CEC-Nurul-Huda

আগামী ২৩ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের দিন রেখে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি এ তফসিল ঘোষণা করেন।

 

সিইসির ভাষণ রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে সম্প্রচার করা হয়।

তফসিল অনুসারে, আগামী ২৩ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ করা হবে। ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত প্রার্থিরা মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারবেন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ২২ নভেম্বর। ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে। আর প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে ৩০ নভেম্বর।

নিচে জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার বক্তব্য তুলে ধরা হলো—

বিসমিল্লাহহির রাহমানির রাহিম

প্রিয় দেশবাসী

আসসালামু আলাইকুম।

শুরুতেই আমি স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। একই সাথে স্ব-শ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছি অকুতোভয় যেসব বীর সন্তানদের স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়েছেন। স্মরণ করি ৫২’র ভাষা শহীদের যাদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মায়ের ভাষা; অর্জিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

আন্দোলন, আত্মদান আর সংগ্রামের ফসল স্বাধীন সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশ। ভাষা আন্দোলনে আত্মদানের প্রত্যয় নিয়ে স্বাধিকার আন্দোলন। স্বাধিকার আন্দোলেনের প্রেরণায় মুক্তি সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের অর্জন।

লাল সবুজ পতাকার এক খণ্ড বাংলাদেশ। চরম ক্ষুধা দারিদ্র, অবনতকর আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ভৌত অবকাঠামো নিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম। নবীণ সেই দেশটি আজ উন্নত বিশ্ব অভিমুখ অভিযানে দীপ্ত পদে এগিয়ে চলছে। এদেশের মানুষের প্রত্যাশা শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে, গণতন্ত্রের মজবুত ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর  সারিতে দাঁড় করাতে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে উন্নত ও গণতন্ত্রকে সমান্তরাল পথ ধরে অগ্রসর হতে হবে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। আমরা সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য শপথ নিয়েছি। সংবিধান মোতাবেক ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ সালের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্য বাধকতা রয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনের ক্ষণ গণনা শুরু হয়ে গেছে। আমি আজ একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছি। তাই সকলের অংশ গ্রহণে সব রাজনৈতিক দলকে তাতে অংশ নিয়ে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের উন্নয়নের ধারা এবং গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।

প্রিয় দেশবাসী

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, জাতীয় সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ, আইন সংস্কারসহ মোট ৭টি করণীয় বিষয় স্থির করে ২০১৭ সালে আমরা একটি কর্ম-পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিলাম। সংলাপের মাধ্যমে ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নারী-নেত্রী সংগঠনের কাছে কর্ম-পরিকল্পনাটি তুলে ধরেছিলাম। তাদের পরামর্শ এবং সুপারিশ বিচার-বিশ্লেষণ করে করণীয় বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কতিপয় আইন ও বিধির উপর সংশোধন এবং সংসদীয় এলাকার সীমানা পুননির্ধারণ করে গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে।

নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার ভোট কেন্দ্রের বাছাই কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৭৫ টি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আবেদন নিষ্পতি করা হয়েছে। কর্মকর্তাগণের সক্ষমতা অর্জন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। প্রথমবারের মত নির্বাচনী এজেন্টগণের প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পর্কে ইতোমধ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করা হয়েছে।

প্রিয় দেশবাসী

নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৭ লক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগের প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় নির্বাহী এবং বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে ৬ লক্ষাধিক পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব, কোস্টগার্ড, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যকে নির্বাচনের আগে ও পরে মোতায়েন করা হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে। তারা আইনানুগ ও নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে সুদৃঢ় থাকবেন। তাদের দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও একাগ্রতার উপর বিশেষ দৃষ্টি রাখা হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হলে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নির্বাচন চলাকালে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক প্রশাসনকে যথা-প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য Aid to the Civil Power বিধানের অধীনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন থাকবে।

প্রিয় দেশবাসী

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহের জাগরণ ঘটে। তাদের বিপুল উৎসাহ, উদ্দীপনা আর উচ্ছ্বাসে গোটা দেশ উজ্জীবিত হয়। রাজনীতিবিদদের কৌশল প্রণয়ন, প্রার্থীদের নির্ঘুম প্রচারণা, সমর্থকদের জনসংযোগ ভোটারদের হিসেব-নিকেশ সব কিছু নিয়ে একটি আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ভোটের দিনে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে আবাল বৃদ্ধ-বনিতার মধ্যে সৃষ্ট আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশ রক্ষায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ হতে সব ধরণের সকর্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ২০১৮ সাল সেই নির্বাচনের বছর। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে দিয়েছে। সুশীল সমাজ সু-চিন্তিত মতামত প্রকাশ অব্যাহত রেখেছে। গণমাধ্যমে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণের মতামত, বক্তব্য, প্রবন্ধ, প্রতিবেদন, আলোচনা-সমালোচনা ও সুপারিশ প্রকাশ করছে। নির্বাচন নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রতিনিয়ত টক-শো প্রচারিত হচ্ছে। সব সংবাদ মাধ্যমে বিশেষ খবর ও প্রতিবেদন প্রচার করা হচ্ছে। দেশি-বিদেশি বহুসংখ্যক সংগঠন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সার্বিকভাবে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি অনুকূল আবহ সৃষ্টি হয়েছে।

জাতির এমন উচ্ছ্বসিত প্রস্তুতির মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আমি প্রত্যাশা করবো, অনুরোধ করবো এবং দাবি করবো; প্রার্থী এবং তাঁর সমর্থক নির্বাচনী আইন ও আচরণ বিধি মেনে চলবেন। স্ব স্ব এলাকার গণ্য-মান্য ব্যক্তি এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি ভোট কেন্দ্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতকরণে সহায়তা করবেন।  ফলাফলের তালিকা হাতে না নিয়ে পোলিং এজেন্টগণ কেন্দ্র ত্যাগ করবেন না।

নির্বাচনী কর্মকর্তাগণ নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে অটল থাকবেন। নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটগণ আইনের প্রয়োগ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণ ভোটার, প্রার্থী এবং ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। গণমাধ্যম কর্মী বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশ ও পর্যবেক্ষকগণ নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা মেনে দায়িত্ব পালন করবেন এই প্রত্যাশা করি।

প্রিয় দেশবাসী

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় জনগণের মালিকানায় অধিকার প্রয়োগের সুযোগ সুষ্টি হয়; নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্র তৈরি হয়। এমন নির্বাচনের দেশের সব রাজনৈতিক দলকে অংশগ্রহণ করার জন্য আবারো আহবান জানাই। তাদের মধ্যে কোন বিষয় নিয়ে মতানৈক্য বা মতবিরোধ থেকে থাকলে রাজনৈতিকভাবে তা মীমাংসার অনুরোধ জানাই। প্রত্যেক দল একে অপরের প্রতি সহনশীল, সম্মানজনক এবং রাজনীতিসূলভ আচরণ আমি প্রত্যাশা করছি। সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে প্রার্থীর সমর্থকদের সরব উপস্থিতিতে অনিয়ম প্রতিহত হয় বলে আমি বিশ্বাস করি। প্রতিযোগিতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কখনও প্রতিহিংসা বা সহিংসতায় পরিণত না হয় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি আমাদের কাম্য।

প্রিয় দেশবাসী

ভোটার, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, প্রার্থীর সমর্থক ও এজেন্ট যেন বিনা কারণে হয়রানির শিকার না হন বা মামলা-মোকদ্দমার সম্মুখীন না হন তার নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃপক্ষের উপর বিশেষ নির্দেশ রইল। দলমত নির্বিশেষে সকল সংখ্যালগু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টী ও নারী-পুরুষ নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ; ভোট শেষে নিজ নিজ বাসস্থানে নিরাপদে অবস্থান এবং নির্বাচনী প্রচারণায় সকল প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষে অভিন্ন আচরণ ও ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

প্রিয় দেশবাসী

নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কমিশনের নিজস্ব নেটওর্য়াকের মাধ্যমে প্রার্থীদের তথ্য ব্যবস্থাপনা, নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি আদান-প্রদান পদ্ধতি সংক্রান্ত সফটওয়ার ও প্রোগ্রাম আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হয়েছে। সরাসরি মনোনয়নপত্র দাখিলের পাশাপাশি অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের বিধানও রাখা হয়েছে। পুরাতন পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর  ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের মাধ্যমে সীমিত আকারে ভোট গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ ভোট গ্রহণে ইভিএম ব্যবহারে সুফল পাওয়া গেছে। জনসাধারণকে ইভিএম ব্যবহারে সচেতন করে তুলার লক্ষ্যে জেলা এবং আঞ্চলিক  পর্যায়ে প্রদর্শনীর মাধ্যমে ইভিএম এর উপকারিতা সম্পর্কে ভোটারগণকে অবহিত করা হয়েছে। ইভিএম ব্যবহারে তাদের মধ্যে উৎসাহ আগ্রহ আশাব্যঞ্জক। আমরা বিশ্বাস করি ইভিএম ব্যবহার নির্বাচনের গুণগত মান উন্নত করবে এবং সময়, অর্থ ও শ্রমের সাশ্রয় হবে।

প্রিয় দেশবাসী

একাদশ জাতীয় সংসদ এর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বধ্যবাধকতা সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করছি।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / du

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা