Mominul

ফটো জোনের সবার চাপা অনুযোগ—এটা কিছু হলো!

আসলেই তো। চট্টগ্রাম টেস্টে প্রথম সেঞ্চুরির পর উল্লাসে ফেটে পড়া মমিনুল হক গতকাল ম্যাচ বাঁচানো আর রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরির পরও কেমন নিরামিষ সেলিব্রেশন করলেন; দিনভর রোদে পোড়া ফটো সাংবাদিকদের এমন মাজুল ফ্রেমে মন ভরবে কেন?

সে তুলনায় প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীরা ভাগ্যবান। মন ভরানো দিনে দারুণ কিছু ‘বাইট’ দিয়েছেন যে মমিনুল, যা খুব বেশি নিয়মিত নয়। এর অন্যতমটা বাংলাদেশ দলের সাবেক কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহেকে ঘিরে। না, পুরো চট্টগ্রাম টেস্টজুড়ে একবারও তাঁর নামটি মুখে আনেননি মমিনুল। বরং ১৭৬ রানের ইনিংস খেলে এসে উল্টো ইস্যুটাকে পরোক্ষে মিডিয়া আর সাধারণের রটনা বলে আড়াল নিয়েছিলেন মমিনুল। গতকাল অবশ্য মনের জানালা ছোট্ট করে খুলে দিয়েছেন প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে এক টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরিয়ান। সেই জানালা দিয়ে বেরিয়ে এক লড়াকুর সত্তা, যার সারবেত্তা; হাতুরাসিংহের যাবতীয় ‘অবিচার’ আরো প্রত্যয়ী করে তুলেছে মমিনুলকে। শিখিয়েছে সব প্রতিকূলতা জয়ের মন্ত্র। চাপের মুখে বারবার ভেঙে পড়া বাংলাদেশ এবার উতরে গেছে এই মন্ত্রেই।

‘আমার কাছে মনে হয় আমার জীবনের জন্য ওই জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আপনারা কিভাবে ভাবেন জানি না। এতে করে আমার মানসিকতায় একটা পরিবর্তন এসেছে, এখন আরো বেশি পরিশ্রম করি’, ছাপার অক্ষরে ঠিকঠাক ফুটিয়ে তোলা যায় না ওই বিশেষ মুহূর্তে মমিনুলের অভিব্যক্তি থেকে ঠিকরে বেরোনো আত্মবিশ্বাসের আলোকচ্ছটা। প্রসঙ্গটা উঠেছিল সেই হাতুরাসিংহের যুগ টেনে এনে। বাংলাদেশ দলের কোচ হওয়ার পর প্রথমে এই শ্রীলঙ্কান আবিষ্কার করেন মমিনুল শর্ট বোলিং খেলতে পারেন না। যাওয়ার বেলায় চাউর করে যান অফস্পিন বোলিংয়ে ‘মিনি’র দুর্বলতার কথা। আর মাঝখানের সময়টায় এমন সব কাণ্ড করেছেন হাতুরাসিংহে যে, মমিনুলের সহজাত আত্মবিশ্বাসও তলানিতে। টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডেতে তাঁকে দলেই নিতেন না। টেস্টেও মমিনুলের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছিলেন সাবেক কোচ। বাংলাদেশের বিদেশি কোচ মানেই প্রতাপশালী, হাতুরাসিংহে তো আরো ক্ষমতাবান। তাতে চাপে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার কথা যেকোনো খেলোয়াড়ের।

কিন্তু তিনি মমিনুল হক। কোচের বিরাগকে ক্যারিয়ার ধ্বংসের ঢাল না বানিয়ে নিয়েছেন প্রতিকূলতা জয়ের অদম্য দীক্ষা। ছুটে গেছেন বিকেএসপিতে। শৈশবের কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের কাছে শুধরে নিয়েছেন ছোটখাটো কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা। তাতেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরুর মমিনুল এখন আরো পরিণত। অন্তত সাফল্য বিবেচনায় তো বটেই। প্রায় সাড়ে তিন বছর বিরতির পর পাওয়া সেঞ্চুরির উদ্যাপন করেছেন দ্বিতীয় ইনিংসে ম্যাচ বাঁচানো ১০৫ রানের ইনিংস খেলে। এমন উচ্ছ্বাসের দিনে উপেক্ষার সাড়ে তিন বছর নিয়ে মৃদু হলেও ক্ষোভ প্রকাশ করতেই পারতেন মমিনুল। তবে সে-ই তো সত্যিকারের বীর যে কিনা প্রতিকূলতাকে জয় করতে পারে।

৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার মমিনুল জীবনের কঠিনতম যুদ্ধে জয়ী বীর—কোচের প্রবল উপেক্ষায় নেতিয়ে না পড়ে যিনি হেঁটেছেন সংগ্রামের পথে। ‘বৈরী’ কোচকে কটাক্ষ নয়, বরং কঠিন সময় ‘উপহার’ দেওয়ার জন্য পরোক্ষে যেন ধন্যবাদই দিলেন মমিনুল। সাবেক কোচকে ঘিরে বাতাসে ভাসতে থাকা জিঘাংসার ঝাঁজ ধুয়ে জানিয়ে দিলেন, কাউকে জবাব-টবাব দেননি তিনি, ‘ওই রকম কোনো চিন্তাভাবনা ছিল না। কোনো খেলোয়াড়ের পক্ষেই টার্গেট করে এটা-ওটা করব, এমন চিন্তাভাবনা করা সম্ভব না।’

২৬ টেস্টে ৬ সেঞ্চুরি মমুিনলের। এর পাঁচটাই জহুর আহমেদ চৌধুরীর বাদামি উইকেটে। বোধগম্য কারণেই এক ভেন্যুতে পাঁচ টেস্ট সেঞ্চুরি নেই আর কোনো বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের। এক টেস্টে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডটাও তামিম ইকবালের কাছ থেকে নিজের করে নিয়েছেন মমিনুল। তাতে চট্টগ্রামের উইকেটেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়ার কাল্পনিক ইচ্ছা হতেই পারে মমিনুলের। যদিও এমন কল্পনার ছিটেফোঁটাও নেই তাঁর, ‘এখানে রান করার বিশেষ কোনো কারণ নেই। আর ওইভাবে করে নামি না যে এই মাঠে আমি রান করি। গত দুই-তিনটা টেস্টে এই মাঠে কিন্তু আমার রান হয়নি। যাই হোক, এখানে আসলে রান হয়ে যায়, আল্লাহর রহমত।’

আউট হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে ক্রিজে প্রজাপতির স্বাচ্ছন্দ্যে ডানা মেলে উড়েছিলেন মমিনুল। কাল দ্বিতীয় ইনিংসেও বোলারদের শাসন করে গেছেন তিনি। পঞ্চম দিন আর ম্যাচ বাঁচানোর চাপের মাঝেও শ্রীলঙ্কার বোলিংকে নির্বিষ বানানোর স্বস্তি বেশি, মমিনুল দ্বিমত করেননি, ‘আমি দ্বিতীয় ইনিংসের সেঞ্চুরিটাকেই এগিয়ে রাখব। ওটা ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস ছিল।’

অথচ সেই ইনিংসটা খেলেই কোনো উচ্ছ্বাস নেই মমিনুলের, ফিফটির আর ম্যাচ বাঁচানো সেঞ্চুরির পর সঙ্গী লিটন দাশের অভিনন্দন নিয়ে ছোট্ট করে ব্যাট তুলেই আবার ক্রিজের দিকে ধাবমান তিনি।

ধ্যাত, এটা কোনো স্মরণীয় ফ্রেম হয় নাকি—ফটো সাংবাদিকদের প্রতি সহমর্মিতার যথেষ্ট উপাদান রয়েছে এতে।

অবশ্য এই আপাত মলিন উদ্যাপনও এ দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে লেখা হয়ে থাকবে জ্বলজ্বলে সোনার অক্ষরে—ব্যক্তিগত অর্জনে দলকে বাঁচানোর স্মারক হয়ে।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা