dhormo-un

মানবজাতিকে আল্লাহ তায়ালা আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে স্বাধীন চিন্তাশক্তি দিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। ফলে তার মাঝে তিন প্রকার নফসের সম্মিলন ঘটেছে। নফসে আম্মারাহ, নফসে লাউওয়ামাহ ও নফসে মুতমাইন্নাহ। এর মধ্যে নফসে আম্মারাহ বা কুপ্রবৃত্তি মানুষকে জৈবিক কামনাবাসনা ও দুনিয়ার লোভলালসার দিকে আকৃষ্ট করে তাকে মন্দকাজের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ। কিন্তু সে মন নয়, আমার পালনকর্তা যার প্রতি অনুগ্রহ করেন’ (ইউসুফ ১২/৫৩)। অধিক হারে মন্দকাজ বান্দার অন্তরকে কঠিন করে তোলে ও ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। রাসূল সা: বলেছেন, ‘যখন বান্দা কোনো পাপ করে তখন তার অন্তরে কালো দাগ পড়ে যায়। যখন সে তওবা করে তখন সেটা তুলে নেয়া হয়। আর ইস্তিগফারের মাধ্যমে অন্তরকে পরিষ্কার করা হয়। আর যদি পাপ বাড়তেই থাকে তাহলে দাগও বাড়তে থাকে। আর এটাই হলো মরিচা’ (তিরমিজি হা/৩৩৩৪; মিশকাত হা/২৩৪২)। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘বরং তাদের কৃতকর্মের ফলেই মনের ওপর মরিচা জমে গেছে’ (সূরা মুতাফফিফিন : ১৪)। দুনিয়ায় প্রতিটি মানবসত্তাই মন্দকাজে লিপ্ত হয়ে থাকে। তাই তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আত্মসমালোচনা একান্ত প্রয়োজন। প্রতিদিন মানুষ নিজেই নিজের পাপের হিসাব নেয়ার মাধ্যমে পুনরায় ওই পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে। 

আত্মসমালোচনার পরিচয় : আভিধানিক অর্থে আত্মসমালোচনা হলো নিজের সম্পর্কে সমালোচনা করা। একে আরবিতে বলা হয়, ‘স্বীয় আত্মার হিসাব গ্রহণ করা।’ লিসানুল আরব অভিধানে বলা হয়েছে, ‘মুহাসাবা’র শাব্দিক অর্থ হলো গণনা করা বা হিসাব করা। সুতরাং ‘মুহাসাবাতুন নাফস’-এর অর্থ হচ্ছে আত্মার হিসাব গ্রহণ করা। পারিভাষিক অর্থে আত্মসমালোচনা বলতে বোঝায়, সচেতনভাবে কোনো কাজ সম্পন্ন করা বা পরিত্যাগ করা, যাতে কৃতকর্ম সম্পর্কে নিজের সুস্পষ্ট ধারণা থাকে।
আত্মসমালোচনার হুকুম ও গুরুত্ব : ‘মুহাসাবাতুন নাফস’ বা আত্মসমালোচনাকে প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য ঘোষণা করে আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য উচিত আগামীকালের জন্য (অর্থাৎ আখিরাতের জন্য) সে কী পাঠিয়েছে, তা চিন্তা করা। আর তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে; ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মভোলা করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই তারা ফাসিক’ (সূরা হাশর ১৮)।
আত্মসমালোচনার গুরুত্ব সম্পর্কে ওমর রা:-এর নিম্নোক্ত বাণীটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘তোমরা নিজেদের আমলনামার হিসাব নিজেরাই গ্রহণ করো, চূড়ান্ত হিসাব দিবসে তোমাদের কাছ থেকে হিসাব গৃহীত হওয়ার আগেই। আর তোমরা তোমাদের আমলনামা মেপে নাও চূড়ান্ত দিনে মাপ করার আগেই। কেননা আজকের দিনে নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করতে পারলে আগামী দিনের চূড়ান্ত মুহূর্তে তা তোমাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। তাই সেই মহাপ্রদর্শনীর দিনের জন্য তোমরা নিজেদেরকে সুসজ্জিত করে নাও, যেদিন তোমরা (তোমাদের আমলসহ) উপস্থিত হবে এবং তোমাদের কিছুই সেদিন গোপন থাকবে না’ (তিরমিজি হা/২৪৫৯, সনদ মওকুফ সহিহ)।
আত্মসমালোচনার উপকারিতা : ১. নিজের দোষত্রুটি নিজের সামনে প্রকাশ করার মাধ্যমে মানুষ স্বীয় ভুলত্রুটি জানতে পারে। ফলে তার হৃদয় ভালো কাজের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং মন্দকাজ থেকে দূরে থাকতে পারে। ২. আত্মসমালোচনা দ্বীনের ওপর দৃঢ়তা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম, যা মানুষকে আল্লাহর দরবারে মুহসিন ও মুখলিছ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে। ৩. আত্মসমালোচনার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নেয়ামতগুলো, অধিকারগুলো জানতে পারে। আর সে যখন আল্লাহর নেয়ামত ও তার অবস্থান সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে, তখন সে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ে উদ্বুদ্ধ হয়। ৪. আত্মসমালোচনার মাধ্যমে মানুষের মাঝে পরকালীন জওয়াবদিহিতার উপলব্ধি সৃষ্টি হয়। মাইমুন বিন মিহরান বলতেন, ‘মুত্তাকি ব্যক্তি সেই, যে নিজের জওয়াবদিহিতা এমন কঠোরভাবে গ্রহণ করে যেন সে একজন অত্যাচারী শাসক’ (ইহয়াউ উলুমিদ্দীন ৩/৩৯৫)। ৫. আত্মসমালোচনা জীবনের লক্ষ্যকে সব সময় সজীব করে রাখে। এর মাধ্যমে আমরা অনুভব করতে পারি আমাদেরকে এই পৃথিবীর বুকে অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি। পার্থিব জীবন শুধু খাওয়াদাওয়া, হাসিঠাট্টার নয়, এ জীবনের পরবর্তী যে অনন্ত এক জীবন, তার জন্য যে আমাদের সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে, আত্মসমালোচনা আমাদেরকে সর্বক্ষণ তা স্মরণ করিয়ে দেয়। ৬. মুহাসাবার ফলে কোনো পাপ দ্বিতীয়বার করতে গেলে বিবেকে বাধা দেয়। ফলে পাপের কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।
আত্মসমালোচনার পদ্ধতি : আত্মসমালোচনা দুইভাবে করা যায়; যথা- ১. কোনো আমল শুরু করার আগে মুহাসাবা করা : অর্থাৎ কোনো কাজের সঙ্কল্প করার আগেই সে কাজ সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে যে, কাজটি ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের জন্য উত্তম, না ক্ষতিকর? কাজটি কি হারাম, না হালাল? কাজটিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে, না অসন্তুষ্টি? অতঃপর যখন কাজটি উত্তম হবে, তখন আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে কাজে নেমে পড়তে হবে। আর কাজটি খারাপ হলে একইভাবে পূর্ণ একনিষ্ঠতা ও তাওয়াক্কুলের সাথে তা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রতিদিন সকালে আন্তরিকভাবে প্রত্যয়দীপ্ত হতে হবে, যেন সারা দিন সৎ আমলের সাথে সংযুক্ত থেকে অসৎ আমল থেকে বিরত থাকা যায়। ২. আমল শেষ করার পর মুহাসাবা করা : এটা তিনভাবে করা যায়- ক. আল্লাহর আদেশগুলো আদায়ের ব্যাপারে আত্মসমালোচনা করা : আমাদের ওপর নির্দেশিত ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফলগুলো পর্যালোচনা করা। নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে যে, আমি কি আমার ওপর আরোপিত ফরজগুলো আদায় করেছি? আদায় করলে সাথে সাথে নফল বা মুস্তাহাবগুলো কতটুকু আদায় করেছি? কারণ ফরজের কোনো অপূর্ণতা হলে নফলগুলো সেটা পূরণ করে দেয় (আবু দাঊদ, মিশকাত হা/১৩৩০ সনদ সহিহ)।
সালাফে ছালেহিনের আত্মসমালোচনার দৃষ্টান্ত : আনাস রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমি একবার ওমর রা:-এর সাথে বের হলাম। পথিমধ্যে তিনি একটি বাগানে ঢুকলেন। এমতাবস্থায় আমার ও তাঁর মধ্যে বাগানের একটি দেয়াল আড়াল হয়েছিল। আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, তিনি নিজেকে সম্বোধন করে বলছেন, ‘ওমর ইবনুল খাত্তাব! আমিরুল মুমিনিন সাবাস! সাবাস! আল্লাহর শপথ! হে ইবনুল খাত্তাব! অবশ্যই তোমাকে আল্লাহর ভয়ে ভীত হতে হবে। অন্যথা তিনি তোমাকে শাস্তি দেবেন’ (মুওয়াত্তা মালেক হা/৩৬৩৮, আল-বিদায়াহ ৭/১৩৫)। ওছমান রা: যখন কোনো কবরের কাছে দাঁড়াতেন তখন তিনি কাঁদতেন, যাতে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। তাঁকে বলা হলো জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনায় আপনি কাঁদেন না, অথচ কবর দেখলে আপনি কাঁদেন কেন? জবাবে তিনি বললেন, ‘রাসূল সা: বলেছেন, কবর হলো পরকালের পথের প্রথম মনজিল। যদি এখানে কেউ মুক্তি পায় তাহলে পরের মনজিলগুলো তার জন্য সহজ হয়ে যায়। আর যদি এখানে মুক্তি না পায় তাহলে পরেরগুলো আরো কঠিন হয়ে যায়।’ রাসূল সা: বলেছেন, ‘আমি কবরের চেয়ে ভয়ঙ্কর কোনো দৃশ্য আর দেখিনি’ (তিরমিজি, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৩২, ‘কবরের আজাবের প্রমাণ’ অনুচ্ছেদ)।
বারা বিন আজেব রা: থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূল সা:-এর সাথে ছিলাম। হঠাৎ তিনি একদল লোককে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘ওরা কী উদ্দেশ্যে একত্র হয়েছে? একজন বললেন, এরা একটি কবর খুঁড়ছে। রাবি বলেন, এ কথা শুনে রাসূল সা: আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন এবং সঙ্গীদের আগে দ্রুত বেগে কবরের কাছে পৌঁছে হাঁটু গেড়ে বসলেন। রাবি বলেন, তিনি কী করছেন তা দেখার জন্য আমি তাঁর মুখোমুখি বসলাম। তিনি কেঁদে ফেললেন, এমনকি অশ্রুতে মাটি ভিজে গেল। অতঃপর তিনি আমাদের দিকে ফিরে বসে বললেন, হে ভাইয়েরা! এ রকম দিবসের জন্য রসদ প্রস্তুত রেখো’ (আহমাদ, সিলসিলা সহিহ হা/১৭৫১)।
উপসংহার : আত্মসমালোচনা আমাদের পার্থিব জীবনে দায়িত্বশীলতা সৃষ্টি করে, পরকালীন জওয়াবদিহিতার চিন্তা বৃদ্ধি করে এবং বিবেককে শাণিত করে। করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভে সাহায্য করে। সর্বোপরি জীবনের উচ্চতম লক্ষ্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার কাজে সর্বদা প্রহরীর মতো দায়িত্ব পালন করে। আত্মসমালোচনা, অন্যের ত্রুটি ধরার আগে নিজের ত্রুটি ধরতে আমাদের শিক্ষা দেয়। অন্যের নিন্দা করার আগে নিজের মধ্যে বিদ্যমান খারাপ দূর করতে উদ্বুদ্ধ করে। এর দ্বারা আমরা নিজেদের যেমন সংশোধন করে নেয়ার চেষ্টা চালাতে পারব, তেমনি অন্যের মাঝে ভুল দেখতে পেলে ভালোবাসা ও স্নেহের সাথে তাকেও শুধরে দেয়ার চেষ্টা করতে পারব। এভাবে সমাজ পরিণত হবে পারস্পরিক সহযোগিতা, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যে পূর্ণ এক শান্তিময় সমাজ।
লেখক : প্রবন্ধকার

 



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / আ/ম

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা