kabi

কবি মহাদেব সাহা। বাংলাদেশের মাটি, জল আর প্রকৃতিই একদিন যাকে কবি হতে উৎসাহিত করেছিল, সেই বাংলার আকাশ-বাতাস আর প্রকৃতি ছেড়ে আজ সাড়ে চার বছর ধরে বাধ্য হয়ে কানাডায় নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন দেশের অন্যতম প্রধান এই কবি। বয়সের ভারে ক্লান্ত কবি ছেলে তীর্থ সাহার সঙ্গে যাপন করছেন এক যন্ত্রণা দগ্ধ জীবন। সঙ্গে আছেন কবিপত্নীও। রক্ত, মাংস, শিরা-উপশিরা, হৃদয় এবং হৃৎপিণ্ড থেকে উৎসারিত নানা সৌরভে ভরপুর মহাদেব সাহার সব কবিতা। মহাদেব সাহা ফুল, বৃক্ষ আকাশ, মেঘ, নদী, ঢেউ, ভালোবাসা, দুঃখ-কষ্ট আর যাতনাকে সাবলীল ভাষায় পরম দরদ দিয়ে চমৎকার সব চিত্রকল্প ব্যবহার করে বিনির্মাণ করেছেন একেকটি কবিতা। মাটি ও মানুষের কবি, প্রেম ও প্রকৃতির কবি মহাদেব সাহার ৭৫তম জন্মদিন আগামী ৫ আগস্ট। জন্মদিন উপলক্ষে টেলিফোনে প্রবীণ এই কবির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তরুণ লেখক- ইজাজ আহমেদ মিলন

এই বয়সে এসে কি গুন গুন করে গাইতে ইচ্ছে করে না ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না’ …।
আমার মধ্যে গান হচ্ছে নিঃশব্দ সুর, কিন্তু গাইতে পারি না, যদি রবীন্দ্রনাথের মতো গাইতে পারতাম তাহলে হয়তো কবিতাই লিখতাম না। সেই হতো আমার কাব্য, সেই হতো আমার গান। এতো আনন্দ যে গানের মধ্যে তা এখন উপলব্ধি করছি মিলন। আমি যদি রবীন্দ্রনাথের মতো গাইতে পারতাম, পাখির মতো সুর পেতাম, নদীর মতো কল্লোল ধ্বনী পেতাম। হ্যাঁ সত্যি দিনগুলো তো সোনার খাঁচায় রইল না, থাকেও না। আমিও বলেছি- মধুর মুহূর্তগুলো চলে যায়। সেই সুখের দিনগুলো গেছে, মুহূর্তগুলো গেছে, আমার শৈশোব, কল্লোলিত জীবন, মাতৃস্নেহ, মাতৃভূমির কোলে জড়িয়ে থাকা- তুলনা হয় না।

যাপিত জীবনের হিসেব কষে কি কখনো দেখেছেন পাওয়া না পাওয়ার ব্যবধানটা কত?
‘হিসেব মেলাতে মন মোর নহে রাজি’, হিসাব-নিকাশ নেই, আমি অংক কষে জীবন চালাই না, আমি ম্যাথডিক্যাল লোক নই, খুব এলোমেলো, বাইরে থেকে হয়তো বোঝা যায় না। ‘এ জীবনে যা পেয়েছি, যা দেখেছি তুলনা তার নেই,’ আর কী বলব?

জীবনের পুরোটা অংশই এই কবিতার পেছনে ব্যয় করেছেন। আপনার লেখার মধ্যে এই সমাজ পরিবর্তনের যে চিত্র বারবার ফুটে উঠেছে তার কি কোনো প্রতিফলন পেয়েছেন?

অবশ্যই পেয়েছি। আমি স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ, আমার বুক জুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বর, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, আমার জীবনকে পূর্ণ করে দিয়েছে, আর কী চাই, সুখ-দুঃখ, পাওয় না পাওয়ার কথা বল না। এই ক্ষুদ্র জীবনে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভালোবাসা পেয়েছি। আমাকে ভালোবাসার কোনো কারণ নেই। তবুও তোরা ভালোবাসিস। আমরা একই মাটির সন্তান। তোরা আমার দেশ সহোদর, গ্রাম সহোদর। আমার সমস্ত দোষ ক্ষমা করে দিয়ে যদি কেউ একবার কাছে আসে আমি ধন্য হয়ে যাই।

আপনি একজন সংগ্রামী মানুষ। জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন, কখনো জিতেছেন কখনো হেরেছেন। জীবনের এই শেষ বেলায় এসে কি মনে হয় আপনি চূড়ান্ত একজন সফল মানুষ?

হারব কেন, হারব কেন? ‘মানুষ হচ্ছে অমৃতস্যপুত্রা’, যুদ্ধই জীবন, মানুষের এই বেঁচে থাকাই তো আজীবন যুদ্ধ। হার জিতের কথা ছেড়ে দাও, মানুষ শেষ পর্যন্ত জয়ী হবেই।

পৃথিবীর সব লেখকেরই সমালোচনা হয়। আপনারও হয় বা হয়েছে। কিন্তু সমালোচকরা আসলে আপনাকে কি এমন কিছু শেখাতে পেরেছে যা আজও আপনার মনে আছে?

না না, আমি সমালোচকদের দিকে তাকাই না। পাঠকেরাই আমার সব। ক’জন কবির কবিতা পাঠক এভাবে আপন করে নিয়েছে? আমি ধন্য। সমালোচকদের নিয়ে আমার কিছু বলার নেই, আমি সবার কাছে থেকেই শিখি, কিন্তু উত্তরটা জীবনান্দ দিয়েছেন ‘সমারূঢ় ’ কবিতায়।

‘ধূলোমাটির মানুষ’ শিরোনামে একটি কবিতায় আপনি বলেছেন ‘জুঁই ফুলের চেয়ে সাদা ভাতই অধিক সুন্দর’ কি বোঝাতে চেয়েছেন এই কবিতায়?

বল কী বোঝাতে চাইনি? সব বোঝাতে চেয়েছি। অন্ন বা ভাতের ওপর কিছু নেই। ওই যে সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। সবার উপরে অন্ন সত্য তাহার উপরে নাই, ‘মানুষই মহৎ শিল্প’।

এখকার লেখাগুলো পড়ে মনে হয় আপনি যেন কার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে চাচ্ছেন। কার কাছে যেনে যেতে চাচ্ছেন কিন্তু যেতে পারছেন না। অনেকটা সন্ন্যাসী ভাব।

দেখ, সে তো আমার প্রথম কাব্য গ্রন্থের নামের মধ্যেই আছে। সন্ন্যাস আমার আজীবনেরই বড় প্রার্থিত, কিন্তু তা তো আর হয়নি, জড়িয়ে গেছি লোভে, কত বন্ধনে!

এই সমাজের অন্য দশজন কবির চেয়ে আপনার চরিত্র একটু ভিন্নতর বলে মনে হয়। আপনি বলেছেনও সে কথা- আপনি অস্বাভাবিক একজন মানুষ। আরো একটু ব্যাখ্যা করে বলুন।

দেখ- কবি মাত্রই একটু অস্বাভাবিক। আমি প্রকৃত কবির কথা বলছি, তাকে প্রায় সর্বদাই ট্রান্সের মধ্যে থাকতে হয়। এক ধরনের তন্ময়তা, বিভোরতা, ধ্যান; ধ্যানের মধ্যেই কবিতা পাওয়া যায়। এই মানুষ কতটা স্বাভাবিক হতে পারে বল! আমি সব সময় আমার মতো, স্বাভাবিক কী অস্বাভাবিক জানি না।

‘আপনার ব্লাড গ্রুপের সঙ্গে কারো রক্ত মেলে না’। জীবন গঠনে কারো প্রভাব কি পড়েছিল আপনার ওপর?

হ্যাঁ, আমার মায়ের প্রভাব পড়েছিল। আমার মার কাছ থেকে আমি কত কিছু পেয়েছি, তারপরে দর্শন, কাব্য, ইতিহাস, কত কিছু থেকেই তো মানুষের জীবন ধারা গড়ে ওঠে।

সাড়ে চার বছর ধরে কানাডার কেলগেরিতে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। আপনার এই প্রিয় জন্মভূমিতে ফিরে আসতে মন চায় না? কবে আসবেন?

অনেক বারই বলেছি সে কথা, আমি স্বেচ্ছায় নির্বাসনে আসিনি। বাধ্য হয়ে এসেছি। এ কথা আর বেশি ব্যাখ্যা করব না। ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমি আর বলব না বেশি কিছু। আমি প্রতি মুহূর্তেই ফিরে আসতে চাই, এই কান্না কি শুনতে পাও না!

জন্মদিন নিয়ে কিছু বলুন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জন্মদিন আসে, নিজের জন্মদিন নিয়ে নিজের কী বলার আছে? শুধু বলতে পারি ‘সেই ধন্য নরকূলে- লোকে যারে নাহি ভুলে/ মনের মন্দিরে যারে সেবে সর্বজন।’ তারই জীবন স্বার্থক। কোথায় পাব সে জীবন, আমি নগণ্য তুচ্ছ মানুষ। শুধু বলি- তবুও আমাকে মনে রেখ, আমি যে গান গেয়েছিলাম। জন্মদিনে সবাইকে প্রণাম করে যাই। সবার মঙ্গল হোক, সবাই সুখী হোক, তোমার মঙ্গল হোক, মানবসমাজের মঙ্গল হোক।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / টি/কে

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা