Zafarullah

‘অসত্যের কাছে নত নাহি হবে শির

 ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ, লড়ে যায় বীর’

—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

 ২৫ মার্চ ১৯৭১। লন্ডন আইটিএনের রাতের খবর ‘নিউজ অ্যাট টেন’।

টেলিভিশনের পর্দায় হঠাৎ আবির্ভূত হলেন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রায় সব নির্বাচনী এলাকায় বিজয়ী পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। সুঠাম, দীর্ঘদেহী, উন্নত শির, চোখে-মুখে দৃঢ় প্রত্যয়; কিন্তু চিন্তিত। ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ফটকে দাঁড়ানো, ঠোঁটের কোনায় চেপে রাখা ধূমপানের পাইপ। ব্রিটিশ সাংবাদিকের প্রশ্ন, ‘মিস্টার রহমান, আপনার কি পাকিস্তানিদের হাতে মারা যাওয়ার ভয় নেই?’ 

 

তাত্ক্ষণিক উত্তর দিলেন বঙ্গবন্ধু, ‘না, আমাকে মারলে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু কমিউনিস্টদের মুখোমুখি হতে হবে। ’

উল্লেখ্য, সত্তরের দশকে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কমিউনিস্ট অভ্যুত্থানের শঙ্কায় ছিল ভয়ানক চিন্তিত ও তাড়িত। কয়েক মুহূর্ত পরেই উচ্চৈঃস্বরে গম্ভীর গলায় শেখ মুজিব বললেন, ‘সাত কোটি বাঙালিকে হত্যার জন্য কি পাকিস্তানিদের পর্যাপ্ত গুলি আছে?’

চমকিত হলাম বীরের সাহসী বক্তব্যে।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতার খবর প্রকাশ পেল ২৭ মার্চ বিবিসি সংবাদে। একই দিন জেনারেল ইয়াহিয়ার পাকিস্তানিদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণ উদ্ধৃতি করে করাচি থেকে কেনেথ ক্লার্ক লিখলেন, ‘জিন্নাহর একতার স্বপ্ন রক্তে ধুয়েমুছে গেছে। ’ ২৭ মার্চে লন্ডনের টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হলো শেখ মুজিবের পক্ষে তরুণ বাঙালি মেজর জিয়ার বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা।

শেখ মুজিবুরের তুলনায় খর্বকায়; কিন্তু সাহস ও দৃঢ়তার চিহ্ন মুখমণ্ডলে। তাঁর উচ্চারিত দুই শব্দ—‘ডব জবাড়ষঃ’ শুনে চমকিত হলেন বিলেতের বাম রাজনৈতিককর্মীরা। দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল, পাকিস্তানের আয়ু শেষ হয়ে গেছে। নতুন দেশ স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম আসন্ন। একাধারে প্রসব বেদনার যাতনা, অপরপক্ষে শুভ সংবাদের জন্য অপেক্ষমাণ প্রবাসী বাঙালিরা। সঙ্গে সঙ্গে আমি ফোন করলাম মিডলসবরোতে আমার বন্ধু ডা. মাহমুদুর রহমান বাবলু ও তার স্ত্রী ডা. সাবেরাকে। বাবলুর মা মিসেস জহুরা রহমান খুবই মিশুক, দানশীল মহিলা এবং সুগায়িকা; বাবলুর বাবা অধ্যাপক লুত্ফর রহমান ছিলেন বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পরিচালক এবং প্রখ্যাত যক্ষ্মারোগ বিশেষজ্ঞ। অতীব নিরীহ ভদ্রলোক, ঠিক বাবলুর মার বিপরীত। তাঁরা উভয়ে আমাকে সন্তানসম স্নেহ করতেন। তাঁরাই পরে ১৯৭২ সালে সাভারে তাঁদের পুরো জমি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপনের জন্য দান করেছিলেন।

 দ্রুত যোগাযোগ করলাম ডা. মসিহুজ্জামানের সঙ্গে। মসিহ খুব ভালো ছাত্র ছিল। মসিহ ও আমি একই দিনে একই সঙ্গে বিলেতে গিয়েছিলাম। মসিহর বাবা পুলিশ ইন্সপেক্টর আকতারুজ্জামান আমার পাকিস্তানি পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাঁর সিদ্ধেশ্বরীর টিনের বাড়িতে বেশ কিছুদিন ভবিষ্যতের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে বসবাস করেছেন। মসিহর ছোট ভাই কর্নেল খাইরুজ্জামান ফিলিপাইন ও মিয়ানমারে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন।

আমি বাঙালি ডাক্তারদের সঙ্গে প্রতিদিন রাত ১২টা পর্যন্ত ফোনে কথা বলতাম। সবাই চিন্তিত, উত্কণ্ঠিত। ১৯৭১ সালে এক হাজারের বেশি বাঙালি ডাক্তার আয়ারল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিভিন্ন কাউন্টিতে কর্মরত ছিলেন, মূলত উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁরা ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যে আগত। এ ছাড়া এক লাখের বেশি বাঙালি ছিল বিভিন্ন পেশার এবং হোটেল-রেস্টুরেন্টের কর্মচারী, যাদের বেশির ভাগই সিলেটের। বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র ছিল কয়েক হাজার। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন তাদের মধ্যে অন্যতম। লন্ডন, গ্লাসগো, এডিনবরা, ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম, কভেন্ট্রি, লিডস, নিউ ক্যাসেল, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজসহ অন্যান্য ছোট-বড় শহরে শনি-রবিবার পূর্ব পাকিস্তানের চিকিত্সক, ছাত্র ও অন্য পেশাজীবীরা জড় হতে থাকলেন শহরের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে।

সম্ভবত ২৭ মার্চ ছিল শনিবার। লন্ডনে সবচেয়ে বেশি ভিড় হতে থাকল পুরনো কমিউনিস্টকর্মী তাসাদ্দুক হোসেনের দ্য গ্যানজেস রেস্টুরেন্টে। এটা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিদীপ্ত ছাত্রদের আড্ডাখানা। এখানে শুক্রবার সন্ধ্যা এবং শনি ও রবিবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অনেক সদস্য সপরিবারে ভারতীয় খাবারের স্বাদ নিতে আসতেন।

৩০ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার সর্বত্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতার চিত্র প্রকাশ করল তাদের রিপোর্টার সাইমন ড্রিংয়ের বরাতে, পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় বড় শিরোনামে। টেলিগ্রাফের সংবাদে পূর্ব পাকিস্তানিরা স্তম্ভিত হয়ে যায়। সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পরিচিত ও নিকটজনের চিন্তায়। ভাবের আতিশয্যে হাইড পার্কে কয়েকজন বাঙালি পাসপোর্ট ছিঁড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমিও তাদের অনুসরণ করি। আমরা রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত হই।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকা শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার আগে ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও শেখ মুজিবের আলোচনা পর্যবেক্ষণের জন্য আগত বিভিন্ন দেশের মিডিয়া ও সাংবাদিকদের  ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ দেন। বিবিসির মাইকেল ক্লেটন ও ডেইলি টেলিগ্রাফের সাইমন ড্রিং ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ছাদে লুকিয়ে থাকেন ঢাকার ইংরেজি দৈনিক দ্য পিপলের সম্পাদক আবিদুর রহমানের পরামর্শে। পরে অ্যাসোসিয়েট প্রেসের ফটোগ্রাফার মিশেল লরেন্টকে নিয়ে সাইমন ড্রিং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৫ মার্চ রাতে বর্বরতা ও নির্মমতার স্বাক্ষরের চিত্র ধারণ করে সুকৌশলে পরের দিন ব্যাংকক পৌঁছে সেখান থেকে ডেসপ্যাচ পাঠান, যা ৩০ মার্চ ১৯৭১ ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত হয় প্রথম পৃষ্ঠায়, বড় শিরোনামে।

স্মরণ প্রয়োজন, শেখ মুজিবের ১৯৭১-এর ৭ই মার্চের বিখ্যাত ভাষণ—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম,’ ৯ মার্চ পল্টন ময়দানের জনসভায় মওলানা ভাসানীর ‘স্বাধীনতার দাবিতে আপসহীন’ থাকার আহ্বান এবং ১২ মার্চ ময়মনসিংহে কৃষক সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর স্বাধীনতার পক্ষে অবিচল থাকার পুনঃ আহ্বানকে বিলেতের বাঙালি পেশাজীবী ও ছাত্ররা খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর পাকিস্তানকে ‘ওয়ালাইকুমস সালাম’ খুব বেশি উত্তাপ সৃষ্টি করেনি। এসব বক্তব্যকে তারা দরাদরির রাজনৈতিক স্টান্ট বলে ধরে নিয়েছিল। তবে এবার প্রবাসী বাঙালিরা ধাক্কা খেল আইটিএন, বিবিসি এবং টাইমস ও টেলিগ্রাফের সচিত্র সংবাদে।

অধিকতর সংবাদ প্রত্যাশায় তারা জড়ো হতে থাকে সপ্তাহ শেষে শনি-রবিবার ৩ ও ৪ এপ্রিল লন্ডনের হাইড পার্ক কর্নারে। জমে ওঠে বক্তৃতা ও পাকিস্তানিদের প্রতি ধিক্কার। অধিকতর সংবাদ সংগ্রহ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে লন্ডনের পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-শিক্ষক, রাজনৈতিককর্মীদের ধারণা ও চিন্তার তথ্য জ

উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা