহি সুতার বয়নশিল্পকে স্বীকৃতিও দিয়েছে। নিজের মাথার দিকে ইংগিত করে শাওন সোফিয়াকে বলেন, তাদের দুজনের মাথাই টাক। সোফিয়া তখন বলে, তার মাথা ওইরকম তার নকশার কারণে। আর তার বয়স মাত্র দুই বছর। বড় হলে মাথায় চুল গজাতেও পারে। কিন্তু শাওনের বিষয়ে সে নিশ্চিত নয়। শাওন জানতে চেয়েছিলেন– সোফিয়া কোন রাশির জাতক। উত্তরে সোফিয়া জানায় তার জন্ম ১৪ ফেব্রুয়ারি,ভ্যালেনটাইনস দিবসে। সেই হিসেবে সোফিয়া কুম্ভ রাশির জাতিকা। আর শাওন জানান, তিনি সিংহ রাশির জাতক। রাশিতত্ত্ব অনুযায়ী এই দুই রাশির মধ্যে দারুণ মিল। এ নিয়ে সোফিয়ার মনোভাব জানতে চান তিনি। রোবট সোফিয়া উত্তরে বলে, সে শাওনের রাশিতত্ত্বের জ্ঞানের তারিফ করে। তবে সে জানতে পেরেছে, শাওনের চমৎকার একজন স্ত্রী রয়েছে। শাওনের উচিৎ তার দিকেই মনোযোগ দেওয়া। সোফিয়ার কাছে তার নির্মাতা হ্যানসের একটি বৈশিষ্টের কথা জানতে চেয়েছিলেন শাওন, যা অন্য কেউ জানে না। জবাবে সোফিয়া জানায়, হ্যানসন দারুণ একজন ভাস্কর। রোবট হিসেবে তাকে মানুষের আদল দিতে তিনি যে পরিশ্রম করেছেন, ততটা অন্য কোনো রোবটের জন্য তিনি করেননি। ভবিষ্যতে অনেক বেশি রোবট কর্ম েতে্র এলে মানুষ কোনো হুমকির মুখে পড়বে কি না– এ প্রশ্নে সোফিয়ার ভাবনা জানতে চেয়েছিলেন শাওন। জবাবে সোফিয়া বলে, মানুষের জন্য যে কাজ কষ্টকর,তা রোবট করতে পারবে। মানুষ আরও উন্নত জীবন পাবে। মঞ্চে উপস্থিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীকে দেখিয়ে সোফিয়াকে প্রশ্ন করা হয়, তাকে সে চেনে কি না। সোফিয়া বলে তিনি জুনাইদ আহমেদ পলক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। পলক জানতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশ সোফিয়ার মত সোশ্যাল রোবট তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে সে কি ভাবছে। উত্তরে সোফিয়া বলে, সে হয়ত প্রথম, তবে সে নিশ্চিত সে এরকম শেষ রোবট নয়। বাংলাদেশের বিষয়ে সে আশাবাদী।

চাইলে বাংলাদেশও পারবে:

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আরও উন্নত ও বুদ্ধিদীপ্ত রোবট মানুষের আশে পাশে থাকবে এবং বাংলাদেশের তরুণরাও এ ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট তৈরি করতে পারবে বলে বিশ্বাস করেন মানুষের আদলে তৈরি রোবট সোফিয়ার নির্মাতা ডেভিড হ্যানসন। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের অনুষ্ঠানে ডেভিড হ্যানসন এমন আশার কথা শোনান। ডেভিড হ্যানসন অনুষ্ঠানে রোবোটিকস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক গ্রে অ্যাডভারটাইজিং বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ গাউসুল আলম শাওনের প্রশ্নের জবাবে হ্যানসন বলেন, বাংলাদেশে এসে তিনি খুবই সম্মানিত বোধ করছেন। তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি তিনি পৃথিবীর সবার জন্য উন্মুক্ত করতে চান। সোফিয়ার সফটওয়্যার ওপেন সোর্সে রয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশও চাইলে সেসব সফটওয়্যার ব্যবহার করে এ ধরনের রোবট তৈরি করতে পারে।

আমরা এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে চাই, যা মানুষকে সাহায্য করবে। আবার আমাদের সময়ের প্রযুক্তি এই বিশ্বকে অনেক বেশি জটিলও করে তুলেছে। আমার মনে হয়েছে, এসব প্রযুক্তির মানবিকিকরণ প্রয়োজন। যন্ত্রও যাতে আমাদের বুঝতে পারে এবং অনেক বেশি অর্থবহ হয়, সেভাবেই তাদের তৈরি করতে হবে।

হ্যানসন বলেন, সোফিয়ার মত রোবট বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজিন্সের ডিজাইন করা হয়েছে মানবীয় অনুভূতির সঙ্গে মিল রেখে। এই প্রবণতা কাজ করছে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার উদ্ভাবকদের কাজেও। তিনি বিশ্বাস করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ‘লিভিং ইন্টেলিজেন্ট মেশিন’ মানুষের পাশে থাকবে; সোফিয়া কেবল শুরু। হ্যানসন বলেন, মানুষের আদলে রোবট তৈরির চেষ্টা তিনি শুরু করেছিলেন ৩০ বছর আগে। গত পাঁচ বছরে রোবটিক্স এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের গবেষণায় বেশ কিছু সাফল্য এসেছে যা, এই কাজকে এগিয়ে নিয়েছে। হংকংয়ের কোম্পানি হ্যানসন রোবোটিকস ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার সোফিয়াকে তৈরি করেছে হলিউড অভিনেত্রী অড্রে হেপবার্নের চেহারার আদলে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এই রোবট প্রশ্ন শুনে ইংরেজিতে উত্তর দিতে পারে, কণ্ঠ ও চেহারাও শনাক্ত করতে পারে। বিভিন্ন তথ্য–উপাত্ত ব্যবহার করে সে ক্রমাগত বাড়িয়ে নিতে পারে নিজের ‘ইন্টেলিজেন্স’।

গত অক্টোবরে রিয়াদে ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ শীর্ষক এক সম্মেলনে সোফিয়াকে দেয়া হয় সৌদি আরবের নাগরিকত্ব। বিশ্বের কোনো দেশে রোবটকে নাগরিকত্ব দেয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। ঢাকায় আসার আগে বাংলাদেশের উদ্দেশে একটি ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছিল রোবট সোফিয়া।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা