Mominul

ঘটনা ১ : ত্রিদেশীয় সিরিজের জন্য ঘোষিত প্রথম দুই ম্যাচের স্কোয়াডে ছিলেন ইমরুল কায়েস। কিন্তু ইনজুরির কারণে নাকি মাঠে নামার মতো অবস্থায় নেই। ওদিকে ফিটনেস ফিরতে ফিরতে জাতীয় দলে প্রয়োজনীয়তা ফুরোল এই ওপেনারের। পরের দুই ম্যাচের দল থেকে তাই বাদ পড়েন ইমরুল; তাঁকে  পাঠিয়ে দেওয়া হয় বিসিএলে খেলার জন্য। ওখানে সেঞ্চুরির পর কী খেয়াল হয় নির্বাচকদের! শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফাইনালের আগের দিন স্কোয়াডে আবার ডেকে পাঠানো হয় ইমরুলকে।

পাঁচ ম্যাচের সিরিজের মধ্যে জাতীয় দলে আসা-যাওয়া তাঁর তিনবার। ম্যাচে নামার সুযোগ হয়নি অবশ্য একবারও।

ঘটনা ২ : নির্বাচকদের ভাবনার চৌহদ্দিতে ছিলেন না আব্দুর রাজ্জাক। তাঁর জাতীয় দলে ফেরার আশাটা ছিল দুরাশার নামান্তর। ত্রিদেশীয় সিরিজ ফাইনালে সাকিব আল হাসান চোট পাওয়ার পরও বিবেচিত হয় না এই বাঁহাতি স্পিনারের নাম। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের বিকল্প হিসেবে তানভীর হায়দার ও সাঞ্জামুল ইসলামের অন্তর্ভুক্তি যার প্রমাণ। কিন্তু পরদিন আবার হুট করেই যেন নির্বাচকদের মনে পড়ে রাজ্জাককে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পাঁচ শ উইকেটের মাইলফলকে পৌঁছেছেন কিছুদিন আগে; সে সূত্রে আলোচনায় ছিলেন প্রবলভাবে। ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে ও জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা মিলে রাজ্জাক ও ১০ হাজার রানের মাইলফলকে পৌঁছা তুষার ইমরানকে দেওয়া সম্মাননায় সে আলোচনার আগুন উসকে যায় আরো। ব্যস, সাকিবের বিকল্প তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে প্রথম টেস্টের জন্য ডাক পড়ে রাজ্জাকের।

একাদশে সুযোগ হয় না অবশ্য। আর দ্বিতীয় টেস্টের স্কোয়াড থেকে একরকম বাদ দিয়ে রাজ্জাককে প্রিমিয়ার লিগে খেলার জন্য পাঠিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত হয় একরকম। প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিন শেষে ওই বার্তা দেওয়া হয় এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে। কিন্তু কী মনে করে যেন পরে দ্বিতীয় টেস্টের জন্য আবার রেখে দেন নির্বাচকরা!

ঘটনা দুটো আপাত সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। তবে তা একই সুতায় গাঁথা। সে গাঁথুনিতে মালা হয় না, বরং গাঁথা মালা যেন যায় ছিঁড়ে ছিঁড়ে। জাতীয় দল নির্বাচনের গোলমেলে অবস্থার প্রতিফলন যে তাতে! ‘স্বাধীনতা’ আর ‘স্বেচ্ছাচার’-এর বিভেদরেখা মুছে গিয়ে যার ভুক্তভোগী বাংলাদেশ দল। চন্দিকা হাতুরাসিংহে-পরবর্তী যুগে জাতীয় দল নির্বাচন যে কোনো নির্দিষ্ট ছকে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় এগোচ্ছে না—তা এখন কুয়াশাঢাকা সত্য নয়, প্রখর সূর্যালোকের মতোই স্পষ্ট।

ওই শ্রীলঙ্কান কোচ ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের সর্বেসর্বা। নির্বাচক প্যানেলে তাঁর প্রবেশে প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ পদত্যাগ করেন ঠিক। তবে তাতে বয়েই গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের! হাতুরাসিংহকে সর্বময় কর্তৃত্ব দিয়ে রাখেন তাঁরা। নির্বাচকরা হয়ে যায় শুধুই ‘নাচের পুতুল’। তা আগের ওই সময়ে তো তবু শুধু হাতুরাসিংহের কথায় ‘নাচলে’ হতো, এখন মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও হাবিবুল বাশারকে ‘নাচতে’ হয় অনেকের কথায়। বোর্ড প্রেসিডেন্ট, প্রভাবশালী পরিচালকদের নির্দেশনায়।

হাতুরাসিংহের অনেক সিদ্ধান্ত হয়তো ভুল ছিল, তবে তা ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু এখন তো অক্রিকেটীয় বিবেচনার চর্চাই হচ্ছে বেশি। যে কারণে কোনো পরিকল্পনায় স্থির থাকার জো নেই নির্বাচকদের।

ইমরুলকে নিয়ে টানাহেঁচড়া ‘সহজ’ বলে তা করা যায়; জনপ্রিয়তার প্রথম সারিতে তিনি নেই যে! ওদিকে সাকিবের বিকল্প হিসেবে স্কোয়াডে ডাকা হয় তিনজনকে। ক্রিকেট ইতিহাসে একজনের জায়গায় তিনজনকে ডাকার কোনো উদাহরণ নিশ্চিতভাবেই নেই আর। স্কোয়াডে ছয়জন স্পেশালিস্ট স্পিনার রাখার উদাহরণই বা কোথায়! আবার যতটা সম্মান দিয়ে রাজ্জাককে স্কোয়াডে নেওয়া হয়, তার চেয়েও অসম্মান দিয়ে বের করে দেওয়ার জোগাড়ও হয়। কিন্তু সমালোচনার ভয়েই বোধকরি ও পথে হাঁটেননি নির্বাচকরা। বলা ভালো, বোর্ড হাঁটেনি। অফ দ্য রেকর্ডে তো দল নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অসহায়ত্বের রেকর্ড কম বাজান না নির্বাচকরা!

প্রথম টেস্টে একাদশে থাকা সাঞ্জামুল ইসলাম আবার বাদ দ্বিতীয় টেস্টের স্কোয়াড থেকে। এক-দুই ম্যাচ খেলিয়ে বাদ দেওয়ার কুঅভ্যাস থেকে তো বেরিয়ে এসেছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট। সেটি কি তবে ফিরে আসছে আবার? সাব্বির রহমানের ব্যাপারটি আরো কৌতূহলোদ্দীপক। দর্শক পিটিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিষিদ্ধ তিনি। প্রথম টেস্টের একাদশে ছিলেন না। আবার কিছু না করে, কোথাও না খেলে দ্বিতীয় টেস্টের স্কোয়াডে ফিরেছেন। এটিও তো সেই এক-দেড় যুগ আগের বাংলাদেশের ক্রিকেটকেই মনে করিয়ে দেয়।

ফারুক আহমেদ তাই উদ্বিগ্ন। দ্বিস্তরবিশিষ্ট নির্বাচক কমিটির প্রতিবাদে পদত্যাগ করা জাতীয় দলের সাবেক এই প্রধান নির্বাচকের কথায় খেলে যায় আশঙ্কা, ‘আমার মনে হচ্ছে, জাতীয় দল নির্বাচন এখন আর শুধু দুই নির্বাচক করেন না। এখানে আরো অনেকেই জড়িত। এটি কাম্য নয়। ভালো হোক বা খারাপ হোক, নির্বাচকদের কার্যক্রমে একটা পরিকল্পনা থাকতে হবে। ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। সেটি এখন দেখতে পাচ্ছি না, যা আমাকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করছে।’

দুই নির্বাচক মিনহাজুল ও হাবিবুল কতটা উদ্বিগ্ন, তা অবশ্য নিশ্চিত নয়। এত দিন চন্দিকা হাতুরাসিংহের নির্দেশনা মেনে চলেছেন; এখন বোর্ডের প্রভাবশালীদের মনোতুষ্টি করে চলাই যেন নিজেদের ব্রত করে নিয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক দুই অধিনায়ক। তাতে বাংলাদেশ ক্রিকেট পরিকল্পনাহীনতার ঘূর্ণাবর্তে পড়ে গেলেই কী!

ঢাল হিসেবে নিজেদের ‘অসহায়ত্ব’ তো রয়েছেই দুই নির্বাচকের জন্য।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা