VC

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম ইমামুল হক। শুধু বাংলাদেশ নয়, উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত মৃত্তিকাবিজ্ঞানী তিনি। মাটি থেকে পানির মাধ্যমে খাদ্যচক্রে আর্সেনিকের সংক্রমণ এবং প্রকোপ নিয়ে তাঁর গবেষণা দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস গোল্ড মেডেল, বাংলাদেশ ইউজিসি অ্যাওয়ার্ড ২০০৭, বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক ২০০৮, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা পদক ২০০৯, সয়েল সায়েন্টিস্ট অব দ্য ইয়ার ২০১০-সহ বেশ কিছু পুরস্কার। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস রোধে নিয়েছেন নানা কার্যকরী পদক্ষেপ। বিশেষ সাক্ষাৎকারে নানা বিষয়ে কথা বলেছেন অধ্যাপক ড. এস এম ইমামুল হক

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কত?
বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁরা পড়াশোনার পাশাপাশি নানা সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমেও সমান সক্রিয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু কাজ করেছেন-
১ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে চালু করেছি বঙ্গবন্ধু হল, শেরেবাংলা হল ও শেখ হাসিনা হল। নির্মাণ করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। সম্প্রতি চালু করেছি কীর্তনখোলা হল ও শিশুদিবাযত্ন কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছি, এর মধ্য দিয়ে কোচিং নির্ভরতা কমবে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন ফাঁস একটি আলোচিত ইস্যু-
দ্বিতীয় শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা-সব পর্যায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। সত্যিকারের পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি একটি জাতির জন্য অশনিসংকেত। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চায় স্বাধীনতাবিরোধী একটি চক্র। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, কতিপয় শিক্ষকও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে অপরাধ হলে কঠোর শাস্তি না দিলে সেটি বন্ধ হয়েছে। নাইজেরিয়াকে দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ বলেই আমরা জানি। সেখানেও কিন্তু পরীক্ষায় নকল করলে জেলখানায় পাঠানো হয়। আমাদেরও প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তি দিতে হবে। দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ঠেকাতে পারে প্রশ্ন ফাঁস।

ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসরোধে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন-
ভর্তি পরীক্ষা থেকে বিভাগ পরিবর্তনকারী ‘ঘ’ ইউনিট বাদ দিয়েছি। প্রশ্ন ফাঁস সবচেয়ে বেশি হয় ‘ঘ’ ইউনিটে। বিভাগ পরিবর্তনকারী বা ‘ঘ’ ইউনিটে আলাদা পরীক্ষা না নিয়েও বিভাগ পরিবর্তনের সুযোগ রাখা যায়, এর দৃষ্টান্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় । পরীক্ষা শুরুর এক মিনিট আগে আমরা প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুলি। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, অনেক আগে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুললে অনেকেই দেখে, মোবাইলে ছবি তোলে। এতে প্রশ্ন ফাঁসের আশঙ্কা রয়ে যায়। পরীক্ষার হলে অনেকে ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে আসে। এই ডিভাইসের মাধ্যমে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিতে জালিয়াতির মতো ঘটনা ঘটছে। এটা ঠেকাতে আমি এবারের ভর্তি পরীক্ষায় ‘ইলেকট্রনিক জ্যামার’ চালু করেছি। ইলেকট্রনিক জ্যামার পরীক্ষার কেন্দ্র ও আশপাশে মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়। আমার দেখানো পথে হেঁটেছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, তারাও চালু করেছে এ পদ্ধতি। ভর্তি পরীক্ষা শেষে আমি প্রশ্নপত্র পুড়িয়ে দিয়েছি। আমার নিজের কাছেও প্রশ্নের কোনো কপি নেই। এতে পরীক্ষার পর কেউ বলতে পারবে না, কী কী প্রশ্ন এসেছিলো। এতে প্রশ্ন নিয়ে কোচিং সেন্টার বা অন্য কেউ বাণিজ্য করার সুযোগ পাবে না।

আপনার পড়াশোনা ও কর্মজীবন সম্পর্কে জানতে চাই—
১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর ১৯৭৩ সালে (ফলাফল প্রকাশ হয় ঐ বছর) একই বিভাগে যোগ দিই প্রভাষক হিসেবে। ১৯৮০ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অবস্থিত এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এআইটি) থেকে অ্যাগ্রিকালচারাল সয়েল অ্যান্ড ওয়াটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমএসসি, ফ্রান্সের ন্যান্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করি পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ।

