Ali

 

কথাসাহিত্যের সুলুক সন্ধানী ব্যক্তিত্ব শওকত আলী আর নেই। আজ সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার লেখায় বিচিত্র চিন্তার উল্লেখ থাকে। পাঠক তার লেখায় মুগ্ধ থেকেছেন দীর্ঘকাল। সমালোচকদের দৃষ্টিতে ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ বাংলা সাহিত্যের এক অসামান্য সংযোজন। এই গুণী কথাসাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শ্যামল চন্দ্র নাথ।

শ্যামল চন্দ্র নাথ : 

আপনার লেখা উপন্যাস ‘ওয়ারিশ’ সম্পর্কে জানতে চাই। যেখানে আত্ম-আবিষ্কারের কাহিনি গভীরভাবে নির্মিত হয়েছে।

শওকত আলী : ওই অর্থে আমি তখন লেখালেখির দিকে ঝুঁকেছি। পাকিস্তানে চলে আসার পরে, ময়মনসিংহ কলেজে পড়ার সময় যে পরিবেশটার মধ্যে আমি বড় হলাম, আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এই বাংলা অঞ্চলে মুসলমানের সংখ্যাটা বেশি- মোগল পাঠান যারা এসেছেন হয়তো উত্তর পশ্চিম সীমান্ত ধরে। তারপর একটা একটা করে জায়গা দখল করতে করতে তারা সিন্ধু দেশ শাসনে বসে পড়লো। বাংলায় এসেছে বখতিয়ার খলজি। তিনি আসেন ১২০৪ খিষ্ট্রাব্দে। এরপর দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসন। মুসলমানদের নিয়ে তারা চেয়েছিল আলাদা ভূখণ্ড। তো সে হিসেবে আন্দোলনও হয়েছিল। মুসলমানরা সবাই সেই আন্দোলনে ছিল। একটা পর্যায়ে দেখা গেল মুসলমান নেতৃবৃন্দের মধ্যে তারা কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসলেন। তারপরে, তাদের মনে সন্দেহ জাগলো যে কংগ্রেসের নেতৃত্বের মধ্যে উপরের দিকে তো সবাই হিন্দু। মুসলমান আছে তো নিচের দিকে। তো এটা যদি হিন্দুদের শাসনে চলে যায় তো মুসলমানদের কী লাভ হবে, আমরা কী পাবো? তাই তাদের মনে প্রশ্ন জাগলো। আমার মনে হয়, ব্রিটিশ শাসকরাই তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য এই বুর্জুয়া চিন্তাভাবনা সৃষ্টি করলো। হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। এটা তখনকার যুগে অনেকে করতো এবং এখনো অনেকেই ভাবে। যাই হোক, মুসলিমদের মনের মধ্যে এই ধরনের ভাব জাগলো। তারপর থেকে তারা নিজেদের মধ্যে পার্টি গঠন করলো। তো তারা বিভাজনে গেল। তারা একটা পর্যায়ে এসে মোহাস্মদ আলী জিন্নাহকে নেতা বানালো। তারপরে পাকিস্তান কিভাবে ভাগ হবে, এর সীমারেখা কিভাবে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি ভাগ হলো। ফলে ওই আন্দোলন খুব প্রবল হয়ে উঠেছে যখন মহাত্মা গান্ধী বললেন ‘ভারতের মুসলমানরা মুসলিম লীগের এই দাবি সমর্থন করে না।’ ফলে মুসলমানদের মতামত নেওয়ার জন্য তখন একটা নির্বাচনের মত হয়েছিল। এর নাম ছিল রেফারেনডাম। রেফারেনডামে দেখা গেল ভারতের মুসলমানদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ মুসলমান পাকিস্তানের দাবি সমর্থন করেছে। বাকিরা করেনি। এর ফলে মহাত্মা গান্ধী নতুন কথা তুললেন- এটা যদি হয় তাহলে ভারতের প্রদেশগুলোকে ভাগ করতে হবে। সিদ্ধান্ত হয় যেসব প্রদেশে হিন্দুর সংখ্যা বেশি তারা ভারতের সঙ্গে থাকবে। আর বাকিরা পাকিস্তানের সঙ্গে যাবে। তখন ওই রেফারেনডাম চালু ছিল। ওই যে রেফারেনডামটি হলো, তারপরে অন্যান্য পার্টি সেটা অবজার্ভ করেছিল করেছিল। তখন পাঞ্জাবে একটি বৈঠক বসলো। তখন তারা বিভিন্ন অংশ ভাগ করে নিল। বেঙ্গলের পশ্চিম অংশটি পড়লো ভারতের সাথে। বাঙালির এত বড় গণ-অধ্যুষিত অঞ্চল কিন্তু সেখানে একটা প্রদেশ তারা দিলো না। কিন্তু তারপরে একটা ঘটনা জানা গেল। সেটা হচ্ছে এই, তখন তারা চায় না আমরা আলাদা একটি প্রদেশের মালিকানা পাই। স্বভাবত মুসলমানরা। তখন প্রায় ৬০ ভাগ মুসলমান রায় দিল। তবে বাঙলার মুসলমানরা শতকরা ৭০ ভাগের বেশি পাকিস্থানের পক্ষে সমর্থন দিল। কিন্তু ভারতের অন্যান্য অঞ্চল মুসলমানরা সমর্থন দিয়েছিল ১৫ কি ১২ ভাগ। তবে বেলুচিস্থানে ২০ ভাগের বেশি আর পাঞ্জাবে আরো বেশি পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন জানালো। কিন্তু পাঞ্জাবেও পঞ্চাশ ভাগ হবে না। ৪৫ ভাগ। ফলে দেখা গেল পাকিস্তানেও ৫০ ভাগেরও কম লোক পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন জানালো না। যেটা করেছে, সেটা করলো বাঙালি মুসলমানরা। আসলে পাকিস্তানটা হয়েছে বাঙালি মুসলমানদের জন্য। সেই জিনিশগুলো উঠে এসেছে উপন্যাসে। সেগুলো একেবারে আমার কিশোর বয়সের থেকেই দেখেছি। এর কারণ হচ্ছে আমার বাবা কংগ্রেসের সমর্থক ছিলেন। যদিও তখন মুসলিম লীগের দাবি ছিল জাতীয় চেতনার। এ নিয়ে অবশ্য সংসারে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। মা বাবাকে বলতো কি পারো নাই? যাও এখন যাও তো? আমার মা তো ১৯৪৯ সালেই মারা গেলেন।
শ্যামল চন্দ্র নাথ : ১৯৫২ সালে আপনার জন্মভূমি ত্যাগ করে পূর্ববাংলায় চলে আসেন। এই পূর্ববাংলায় চলে আসার প্রভাব কি আপনার জীবনে কিংবা আপনার লেখালেখিতে পড়েছে?
শওকত আলী : এটা ১৯৫২ সালে না। আমি এসেছি ১৯৫১ সালে। রায়গঞ্জে কলেজ হয়নি। তখন কলেজ ছিলো দিনাজপুরে। কলেজটা হয়েছিল ১৮৪৬ সালে। তখন সমস্যা ছিল। ওখানে সাম্প্রদায়িকতার কারণে এখানে চলে এসেছি। আমার বড় ভাই ছিল কলেজে, দূর্গাপুরে। সেই আমাকে বললো যে, তুই এখান থেকে চলে যা। ও আর একটা কারণ ছিল- আমার ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে ছিল। আমি ওখানে যে কলেজে পড়তাম ওখানে আইএসসি ছিল না। আমার তো ভর্তি হতে অনেক দেরী হয়ে গেল। আমি আর আইএসসি ভর্তি হতে পারলাম না। এক বছর অপেক্ষা করে থাকতে হলো। তখন অল্প বয়স আমার, ষোল বছর বয়স। কলেজের শিক্ষকের সাথে দেখা করলাম। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিসে ভর্তি হবে? আমি বললাম আইএসসিতে। তিনি আমাকে বললেন, বাংলায় এত ভালো নম্বর পেয়েছো, আরবিতে এত ভালো নম্বর পেয়েছো তুমি আইএ পড়ো। আমি আবার আরবি ভালো বুঝতাম, পারসি এত ভালো বুঝতাম না। তখন আমি আইএতে ভর্তি হলাম। আইএতে ভর্তি হয়ে আমি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের সাথে কাজ করেছি। তখন পড়াশুনা তেমন ভালো হয়নি ওই অবস্থায়। রেজাল্টও তেমন ভাল হল না। দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেছি।
শ্যামল চন্দ্র নাথ : আপনার বাবার কথা জানতে চাই। আপনার বাবা ১৯৭১ সালে দুই দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন।
শওকত আলী : ওই বিষয়ে তো বলার তেমন কিছু নাই। আমার বাবা আমাদের ভাই-বোনকে পাঠিয়েছিলেন। আমি বাসা ভাড়া করে ভাই-বোনদেরকে নিয়ে থাকতাম। বাবা বলতেন তোমার ওখানে থাকার দরকার নেই। অবস্থা একটু শান্ত হলে আবার যেয়ো। অবস্থা কি শান্ত হয় না কি! মার্চ-এপ্রিলের দিক আমার ভাই-বোনরা আছে, আর ওই বছরই ডিসেম্বর মাসের দিকে সম্ভবত বাবা মারা গেলেন। বাবা সব সময় কংগ্রেসের সমর্থক ছিলেন। কখনও মুসলিম লীগকে সমর্থন করেন নাই। ওই সময় ৯২-এর ‘ক’ ধারা নামে একটি ধারা চালু হলো। তখন আমি বলেছি, আমি কোথাও চলে যাবো। হয়তো ঢাকা নয়তো অন্য কোথাও। আমার বাবা এই ব্যাপারটা জানলেন পরে। আমাকে জেলে যেতে হল। জেলে মাত্র নয় মাসের মাথায় আমাকে পরীক্ষা দিতে হলো।
শ্যামল চন্দ্র নাথ : আপনি জেলখানায় বসেই পড়াশুনা করতেন?
শওকত আলী : হ্যাঁ। জেলখানায় বসেই পড়াশুনা করতাম। আমার সাথে যে শিক্ষকরা ছিলেন তারা আমাকে বই পড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমার জন্য যে সমস্ত বইপত্র তারা দিয়ে যেতেন তা আমার কাছে পৌঁছাতো না। মানে আমার ওয়ার্ডে পৌঁছাতো না। আমার পাশে ছিলেন তখন হাজী দানেশ। তিনি দাঁড়িও রাখতেন। তিনি ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। নামকরা উকিলও ছিলেন। ওখানে বসে বসে তিনি গল্প লিখতে পারতেন। সব ঘটনার খুঁটিনাটি তিনি বর্ণনা করতে পারতেন।

আমি থার্ড ইয়ার থেকে ফোর্থ ইয়ারে ওঠবো। হাজী দানেশ জেলারের সাথে দেখা করেছিলেন। জেলারও খুব ভাল লোক, উনি পশ্চিম বাংলার লোক। এরপরে দু’জন প্রফেসর এলেন। আমার সাথে দেখা করতে। আমি জেলে বসে পরীক্ষা দিলাম। এবং আমি থার্ড ইয়ার থেকে ফোর্থ ইয়ারে উঠে গেলাম আরকি! তারপরে ফাইনাল ইয়ারের শেষ পরীক্ষা যখন হবে তার আগেই মানে আমাকে ডিসেম্বর মাসেই রিলিজ দিয়ে দিল। ডিসেম্বর মাসের চার পাঁচ তারিখে বোধহয় রিলিজ দিয়েছিল। আর আমার ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল হবে মার্চ মাসের দিকে। তো বাবাই বললেন যে, ফাইনাল পরীক্ষাটা দিয়ে দেখ কি হয়? পরেরদিন আমি কলেজে গেলাম, দেখা করলাম নতুন প্রিন্সিপালের সাথে। সব কিছু খুলে বললাম। উনি দেখে-টেখে বললেন, যাও, পরীক্ষা দিতে পারবে।

শ্যামল চন্দ্র নাথ : অনেক পেছনে ফিরে যাচ্ছি- আপনাকে ছোটবেলায় পাঠশালায় ভর্তি করানো হয়েছিল। কিন্তু পাঠশালায় যেতে আপনার নাকি ভালো লাগতো না?
শওকত আলী : আমাকে যে পাঠশালায় ভর্তি করানো হয়েছিল সেটা অনেক দূরে। রায়গঞ্জের বাড়িতে। ওটা আমার পূর্ব পুরুষের ভিটাবাড়ি আরকি। ওখান থেকে পাঠশালায় যেতে ভয় লাগতো। ওখানে একটা বড় বটগাছ ছিল। ভূতের ভয় কাজ করতো। সেজন্য সেখানে আর গেলাম না। তখন মা আবার কী করলেন- ট্রেক্সটাইল ইন্সটিটিউটে ছাত্রী নেওয়া হবে। তখন ইন্ডিয়াতে দুইটা ট্রেক্সটাইল ইন্সটিটিউট ছিল। শ্রীরামপুর ট্রেক্সাটাইল ইন্সটিটিউট এবং এলহাবাদ ট্রেক্সটাইল ইন্সটিটিউট। তখন শ্রীরামপুরে ছাত্রী নেওয়া হবে এই মর্মে বিজ্ঞতি দেওয়া হয়েছিল। আমার মা দরখাস্ত করেছিলেন। তখন বাবারও খুব উৎসাহ ছিল। মা ভর্তি হয়ে গেল। মা ছয় মাস পর পূজার ছুটিতে এলেন এবং আমাদের ভাই-বোনদের তিনি নিয়ে গেলেন।
শ্যামল চন্দ্র নাথ : এরপর ১৯৪১ সালে আপনার মা ডিপ্লোমা পাশ করেন। ওই সময়ের বিশ্বযুদ্ধের কথা জানতে চাই।
শওকত আলী : বিশ্বযুদ্ধের সময় আমি ছোট ছিলাম। দিনের বেলায়ও ভয় লাগতো। রাতের বেলায় তো বাতিও জ্বলতো না। ভয়ে রাতের বেলায় লাইট বন্ধ থাকতো। ওরা লাইট দেখে বুঝতে পারতো লোকজন আছে কিনা, এখানে শহর আছে কিনা? দিনের বেলায়তো ট্রেন আসতো না। যেখানে যুদ্ধ হচ্ছে সেখানে তো অবস্থা খুব খারাপ। আর সন্ধ্যার পরেই আমাদের ঘরের সব দরজা, জানালা বন্ধ করে রাখা হতো। কেউ কেউ হয়তো ঘরে মোমবাতি কিংবা চেরাগ জ্বালাতো। 
শ্যামল চন্দ্র নাথ : ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে বা ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে একজন লেখকের প্রধান ঝুঁকি কোনটি?
শওকত আলী : ওই আমি যখন স্কুল কলেজে পড়ছি তখন আমার ইতিহাসের প্রতি, সাহিত্যর প্রতি একটা কৌতূহল ছিল আরকি। কৌতূহলটা থাকার কারণটা ছিল এই যে, আমাদের পারিবারিক একটা ব্যাপার আছে। আমাদের পরিবারটি সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিল। যেমন, তখনকার দিনে আমাদের পারিবারিক কবরস্থান বাঁধানো ছিল। এটা ১৯৪০ সালের আগের ঘটনা। আমার ধারণা হল, মানুষ মরে গেলে এই রকম কবরে চলে যায়। আমার ভিতর প্রশ্ন জাগলো আর কবর নাই কেন?
পরবর্তীকালে আমি বুঝেছি যে, সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকদেরই কবর পাকা করে দেওয়া হয়। আরেকটি ব্যাপার ছিল এই যে, আমাদের জমি-জমা আধিয়া হয়ে চাষবাস করতো। আধিয়া মানে ফসলের যা হবে তার অর্ধেক সে নেবে আর বাকি অর্ধেক আমাদের দেবে। আমাদের বাড়ির ওঠানে দুইটি ধান মাড়াইয়ের ব্যবস্থা ছিল। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধান মাড়াই করা হতো, এরপর বস্তা ভরা হচ্ছে। এসব তো আর সবার বাড়িতে থাকে না। আমাদের দুটো গোলা ছিল। গোলায় ছাউনির মতো ছিল। ওই গোলার মধ্যে রাখা হলো ধান। আর ওইখান থেকে গুদামিরা ধান এসে নিয়ে যেতেন। আমার দাদি সেই ধান দেওয়ার কাজটি করতেন। উনি লেখাপড়া জানতেন না। তবে তিনি হিসেব-টিসেব বুঝতেন। যেটা দিয়ে ধান মাপা হতো ওটা ছিল টুকরির মতো ওটাকে বলা হতো কাঠা। যেটা বলছিলাম আরকি ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে আমাদের পারিবারিক যে পরিমণ্ডলটা ছিল- সেটা নিয়ে আমার ভিতর বাল্যকাল থেকেই কৌতূহল ছিল। আমাদের পূর্বপুরুষরা কোথায়? আমাদের কি ছিল, কি না ছিল? অতীতের দিকে একটা ঝোঁক গড়ে উঠছিল। আর ইতিহাস জানতে খুব ভালো লাগতো, বই পড়তে খুব ভালো লাগতো। তো ধরো, স্কুলে পড়ার সময় শরৎচন্দ্র পড়তে খুব ভালো লাগতো। বঙ্কিমচন্দ্র পড়া স্কুলে থাকতেই শুরু করেছি। তো রায়গঞ্জে উনিশ শতকের কিছু খবরাখবর জানতে পারতাম। এবং ওখানে একটি ছোট লাইব্রেরি ছিল। ওই লাইব্রেরিতে কিছু বই ছিল। ওখানে গল্প, উপন্যাসের টুকটাক বই নিয়ে আলোচনা হতো। তারপরে কৌতূহল জেগেছে মুসলমানদের মাদ্রাসায় পড়তে হয় কেন? হাই স্কুলেই যদি যাই আমি তাহলে মুসলমান ছেলেদের কি অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়?
মুসলমান ছাত্র সংখ্যা এত কম কেন? আমি যখন স্কুলে ক্লাস থ্রি-ফোরে পড়ি তখন ছয় সাতজন মুসলমান ছাত্র ছিল। পঞ্চাশজন ছাত্রের মধ্যে। আমি যখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছি তখন মাত্র তিনজন মুসলিম ছাত্র ছিল। ১৮ জন পরীক্ষা দিয়েছে মুসলমান ছাত্র ছিল মাত্র তিনজন। তখন তো পার্টিশনের পরে। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন আমার বড় ভাই। তো উনি, ওদের সঙ্গে মনে হয় ওইরকম চারজন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিল। তখনকার সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিল এই যে, গান-বাজনার চর্চা ছিল, গানের স্কুল ছিল। বাবার ঘনিষ্ঠ বুন্ধরা ছিল হিন্দু। এইসব বিষয় নিয়ে আমার কৌতূহল জাগতো। ইতিহাস কী জন্য পড়া দরকার! তারপরে যে কথাটা বললাম, এই অঞ্চলে মুসলমান আছে, মসজিদ আছে। এই যে ঘাটাঘাটি করছি, এই অঞ্চলে মুসলমানরা ছিল প্রভাবশালী। এই অর্থে তারা ভারতে প্রবেশ করছে এবং লক্ষণ সেনদের বিতাড়িত করেছে। ওই ঘটনাটা আমার মনে খুব খোঁচা দিত আরকি। আসলে ব্যাপারটা কি? এইসব বিষয় জিজ্ঞেস করতাম। লাইব্রেরিতে পড়তাম। হঠাৎ একটি বই আমার চোখে পড়ে গেছে। সংস্কৃত বই। তখন তো মুটামুটি পড়তে পারি। বুঝতেও পারি আরকি। আমি ইংরেজি হরফে লেখা, হিন্দি হরফে লেখা পড়তে পারি তখন। সুতরাং ওই সময়ে বই পড়তে অসুবিধা হয়নি। ওই ‘শেখ শুভদয়া’ বইটি পড়েছি। ওই বইটা নিয়ে খুব বিতর্ক ছিল তখন। উনি আবার লক্ষণ সেনের মন্ত্রীও ছিলেন। উনি কবিও। তো ওই বইটা নিয়ে বিতর্ক ছিল এই যে, এটা ওই লেখকের বই নয়, এটা অন্য কারো হবে। ওই বইতে যা লেখা আছে ঐতিহাসিকরাও তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখেননি। কিন্তু ‘শেখ শুভদয়া’র বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘শেখের শুভ উদয়’। মুসলমানদের শেখ বলা হতো। বইটা পড়ে আমার মনে হয়েছিল এবং এই পর্বটা নিয়ে আমার কৌতূহল ছিল। এটা নিয়ে আমি কল্পনাও করেছি। এর ফলে ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ বইটি আমি লিখেছি। যদিও লেখাটি আমি অনেক আগেই লেখেছি। এবং অনেক পরে প্রকাশিত হয়েছে। এরও আগে আমার ‘ওয়ারিশ’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল। তো ‘ওয়ারিশ’-এ আমাদের পারিবারিক বিষয়, অস্তিত্ব অনুসন্ধান, তার অতীতে কি ছিল, কে না ছিল, তাদের মধ্যে কি ঘটনা ঘটেছিল। এবং আমাদের পরিবার যে জমিদার ছিল, ফলে আমাদের জমিগুলো কীভাবে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিলো? এইসবের বর্ণনা আছে আরকি।
শ্যামল চন্দ্র নাথ : আপনি ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসের কথা বলেছেন। সেখানে ‘সেনরাজের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে যাচ্ছে দেশ, তুর্কি আক্রমণ অত্যাসন্ন, তবু সামন্ত মহাসামন্তদের অত্যাচারের শেষ নেই’ এইসব বিষয় নিয়ে আপনার লেখা উপন্যাস। এই উপন্যাসকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
শওকত আলী : ওই যে বললাম, তো এই সম্পর্কে কৌতূহল ছিল। শেখ শুভদয়া বইটা পড়তেছিলাম এবং প্রদোষে প্রাকৃতজনের মধ্যে তো উল্লেখ আছে যে একটা মেলা হচ্ছে। মেলাটা হচ্ছে অশ্বের। আমাদের মনে কৌতূহল জাগে না এরাবিয়ান হর্স, ঘোড়া হচ্ছে আরব দেশে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। অর্থাৎ যে সমস্ত দেশে যারা রাজা মহারাজা ছিল মানে এইরকম। তাদের একটা অশ্বরোহী বাহিনি রাখতে হতো। এবং তাদের কাছে এরাবিয়ান হর্স খুব প্রয়োজনীয়। তো এরাবিয়ান হর্স আরবের। জবন বণিকরা, তখন তো জাহাজ ছিল না কাঠের জাহাজ ছিল। তো সেই নৌকায় করে ঘোড়া নিয়ে আসতো আট দশটা। ঘোড়া বিক্রি করতো, বিক্রি করে আবার চলে যেতো। তারপরে ওই যে চরিত্রগুলো, চরিত্রগুলো কাল্পনিক। তবে সেখানে একটি প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটি হচ্ছে, নিম্ন শ্রেণির মানুষেরা যাদের অধিকারের সুযোগ ছিল না। তাদেরকে ব্যবহার করা হতো। এবং তাদের দাসের মতো অবস্থা ছিল। এবং সেইজন্য নিম্ন শ্রেণির মানুষদের কী অবস্থা ছিল? তাদের কাছে যখন যবন বণিকরা এলো ঘোড়া বিক্রি করতে। আর যবন সাধুরা আসতে শুরু করলো। জায়গায় জায়গায় তাদের ক্য

উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা