Istiaq

কুশল ইশতিয়াক। জন্ম ১৭ জুলাই, ১৯৮৭, বরিশাল। এমবিবিএস, ঢাকা মেডিকেল কলেজ। পেশায় চিকিৎসক, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস। কবিতার বই : উইপোকার স্বপ্নের ভেতর [চৈতন্য, ২০১৬] জোছনাঘর [আগুনমুখা, ২০১৫]। দ্বিতীয় দশকের কয়েকজন কবির কাব্য-ভাবনা ও লেখালেখি নিয়ে  সাহিত্যের এই আয়োজন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একই সময়ের কবি রাসেল রায়হান।

কবিতা আইডিয়ানির্ভর লিখতে ভালো লাগে, নাকি ভাষা-নির্ভর? নাকি এর কোনোটাই না?

 

আইডিয়া আর ভাষা, এই দুইটি নিয়েই কবিতা। আবার কবিতা এই দুইটির কোনোটাই না। কবিতার মধ্যে কবির একটা বক্তব্য থাকে। সে একটা কিছু বলে বা চেষ্টা করে বলার। আওড়ায়। তো, এই বক্তব্যই হচ্ছে আইডিয়া। সে যেইভাবে বলে, এটা তার ভাষা।

কবিতা আসলে আইডিয়ানির্ভর হয় না। কবিতা মূলত কবিতাই, সে আইডিয়াকে তার শরীরে ধারণ করতে পারে, এই যা। ভাষানির্ভর কবিতারও কিন্তু একটা বক্তব্য থাকে। তা যদি না থাকে, তবে সে অর্থহীন। এখন এই অর্থহীনতা কবিতা হয়ে উঠতেও পারে। আবার নাও পারে।

আমার কবিতাটা লিখতেই ভালো লাগে। তাতে অনেক সময় আইডিয়া থাকে, অনেক সময়ই থাকে না। আর আমি যা লিখি, তাই আমার ভাষা।

 এখন এই অর্থহীনতা কবিতা হয়ে উঠতেও পারে।' এই কথাটাকে ব্যবহার করে কি অজস্র অর্থহীন অকবিতা লেখা হচ্ছে না?

হ্যাঁ হচ্ছে।

 সেক্ষেত্রে এটাকে কীভাবে দেখেন? অজস্র দুর্বোধ্য লেখা হচ্ছে, তার উপরে কবিতার ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ‘না বুঝলে না বোঝেন, আমার কিছু যায় আসে না।’

কবিতা তো ভালো লাগার ব্যাপার। ভালো লাগার ব্যাপারটা না থাকলে বোধ্য-দুর্বোধ্য—কিছুতেই কী যায় আসে? ভালো লাগাটাই থাকে। জগতের অনেক রহস্যই আমরা উদ্ধার করতে পারি না। জগত কিন্তু সুন্দরই রয়ে গেছে। মূল ব্যাপারটা হচ্ছে দুর্বোধ্য জিনিসটাও কতটুকু কবিতা হয়ে উঠল, সেটা।

 ভাষাকে একজন কবি ঠিক কিসের ভিত্তিতে আয়ত্তে নিতে চান? আপনি কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন করেছেন, বা করেন?

ভাষার আসলে কোনো নির্বাচন নাই। এটা অনেকটা, মানুষের মুখাবয়বের মতন। আমাদের চেহারার ওপর আমার যেমন কোনো হাত নাই, তারে পরিবর্তন করা আমাদের কম্মো না, ঘষামাজা করে স্রেফ একটু আধটু উজ্জ্বল আর সুর্দশন করে তোলা যায়, এটাও তেমন। আপনার ভিতরে আপনার ভাষা আছে। আমার ভিতরে আমার। কেউ কেউ নিজের ভাষাটাকেই খুব ভালোভাবে তুলে আনতে পারে। কেউ কেউ পারে না। নির্বাচন খুব গৌণ এখানে। কিংবা কেউ সচেতনভাবে করতে চাইলে কতটুকু কবিতা দাঁড়ায়, কে জানে।

 ‘হায় মহাত্মা, তুমি বুঝলা না
ভাষারে নিয়া আমি লারেলাপ্পা খেলি।’

এই কথাটা পড়লে অবশ্য মনে হয় না ভাষাটাকে আপনি খুব গুরুত্ব দেন...?

ভাষাকে গুরুত্ব আমি অত দেই না। তবে যারা গুরুত্ব দেয়, তাদের গুরুত্ব দিতে ছাড়ি না।

 আপনার ঐ দুই পঙক্তি ধরেই বলছি, যদিও যে কারো ক্ষেত্রেই দেখা যায়, লেখার সাথে জীবন-যাপনের বিস্তর ফারাক। হয়তো কবিতায় বোঝাচ্ছেন, কাউকে আঘাত দিতে নেই, বাস্তবে অহরহ দিচ্ছেন। এই পরস্পরবিরোধী বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

কবিতা একটা আয়না যাতে সত্যকে মিথ্যার মতন লাগে। আর মিথ্যাকে লাগে সত্যের মতো।

 আপনি তো ডাক্তার। ভালো রেজাল্ট করা। যদিও কবিতা কিংবা শিল্পের জন্য একাডেমিক জ্ঞান কোনো ফ্যাক্ট না, তবু এটাও আমরা জানি, ডাক্তারি পড়তে গেলে কতটা ধ্যান হিসেবে নিতে হয় পড়াশোনা। এর ভিতরে কবিতার পথ কীভাবে আলাদা রেখেছেন?

আমি মূলত দুইটা জীবন যাপন করি। একটা জীবনে আমি চিকিৎসক, আমি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠি, অফিসে যাই, কাজ করি, একাডেমিক পড়াশোনা করি ইত্যাদি ইত্যাদি। ছুটি হলে বাসায় ফিরে আসি।

আর একটা জীবনে আমি কবিতা লিখি। নিজের মধ্যে থাকি, নিয়মহীন, উদ্দেশ্যহীন, যা ভালো লাগে—পড়তে, ঘুমাতে, রাস্তায় হাঁটতে—এভাবেই। এটাও এক ধরনের যাপন। আমার কাছে তাই কোনোটার জন্যই কোনোটা আটকে থাকে না। প্রভাবে যে একেবারে পড়ে না, তা না। তবে আমি দুইটা জীবন আলাদা রাখার চেষ্টা করি। একটা জীবন অন্য জীবনের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা, বলা যায়।

 প্রিয় কয়েকজন কবির নাম বলেন...

জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, তারাপদ রায়, কালীকৃষ্ণ গুহ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, ব্রাত্য রাইসুর কিছু কিছু কবিতা ভালো লাগে। আর ইমতিয়াজ মাহমুদ।

 আপনার প্রিয় কবিদের লেখার সাথে তুলনা করে যদি জিজ্ঞেস করি, সেই বিচারে এই সময়ের কবিতাকে কীভাবে দেখেন... এই সময় মানে স্পেসিফিক্যালি আপনার সময়

আমার সময়ের কবিতা বাংলাদেশের গত ত্রিশ চল্লিশ বছরের তুলনায় ভালো।

 অনেক কবিকে আফসোস করতে দেখি, ঢাকায় কবিদের সাথে না মিশলে কবি হওয়া যায় না। যারা অভিযোগ করে, বোঝাই যায় তারা ঢাকার বাইরে। আপনি বরিশাল আছেন বলে প্রশ্নটা করছি। আপনার কি মনে হয়, এই অভিযোগ সত্যি? ঢাকা ঠিক কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?

ঢাকার এমন কোনো জাদু আছে বলে আমার জানা নাই। আর মেশামিশি করে কবি হওয়া গেলে দুনিয়ার সবাই আজ কবি থাকত। ঢাকা যেটা করে, সেটা হচ্ছে কবির যোগাযোগ কিছুটা বাড়ায়। তাতে কবির পরিচিতিটা বেশি বাড়ে। অকবির কিছুটা পরিচিতিও ঘটে। কিন্তু সেটাকে তো কবি হওয়া বলে না।

 শেষ পর্যন্ত একজন কবিকে তো ঢাকার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় না। সামান্য সময়ের ব্যবধানে (হয়তো ৫০ বছর, সেটা নিশ্চয়ই বেশি না) একজন কবিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে জীবনানন্দ দাশের সাথে, আল মাহমুদের সাথে। যেমন এখনই জীবনানন্দের সাথে রবীন্দ্রনাথের কবিতার তুলনা করা হচ্ছে, কে বেশি শক্তিমান—এই প্রসঙ্গে; আরও বড় পরিসরে জীবনানন্দ কিংবা এলিয়টের কবিতা তুলনা করা যায়। তো এই প্রেক্ষাপটে এমন সব অদ্ভুত আফসোসকে কীভাবে দেখেন?

রবীন্দ্রনাথ আসলে কারও সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নাই। জীবনানন্দও করছেন বলে মনে হয় না। কবি আসলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করে না। নিজের লেখাটা লেখে। মহান কবিরা যদি প্রতিদ্বন্দিতা করত, তবে মহান হয়ে উঠতে পারত কি না—সন্দেহ। এরা সবাই বড় এদের নিজ গুণে। নিজস্ব জাদুতে। কবিরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও না, বরং তুলনা করে অন্য মানুষেরা। তো এইখানে আসলে আফসোস করার কিছু নাই। যা আছে যার কপালে। বড় হওয়ার সামর্থ্য থাকলে বড় হওয়া হবে। বড় হওয়া না থাকলে, বড় হওয়া হবে না।

 এই যে মহান হওয়ার কথা বললেন, এই মহান হওয়ার পেছনে ভালো মানুষ হওয়ার কোনো যোগ আছে কি না? অনেকেই তো বলে, কবিদের ভালো মানুষ হতে হবে। আসলেই তাই?

কবিদের ভালো মানুষই হতে হবে, এমন কোনো কথা নাই। কবি যেমন খুশি, কবি তেমন হতে পারে। আমরা তো কবিকে পাঠ করি, কবি ভালো না খারাপ, তা দিয়ে আসলেই কি কিছু যায় আসে?

 আচ্ছা, লিটলম্যাগের ক্রমাগত ম্রিয়মাণতার বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন? এর প্রয়োজনীয়তা এই সময়ে কতটুকু?

মানের কারণেই ম্রিয়মাণ। একদম নিরপেক্ষ, আদর্শ মানের লিটলম্যাগ থাকলে জনপ্রিয় থাকত। নাই। তাই প্রয়োজনীয়তাও কমছে তার।

 কুশল, আপনি ব্লগে লিখতেন না?

হ্যাঁ। ব্লগিং করতাম।

 সোশাল মিডিয়ার এই সময়টাকে আপনি মোটামুটি শুরু থেকেই দেখেছেন। এখন আর আলাদা সম্পাদকের প্রয়োজন হয় না। নিজের লেখার সম্পাদক নিজেই। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেমন হতে পারে? কিংবা এখনই কি সেই প্রভাব পড়তে শুরু করছে না?

হুঁ, এটা অনেকটাই এমন কন্সেপ্টের—প্রতিটি ব্যক্তিই একটি প্রতিষ্ঠান। এটা শুধু সাহিত্যে না, সর্বত্র। তাতে যেটা ঘটে, কোনো নির্দিষ্ট ফোকাস নাই। আপনি খেয়াল করে দেখবেন, প্রযুক্তি ও সভ্যতা আগাচ্ছে প্রচুর,  কিন্তু আপনি নতুন করে কোনো বিজ্ঞানীর নাম জানতে পারছেন না। বিষয়টা অনেকটাই তেমন। এর ভালো-মন্দ—দিক আছে দুটোই। তবে খুব বেশি বিখ্যাত হওয়া, আর কারও কপালে হয়তো নাই। হওয়ার দরকারও তো নাই। কারণ একদিন আমি আপনি কেউই এই জগতে নাই!

 পর পর ৩ বছরে ৩টি বই আপনার। বেশি মনে হচ্ছে না?

প্রথম বছরের ওটা পূর্ণাঙ্গ বই না। ২৫ টা কবিতা ছিল। কিছু ঝামেলাও ছিল প্রিন্টিংয়ে। পরে উঠিয়ে নেওয়া হয় প্রকাশনী থেকেই।

 ৩ বছরে ৩টা বই কি বেশি মনে হচ্ছে না?

আসলে মানুষকে তার বর্তমান, বা নিকট বর্তমান সময় দিয়ে বিবেচনা করাটা সোজা, তার সমগ্র জীবন ঘড়ির হিসাবে না। যেমন, এই প্রশ্নটাই যদি আরও চার পাঁচ বছর আগে আমাকে করা হতো, তখন প্রশ্নটা এমন হতো : গত তেইশ চব্বিশ বছরে আপনি তো কিছুই লিখেন নাই। লেখা কম হয়ে গেলো না?

বোধহয় এখন আমার লেখার সময়। আমি একটা সময়ে লিখবো না। অনেকদিন আমি না লেখা অবস্থায় থাকবো। দেখা যাবে, আমার বয়স অনেক বেড়ে যাবে, লেখা আর বাড়বে না। ঠিক সেইদিন এই প্রশ্নও অর্থহীন হবে। আসলে লেখকরা সময়, বছর, বয়স হিসাব করে লেখে না। যখন লেখার, তখন লেখে। খুব অল্প সময়ের জন্য লিখেছে, এমন অনেক লেখক আছেন। আবার উল্টোটাও আছে।

 বোঝাই যাচ্ছে, প্রচুর লেখেন। রাইটার্স ব্লকে পড়েছেন কখনো? অভিজ্ঞতা কী?

রাইটার্স ব্লক কাকে বলে, আমার ঠিক জানা নাই। অনেক অনেক সময় দেখা যায় লিখছি। অনেক অনেক সময় দেখা যায় লিখছি না। মনের সাথে জোর জবরদস্তি করি না। তাই রাইটার্স ব্লক নামক ক্রাইসিসে পড়া লাগে নাই। কিংবা বুঝিই নাই হয়তো।

 এরপর কী বই আসছে...কবে?

এরপর একটা পাণ্ডুলিপির উপর কাজ করছি। তবে কবে আসে, জানি না। যখন মনে হবে, পাণ্ডুলিপিটা প্রকাশ করার মতন, তখন করব।

 ছন্দের গুরুত্বটা কেমন বলে মনে করেন এই সময়ে, কবিতায়?

ছন্দ কবিতার একটা টুলস। এইটুকুই। আমাদের জানা ছন্দের বাইরেও কবিতার জগতে প্রচুর অজ্ঞাত ছন্দ আছে। অছন্দের মধ্যে যে লুকানো আর ছন্দের চেয়েও সুন্দর ছন্দ নাই, তা কি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে?

 

ধন্যবাদ, কুশল।

ভালো থাকবেন।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা