balu-uttalan-netrokana

নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী দূর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীতে বালু মহালে প্রায় তিনশ ড্রেজার দিয়ে বালু ও নূয়রী পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় কিছু বালু ব্যবসায়ী বালু মহালগুলো ইজারা নিয়ে সরকারি নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে যথেচ্ছাভাবে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সোমেশ্বরী নদীর বালু মহালে বালু ও নূরী পাথর উত্তোলনের চলছে মহোৎসব। সরকার নির্ধারিত সীমানার বাইরেও তুলছে বালু ও পাথর। প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট ও জীব বৈচিত্র বিপন্ন হয়ে পড়ছে। ভেঙ্গে যাচ্ছে সড়ক, ঝুঁকিতে রয়েছে সেতু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির জন্য স্থাপিত কালচারাল একাডেমী। সরকার কোটি-কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
দুর্গাপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত সোমেশ্বরী নদীটি কালের বিবর্তনে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যতা বিপন্ন হওয়ার পথে। নদী থেকে নিয়ম বহির্ভূত বালু উত্তোলন করার কারণে পরিবেশ প্রতিবেশ ব্যবস্থা বিনষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নদীর জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীজ সম্পদ শত শত ড্রেজারের প্রপেলারের আঘাত এবং নির্গত পোড়া মবিল ও তেলের কারণে বিলুপ্ত প্রায়। বিপন্ন প্রজাতির মধ্যে সোমেশ্বরীর মহাশোল মাছ প্রাপ্তি এখন ভাগ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর পূর্ব পাড়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমী ভাঙ্গনের মুখে এবং সোমেশ্বরী নদীর ওপর সেতুটিও ঝুঁকিতে রয়েছে। সোমেশ্বরী পাহাড়ী ঝর্ণা থেকে প্রবাহমান হওয়ায় জলবায়ুর ক্রমাগত পরিবর্তন ও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতি ক্রমাগত হারিয়ে ফেলছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীতে সরকার ঘোষিত বালু মহাল রয়েছে পাঁচটি।। সেগুলো হচ্ছে- বিজয়পুর ও ভবানীপুর হতে দুর্গাপুর তেরী বাজার ঘাট ও শিবগঞ্জ বাজার ঘাট পর্যন্ত, দুর্গাপুর তেরী বাজার ঘাট ও শিবগঞ্জ বাজার ঘাট হতে চৈতাটী, দুর্গাপুর বিরিশিরি ঘাট হতে কেরনখলা, গাঁওকান্দিয়া মৌজার উত্তর সীমানা হতে দক্ষিন প্রান্ত পর্যন্ত বালু মহাল, ঝাঞ্জাইল হতে উত্তর শংকরপুর পর্যন্ত বালুমহাল। প্রতি বছর চৈত্র মাসে যার ইজারার জন্য বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এর আইন অনুসারে কার্য সম্পাদিত হয়ে থাকে। বাংলা ১৪২৬ সনে ইজারা দেয়া হয়েছে বিজয়পুর ও ভবানীপুর হতে দুর্গাপুর তেরী বাজার ঘাট ও শিবগঞ্জ বাজার ঘাট পর্যন্ত ৯৭৬ দশমিক ২২ একর বালু মহাল ৫ কোটি ৬ লাখ টাকা, দুর্গাপুর তেরী বাজার ঘাট ও শিবগঞ্জ বাজার ঘাট হতে চৈতাটী পর্যন্ত ২৮৭ দশমিক ৩৬ একর বালু মহাল ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা, দুর্গাপুর বিরিশিরি ঘাট হতে কেরনখলা পর্যন্ত ৩৪১ দশমিক ০৬ একর বালু মহাল ৯৫ লাখ টাকা, গাঁওকান্দিয়া মৌজার উত্তর সীমানা হতে দক্ষিন প্রান্ত পর্যন্ত ১৪২ দশমিক ৪৯ একর বালু মহাল ২ কোটি ১১ লাখ টাকা ও ঝাঞ্জাইল হতে উত্তর শংকরপুর পর্যন্ত ১৪০ দশমিক বালু মহাল ৭১ লাখ টাকা। আগামী ১৪২৫ সালের চৈত্র মাস থেকে নতুন বছরের কার্যক্রম শুরু হবে।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি বালু মহালে একটি ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের কথা। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের সামনেইএই নদীতে পাঁচটি বালু মহালে প্রায় তিনশ বাংলা ড্রেজার বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু ও নূরী পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে সরকার নির্ধারিত পাঁচটি বালুমহালে আইন ও বিধি সম্মত উপায়ে উত্তোলনের এবং বিধিবহির্ভূত কর্মকান্ড বন্ধে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) উচ্চ আদালতে বিগত ২০১৫ সালের ২০ মে রিট দায়ের করে (যার নং ৫৩৩২/২০১৫)। এরই প্রেক্ষিতে মহামান্য উচ্চ আদালত ওই বছরের ২৯ জুলাই রিটের শুনানী পরবর্তিতে সংশ্লিষ্ট সরকারী বিভাগে রুলনিশি জারী করেন এবং ৬ (ছয়) সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলেন। ফলে নেত্রকোনা জেলার রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর স্বাক্ষরিত, যার স্বারক নং ১৯২৫, একই বছরের ২ সেপ্টেম্বর ওই কার্যক্রম বন্ধে মহামান্য হাইকোর্ট আদেশ প্রতিপালনের জন্য নেত্রকোনা এবং দুর্গাপুর উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আদেশের কপি নির্দেশক্রমে প্রতিপালনের জন্য আদেশ প্রদান করেন এবং সোমেশ্বরী নদীকে কেন প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হবে না এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে বলেছেন। পরিবেশ সংরক্ষন আইন ১৯৯৫ এর ধারা ৫ এর চ অনুযায়ী মামলাটি বাংলাদেশ সংবিধানের ১৩,১৮(এ),২১,৩১,৩২ এবং ৪২ অনুচ্ছেদ সমূহের আলোকে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর ৫ (চ) পরিবেশ সংরক্ষন বিধিমালা ১৯৯৭, পানি উন্নয়ন বোর্ড এ্যাক্ট ২০০০, মৎস্য সংরক্ষণ আইন ১৯৫০, মৎস্য সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৮৫, বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ (ধারা ৯ ও ১০), মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০১১ এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০১৩ এর অধীনে মামলাটি বর্তমানে চলমান রয়েছে। এমতবস্থায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করবে সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে প্রতিটি বালু মহালে অসংখ্য ড্রেজার বসিয়ে দিন রাত বালু উত্তোলণ করা হচ্ছে। আর ওই বালু ট্রাক ও ট্রলিতে করে স্থানীয় প্রশাসনের সামনেই প্রকাশ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে।

সোমেশ্বরী নদীতে বালু মহলগুলো সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নদীর বুকে বালু চরে অসংখ্য ড্রেজার বসিয়ে বালু ও নূরী পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। নদীর চরে শতশত ট্রাক সারিবদ্ধ দাড়ানো বালি নেয়ার অপেক্ষায়। নদীর পশ্চিমপাড়ে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বিরিশিরি সেতুর ওপর বালু ভর্তি সারিবদ্ধ ট্রাক দাড়ানো অবস্থায়। দূর্গাপুর পৌর শহরের রাস্তা ভেঙ্গে চলাচল অনুপযোগি হয়ে পড়েছে। সরকারি ইজারার বাইরে আত্রাইখালী ব্রিজের পশ্চিম পাড় সংলগ্ন নদীর বুকে ড্রেজার বসিয়ে নূরী পাথর তোলা হচ্ছে।
একাধিক এলাকাবাসীর বলেন, সোমেশ্বরী নদীর চরে অসংখ্য ড্রেজার দিয়ে দিন রাত বালু ও পাথর তোলা হচ্ছে। সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে মাত্রারিক্ত ভিজে বালু ট্রাক ও লড়িতে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। বালু মহালে নৈরাজ্যকর অবস্থা দেখেও কেউ কোন প্রতিবাদ করছে না। বালু উত্তোলনকারীরা এলাকায় খুবই প্রভাবশালী এবং সব কিছু তারা ম্যানেজ করে চলে। সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়না।
বালু পরিবহনকারী ট্রক চালকের সহকারী ময়মনসিংহের বাসিন্দা সেলিম মিয়া বলেন, ঘাট মালিকরা ইঞ্জেকশানের সিরিজের মত চক্ত যেভাবে তুলে নেয়, ওরাও তেমনি বেশিরভাগ টাকা নিয়ে নেয়। এক ট্রাক বালু নিতে ঘাটেই দিতে হয় সাড়ে ৫ হাজার টাকা। তার উপর রাস্তায় রাস্তায় দিতে হয় চাঁদা।
মেসার্স আরিফ এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী বালু মহালের ইজারাদার মো. আলাউদ্দিন আলাল বলেন, আমরা সরকারি নিয়ম মেনেই আমাদের বালু মহাল চালাচ্ছি। তবে পাথর উত্তোলন বিষয়ে কোন ইজারা নেই। ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের সময় সাথে কিছু পাথরও উঠে আসে। এভাবে এগুলো বেচাকেনাও হচ্ছে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সকলেই জানে।
বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী পরিবেশবাদী মো. অহিদুর রহমান বলেন সমরকারি নীতিমালা অমান্য করে প্রতিদিন শতশত ড্রেজার দিয়ে সোমেশ্বরী নদী থেকে বালি ও পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে তলদেশ শুন্য হয়ে পড়ছে। যে কোন সময় নদী ভাঙ্গন ধ্বস ও দূর্গাপুর পৌর শহরটি দেবে যেতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের জরুরী পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত বলে মনে করি।
দূর্গাপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সাহাদাত হোসেন সরকার বলেন, পরিমানের চেয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় ট্রাকে বালু বহনের কারণে পৌর সভার রাস্তাগুলো ভেঙ্গে যায়। এতে করে সরকারের ক্ষতি হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিনিয়র গবেষনা কর্মকর্তা সোমনাথ লাহিড়ী যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে বিধিবহির্ভূত বালু ও পাথর উত্তোলন ব্যাপকভাবে শুরু হওয়ায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করা হচ্ছে বলে প্রতিয়মান হয়। অনতিবিলম্বে বিধি সম্মত উপায়ে ঘোষিত বালু মহাল থেকে বালু উত্তোলনের লক্ষ্যে প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করবে বলে স্থানীয় দুর্গাপুরবাসী আশা করছে। মামলাটি শুনানীর অপেক্ষায় রয়েছে। অল্প দিনের মধ্যে এর শুনানী হবে।
দূর্গাপুর ইউএনও মো. তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমি এখানে কিছুদিন হয় যোগদান করেছি। মামলার বিষয়টি আমার জানা নেন। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। সরকারি বিধি মোতাবেক প্রতি বছর বালু মহাল ইজারা দেয়া হয়। এবারও জেলা প্রশাসন থেকে বালু মহাল ইজারা দেয়া হয়েছে। বিষয়টি সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ড. মঈনউল ইসলাম যুপান্তরকে একই ধরনের কথা বলেন, এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। মামলার বিষয়টি আমার জানা নেই।



উত্তরানিউজ২৪ডটকম / ম.কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম,নেত্রকোনা

recommend to friends
  • gplus

পাঠকের মন্তব্য

ফেসবুকে আমরা