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন—
বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য, মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান, শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট, জীববিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন, বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও গভর্নিং বডির সদস্য, রেডিও টুডে মিডিয়া একাডেমির অনারারি ডিনসহ অনেক দায়িত্ব পালন করেছি। বাংলাদেশ সরকারের কৃষি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক ও উপদেষ্টা পদে ছিলাম। বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলাদেশ মৃত্তিকাবিজ্ঞান সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের আজীবন সদস্যসহ একাধিক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট, সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সঙ্গেও যুক্ত আছি।

শিক্ষকতা পেশায় আপনার পেরিয়ে গেছে ৪২ বছরেরও বেশি সময়। এখনো যুক্ত আছেন এ পেশায়-
আমি এখনো খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ফ্রেঞ্চ পড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে। আমার শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি গবেষণাগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘অ্যান ওড টু প্রফেসর এস এম ইমামুল হক : ফরটিটু ইয়ার্স অব ডেডিকেশন টু টিচিং অ্যান্ড রিসার্চ (১৯৭৩-২০১৬)’ সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের আমার বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীবৃন্দ।

শিক্ষকদের অন্যতম প্রধান কাজ গবেষণা। আপনার গবেষণা সম্পর্কে জানতে চাই—
আমার ৩০০টিরও বেশি গবেষণামূলক প্রকাশনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেসের বিভাগীয় জার্নালের প্রধান সম্পাদক, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি জার্নাল (বিজ্ঞান) ও বাংলাদেশ জার্নাল অব সয়েল সায়েন্সের যুগ্ম সম্পাদক, জার্নাল অব সয়েল সায়েন্স সোসাইটি অব বাংলাদেশের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্যসহ অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নালের পর্যালোচক ছিলাম। আমি বাংলাদেশ মৃত্তিকাবিজ্ঞান সমিতির বর্তমান সভাপতি এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতির সাবেক সভাপতি। বিভিন্ন সময়ে দেশে-বিদেশে অসংখ্য সভা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করেছি।

আপনাদের সময়কালে ‘ক্লাব-কালচার’ ছিল, এখন চারপাশে ‘গ্যাং কালচার’ গড়ে ওঠছে। বিপথ থেকে ফেরার উপায় কি বলে আপনি মনে করেন?
তরুণরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে এই ক্লাব কালচার ফিরিয়ে আনতে পারে। প্রয়োজনে আলোচনা, ছবি প্রদর্শন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-প্রতিযোগিতা ইত্যাদির আয়োজন করতে পারে।

ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে?
ভালো কাজ করতে হলে নৈতিকতার বিকাশ ঘটাতে হয়। যে সব তরুণের মধ্যে এই নৈতিকতা বোধ কাজ করে তার নিজের অজান্তেই ভালো কাজ করবে। সমাজসেবা, আর্তজনের সহায়তা, বঞ্চিতদের শিক্ষাদান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে তারা তাদের শুরু করতে পারে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?
যে বিষয়ে পড়াশোনা করছ সে বিষয়টিতে দক্ষ হতে হবে। মনে রাখতে হবে তোমাদের শিক্ষাব্যয়ের সিংহভাগ জোগান দিচ্ছে দেশের জনগণ। তোমাদের শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য ও মূল লক্ষ্য থাকতে হবে জনগণ ও দেশমাতৃকার কল্যাণ। তবেই তোমাদের শিক্ষাজীবন সার্থক হবে। দেশ, সমাজ ও জনগণের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার ব্রত নিয়ে জ্ঞান আহরণ করো আর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে এগিয়ে আসো। শুভ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা সর্বদাই কল্যাণকর এবং কাম্য। তোমরা কখনোই অন্যের অকল্যাণের কথা ভাববে না। কাউকে যদি উপকার নাও করতে পারো, অপকার করো না।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?
প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চাই। শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করাসহ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমার অনেক পরিকল্পনা আছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে 'ওয়ার্ল্ড ক্লাস' বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করাই আমার লক্ষ্য।

অধ্যাপক ড. এস এম ইমামুল হক
উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা